জুম্‌’আর খুতবা

হযরত আইয়ুব আলাইহিস সালাম’র দ্বীনি দাওয়াত

অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি | শুক্রবার , ২ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৬:১০ পূর্বাহ্ণ

প্রিয় মুসলিম ভাইয়েরা! আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করুন! বিপদাপদ সুস্থতা অসুস্থতা সচ্ছলতা অসচ্ছলতা সুখে দুখে সর্বাবস্থায় আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন। আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করুন, আল্লাহর প্রত্যেক নবী রাসূলগণ কঠিন কঠিন বিপদ ও পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন। প্রতিটি পরীক্ষায় তাঁরা ধৈর্যের চরম পরাকাষ্টা প্রদর্শন করে উত্তীর্ণ হয়েছেন। আল্লাহ তা’আলা তাঁর নবী আইয়ুব আলাইহিস সালামকে বিভিন্ন প্রকার শারীরিক অসুস্থতা ও রোগ ব্যাধির মাধ্যমে কঠিন পরীক্ষা করেছিলেন। তিনি সর্বশরীরে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়া সত্বেও ধৈর্যের যে অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন তাঁর উত্তম প্রতিদান দিয়ে আল্লাহ তাঁকে মহিমান্বিত করেছেন।

হযরত আইয়ুব ()’র পরিচিতি:

তাঁর নাম আইয়ুব, তিনি আল্লাহর মনোনীত নবীদের অন্যতম। তাঁর পিতার নাম মুস ইবন রাযিহ ইবন আইস ইসহাক ইবন ইবরাহীম। ইবনে কাছীরের বর্ণনামতে তিনি হযরত ইসহাক (.) এর দুই যমজ পুত্র ঈছ ও ইয়াকুব (.) এর মধ্যকার প্রথম পুত্র ঈছ এর প্রপৌত্র ছিলেন। তাঁর স্ত্রী ছিলেন ইয়াকুব (.)’র পুত্র ইউসুফ (.) এর পৌত্রী “লাইয়া’ বিনতে ইফরাইম বিন ইউসূফ। কেউ বলেছেন তাঁর স্ত্রীর নাম “রাহুমাহ” অথবা “রহিমা” নামে তিন পরিচিত। (ইবন জারীর, তারিখুর রসূলি ওয়াল মুলকু, খন্ড:, পৃ: ১২৪)

তাফসীরকার ও ঐতিহাসিকদের বর্ণনামতে ফিলিস্তিনের দক্ষিণ সীমান্ত বরাবর দামেস্ক ও আযরূ’আত এর মধ্যবর্তী হুরান অঞ্চলের বাছানিয়া এলাকার বিশাল জনপদে তাঁর বসবাস, দ্বীনি দাওয়াত, তাওহিদী পয়গাম ও হেদায়াতের বাণী প্রচারে নবুওয়তের দায়িত্ব পালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, পবিত্র কুরআনের ৪টি সূরায় ৮টি আয়াতে তাঁর নাম মুবারক ও আলোচনা উল্লেখ হয়েছে, তাঁর আয়ুকাল ৮৮ বছর। আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামদের মধ্যে ধৈর্যশীল হিসেবে তিনি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি দীর্ঘদিন কঠিন রোগে আক্রান্ত ছিলেন। এ প্রসঙ্গে বিভিন্ন মত রয়েছে সাহাবী হযরত আনাস (রা.)’র বর্ণনা মতে তিনি আঠার বছর রোগাক্রান্ত ছিলেন। হযরত কাব (রা.) এর বর্ণনা মতে তিন সাত বছর রোগাক্রান্ত ছিলেন, এক বর্ণনামতে সাত বছর সাত মাস অসুস্থ ছিলেন। (তাফসীরে মাযহারী)

আল কুরআনে হযরত আইয়ুব (.)’র বর্ণনা:

হযরত আইয়ুব আলাইহিস সালাম কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়েও মুহূর্তের জন্য আল্লাহকে ভূলেননি, আল্লাহর স্মরণ ত্যাগ করেননি, আল্লাহর দয়া ও করুণা প্রার্থনায় সর্বদা ব্যাকুল ছিলেন। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, “এবং আইয়ুবকে (স্মরণ করুন) যখন সে আপন প্রতিপালককে ডাকলো, আমাকে দুঃখ কষ্ট স্পর্শ করেছে, তুমি সর্বাধিক দয়ালু। অতঃপর আমি তার প্রার্থনা শুনেছি তখন আমি দূরীভূত করেছি যে দুঃখ কষ্ট তাঁর ছিলো, এবং আমি তাঁকে পরিজনবর্গ ও তাদের সাথে তদসংখ্যক আরো দান করলাম। আমার নিকট থেকে দয়া করে এবং ইবাদতকারীদের জন্য উপদেশ স্বরূপ।” (সূরা: আম্বিয়া, আয়াত: ৮৩, ৮৪)

বর্ণিত আয়াতের ব্যাখ্যা কানযুল ঈমান ও তাফসীর খাযাইনুল ইরফানএ উল্লেখ হয়েছে, আল্লাহ তা’আলা তাঁর নবী হযরত আইয়ুব () কে অসংখ্য নিয়ামত দান করেছেন। সুন্দর আকৃতি, অধিক সন্তানসন্তুতি, প্রচুর ধন সম্পদ দিয়ে তাঁকে কঠিন পরীক্ষার সম্মূখীন কর্রেছিলেন। তাঁর সন্তানগণ ঘর ধসে পড়ে মাটি ছাপায় মৃত্যুবরণ করলো, গৃহপালিত সমস্ত পশু হাজার হাজার উট, হাজার হাজার মেষ যা তাঁর মালিকানায় ছিলো সবই মারা গেল, সমস্ত ক্ষেত খামার ও বাগান সমূহ নষ্ট হয়ে গেল কিছুই অবশিষ্ট রইলো না। সীমাহীন ক্ষতি, বিপদগ্রস্ত হবার পরও তিনি চিন্তিত ও ব্যথিত হননি, আল্লাহর প্রশংসা থেকে মুহূর্তের জন্যই বিরত হয়নি। তিনি বলতেন এতে আমার করার কি আছে, যিনি সবকিছুর প্রকৃত মালিক তিনিই নিয়ে গেছেন। যতদিন ইচ্ছা আমার নিকট আমানত রেখেছেন। তাঁর নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাও সম্ভব হয়নি। আমার মাওলার ইচ্ছায় আমি সন্তুষ্ট। তিনি ভীষণ ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সমগ্র দেহে ফোসকা পড়ে গেল, পুরো শরীর মুবারক ক্ষত বিক্ষত হয়ে গেলো, তাঁর সাত কন্যা সাত পুত্র সব সন্তান সন্তুতি মারা গেল তাঁর অসুস্থতার চরম পর্যায়ে তাঁর স্ত্রী ব্যতীত সবাই তাঁকে ছেড়ে চলে গেল। এমন নাজুক মূহুর্তেও তিনি সর্বাপেক্ষা বড় দয়ালু আল্লাহর কাছে দুআ প্রার্থনা অব্যাহত রেখেছেন। আল্লাহ তাঁর নবীর আহবানে সাড়া দিলেন দুআ কবুল করলেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ হলো আপনি মাটিতে পায়ের আঘাত করুন। তিনি পদাঘাত করলেন তাঁর পায়ের ঘর্ষনে পানির প্রস্রবণ সৃষ্টি হয়ে গেলো। তিনি ফোয়ারার পানি দ্বারা গোসল করলেন ও পান করলেন এর ফলে শরীরের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীন সব রোগ দূরীভূত হয়ে গেল। তাঁর স্বাস্থ্য পূর্ণ মাত্রায় সুস্থ হয়ে গেল, তাঁর স্ত্রীকে পুনরায় যৌবন দান করা হলো, হযরত ইবনে মাসউদ ও হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহ তা’আলা আনহুমা প্রমূখ সাহাবা এবং তাফসীরকারদের বর্ণনামতে আল্লাহ তা’আলা তাঁর সন্তানদের জীবিত করে দিয়েছিলেন এবং তাঁকে ততসংখ্যক আরো সন্তান দান করেছিলেন। (তাফসীর খাযাইনুল ইরফান, পৃ: ৬০১)

মহান আল্লাহর অপার কৃপায় তাঁর যাবতীয় অসুস্থতা, রোগব্যাধি, যন্ত্রণা ও কষ্ট দুরীভূত হয়ে গেলো। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে আরো এরশাদ করেছেন, এবং স্মরণ করুন আমার বান্দা আইয়ুবকে যখন সে তাঁর প্রতিপালকে আহবান করেছিলো। আমাকে শয়তান যন্ত্রণা ও কষ্টে ফেলেছে। আমি বললাম আপন পদ দ্বারা ভূমিকে আঘাত করো এটা হচ্ছে সুশীতল প্রস্রবণ গোসলের ও পান করার জন্য এবং আমি তাকে তাঁর পরিবার পরিজন এবং তাদের সমসংখ্যক আরো অধিক দান করলাম আপন অনুগ্রহ প্রদর্শন রূপে এবং বোধশক্তি সম্পন্নদের উপদেশের জন্য। (সূরা: সোয়াদ, আয়াত: ৪১৪২)

প্রকৃত ঈমানদারগণ বিপদে পড়লে আরো বেশি আল্লাহর নিকটবর্তী হন। তাঁরা হাতাশ ও নিরাশ হননা। হযরত আইয়ুব (.) ধন সম্পদ পুত্র কন্যা হারিয়ে অবশেষে রোগে জর্জরিত হয়েও আল্লাহর স্মরণ থেকে বিচ্যুত হননি। এবং তাঁর স্ত্রীও ছিলেন এক পূণ্যবতী আদর্শ মহিলা স্বামীর সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেন। স্বামীর এমন দুরবস্থায় এক মুহূর্তের জন্যও স্বামীর সেবা থেকে নিজেকে বিরত রাখেন নি। স্বামীর প্রতি ভক্তি ও ভালোবাসার এমন দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে আদর্শ মহিলাদের জন্য অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

আইয়ুব (.) ছিলেন ধৈর্যের মডেল:

তিনি সুখে দুঃখে সর্বাবস্থায় যেমন ধৈর্যশীল ছিলেন। আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত প্রচারেও তাঁর ধৈর্য বিশ্বমানব জাতির জন্য এক অনুপম আদর্শ। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন। আমি তাঁকে পেলাম ধৈর্যশীল। কতই উত্তম বান্দা, নিশ্চয় সে ছিল প্রত্যাবর্তনকারী। (সূরা: সোয়াদ,আয়াত: ৪৪) মহান আল্লাহ আমাদেরকে নবীরাসূল আলাইহিমুস সালামদের আদর্শ অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসাএ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রী), বন্দর, চট্টগ্রাম; খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।

আবদুল মাজেদ

বাহুলী, পটিয়া, চট্টগ্রাম

প্রশ্ন: নামাযে সূরা ফাতেহা পাঠান্তে আমীন উচ্চস্বরে বা নিম্নস্বরে বলা সম্পর্কে সংক্ষেপে জানতে চাই।

উত্তর: মুকাল্লিদের জন্য মাযহাব অনুসরণ করা ফরজ। হানাফী মাযহাবে নামাযে সূরা ফাতেহা পাঠ করা ওয়াজিব। সূরা ফাতিহা পাঠ শেষে নিম্নস্বরে আমীন বলা সুন্নাত। সশব্দে আমীন বলা ও নীরবে আমীন বলার ব্যাপারে দুধরনের হাদিস থাকলেও দুইটি বর্ণনা দুই সময়ের ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো শিক্ষাদানের উদ্দেশ্য উচ্চস্বরে আমীন বলতেন। হযরত ইবরাহীম নাখঈ (রা.) বর্ণনা করেন, ইমাম চারটি বিষয় নীরবে পাঠ করবেন, আউজুবিল্লাহ, বিসমিল্লাহ, সুবহানাকা, আল্লাহুম্মা এবং আমীন । (উমদাতুল কারী ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃ: ৫২)

নিম্নস্বরে আমীন বলা সংক্রান্ত হাদীসগুলোর উপর বৃহত্তর মুসলিম উম্মাহর আমল রয়েছে এতদ সংক্রান্ত হাদীসগুলো অসংখ্য সনদে বর্ণিত হওয়ার কারণে হাদীস গুলো শক্তিশালী হয়েছে। শায়খ আবু বারাকাত আবদুল্লাহ বিন আহমদ নাসাফী প্রণীত “কানযুদ দাকায়েক” ১ম খন্ড, ৩১৩ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে, ইমাম ও মুক্তাদি দুজনই নিচু স্বরে আমিন বলবে। অনুরূপ বর্ণনা “দুররে মোখতার” ফিকহ গ্রন্থেও উল্লেখ হয়েছে। (ইমাম আহমদ রেযা, “ফতোওয়ায়ে রিজভীয়্যাহ” কিতাবুস সালাত)

পূর্ববর্তী নিবন্ধরজব : পবিত্র রমজানের প্রস্তুতির মাস
পরবর্তী নিবন্ধঅ্যাটর্নি জেনারেলের অতিরিক্ত দায়িত্বে আরশাদুর রউফ