পাহাড়ি জেলা রাঙামাটিতে ভরা বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় এ বছর জুমিয়াদের স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছে। পাহাড়ের ঢালু জমিতে জুমের সোনালী ধান রোপণের পর পানির অভাবে ফলন ভালো হয়নি। এ অবস্থায় চলতি বছর জুমচাষে ক্ষতির আশঙ্কা করছেন চাষিরা। রাঙামাটি কৃষি বিভাগও বলছে, সঠিক সময়ে বৃষ্টিপাত না হওয়ায় এবছর গত বছরের তুলনায় ফলন কম হয়েছে। এমতাবস্থায় খাদ্য সংকটের শঙ্কায় জুমিয়াদের কপালে পড়েছে চিন্তার ভাজ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পার্বত্য জেলা রাঙামাটি সদর উপজেলার বড়াদম এলাকার গোলাছড়ি পাড়ায় বেশ বড় এলাকা নিয়ে জুম চাষ করা হয়েছে। সেখানে ধানের ফাঁকে ফাঁকে রোপণ করা হয়েছে কলা, মরিচ, হলুদ, আদা, কচু, মিষ্টি কুমড়া, বরবটিসহ নানান জাতের শাক–সবজি। তবে গত বছরের তুলনায় এবছর বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় জুমচাষে ভালো ফলন হয়নি। এতেই দুশ্চিন্তায় পড়েছেন জুম চাষিরা।
গোলাছড়ি এলাকার চাষি শলিব্রত চাকমা জানান, এমন দিনে জুম চাষিদের ঘরে ঘরে চলতো নবান্ন উৎসব। কিন্তু এবছর আবহাওয়া প্রতিকূলে থাকায় এবং সঠিক সময়ে পর্যাপ্ত পরিমাণ বৃষ্টি না হওয়ায় ফলন হয়নি। ফলে পাহাড়ে নতুন ফসল ঘরে তোলার আনন্দও নাই। ভালো ফলন না হওয়ায় জুমের ধান ঘরে তুলে হতাশায় ভুগছেন চাষিরা। কয়েকজন চাষি জানান, জুমে উৎপাদিত ধান ও কৃষি শাক–সবজি ৭ থেকে ৮ মাস পর্যন্ত তাদের খাবারের জোগান দেয়। এছাড়াও তারা অতিরিক্ত শাক–সবজি বিক্রি করেও জীবিকা নির্বাহ করেন। তবে এবার যা ফলন হয়েছে তা দুইমাসও যাবে না। সেই কারণে জুমিয়াদের পড়তে হবে খাদ্য সংকটে।
রাঙামাটি সদর উপজেলার বড়াদম এলাকার গলাছড়ির জুমচাষি মিনু চাকমা জানান, এবছর সঠিক সময়ে পর্যান্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় এবং সেচের পানির অভাবে জুমের ফসল ভালো হয়নি। অধিকাংশ ফসল পানির অভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। যা উৎপাদিত হয়েছে তা দিয়ে কোনোরকম সংসার চললেও পরবর্তীতে কষ্ট হবে।
একই এলাকার জুমচাষি তুষি চাকমা বলেন, এবছর তিনি ৮০ শতক জায়গায় জুম চাষ করেন। সঠিক সময়ে বৃষ্টি না হওয়ায় ফলন ভালো হয়নি। যা ফলন হয়েছে তা দিয়ে বড়জোর দুই মাস চলতে পারবেন। এরপর হয়ত কাপ্তাই হ্রদে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহের পথ খুঁজতে হবে।
রাঙামাটি সদর উপজেলার বড়াদম ব্লক–এর কৃষি কর্মকর্তা রতন কুমার চাকমা জানান, জুম ধান রোপনের সঠিক সময়ে বৃষ্টিপাত না হওয়ায় ফলন ভালো হয়নি। তবে জুম ধানের পাশাপাশি শাক–সবজি ফলন ভালো হয়েছে। এগুলো বিক্রি করে তারা কোনো রকম তাদের সংসার চালায়। তিনি আরো বলেন, প্রতি বছর এপ্রিল মাসের শেষের দিকে শুরু হয় জুমে ধান লাগানোর প্রক্রিয়া। প্রায় ৩–৪ মাস পরির্চযার পর সেপ্টেম্বর মাসের শেষদিক থেকে পাহাড়ে জুমের ধান কাটা শুরু করে আর শেষ হয় অক্টোবর মাসে।
রাঙামাটি সদর উপজেলা উপ–সহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা উত্তম কুমার বিশ্বাস জানান, সমতল এবং জুম মিলে এবছর আউশের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩১০ হেক্টর। অর্জন হলো ২৭০ হেক্টর। পানির অভাবে ফলন ভালো হয়নি। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে যে ফলন হয়েছে প্রতি হেক্টরে ৮০০ থেকে ৮৫০ কেজি ধান আশা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে রাঙামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ–পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান জানান, জুমচাষ সাধারণত বৃষ্টিপাতের উপর নির্ভরশীল। এবছর বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় চাষ এবং ফলন কম হয়েছে। তিনি আরো জানান, এবছর জুমচাষের আউশ ধানের লক্ষ্যমাত্রা ছিলে ৫ হাজার হেক্টর, আদা ৩ হাজার ১০০ হেক্টর এবং হলুদ ৩ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ করা হয়েছে। তবে পানির অভাবে এবং অনাবৃষ্টির কারণে জুম চাষ ফলন ভালো হয়নি।