প্রিয় ইসলামী ভাইয়েরা! আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করুন, জেনে রাখুন, আজকের আলোচনার বিষয় কুরআন ও হাদীসের আলোকে আল্লাহর ওলীদের পরিচয়, তাঁদের মর্যাদা, তাঁদের জীবন থেকে আমাদের শিক্ষা। আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেছেন, “সাবধান! নিশ্চয়ই আল্লাহর ওলীদের কোনো ভয় নেই, এবং তারা দুঃখিতও হবেনা, তারা হলো সেসব মানুষ যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছে। (সূরা: ইউনূস, আয়াত: ৬২–৬৩)
বর্ণিত আয়াতের আলোকে আল্লাহর ওলী হওয়ার মূল পরিচয় হলো ঈমান ও তাকওয়া। বাহ্যিক পোশাক, কোনো অলৌকিক ঘটনা ওলী হওয়ার প্রকৃত মাপকাঠি নয়, যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস, ফরজ বিধানসমূহ পালন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র সুন্নাহর অনুসরণ হারাম থেকে বেঁচে থেকে তাকওয়া অবলম্বন করে কুরআন সুন্নাহ ভিত্তিক জীবন পরিচালনাকারী ব্যক্তি আল্লাহর ওলী হিসেবে পরিগণিত হবে।
ওলী শব্দের অর্থ: ওলী শব্দটি আরবি, এর অর্থ নৈকট্য, ভালোবাসা, সাহায্য, বন্ধুত্ব ও অভিভাবক। শরীয়তের পরিভাষায় আল্লাহর ওলী হলেন এমন মু’মিনে কামিল মুত্তাকি, যিনি আল্লাহর আনুগত্য ভালোবাসা ও নৈকট্য অর্জনে সর্বদা সক্রিয় তৎপর এবং এ পথে অগ্রসর হন। ওলী হওয়া কোনো বংশগত মর্যাদা বা উপাধি নয় এটি আল্লাহর আনুগত্য ও তাকওয়ার মর্যাদা। তিনি শরীয়তের পূর্ণ পাবন্দ হবেন। কুরআন সুন্নাহর অনুসরণে সবচেয়ে বেশি যত্নবান হবেন, তিনি নিষ্পাপও নন। আল্লাহ তা’আলা অন্য আয়াতে এরশাদ করেছেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো। ওলীদের সুহবত, মহব্বত, নিসবত, সম্পর্ক আদব ও ভালোবাসা মানুষের ঈমান, আমল, ও চরিত্রকে সুন্দর করে। অন্তরে আল্লাহর ভয় ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা এর প্রতি প্রেম ভালোবাসা জাগ্রত করে।
হাদীস শরীফের আলোকে ওলীদের মর্যাদা: হাদিসে কুদসিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর তা’আলার পক্ষ থেকে এরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি আমার কোনো ওলীর সঙ্গে শক্রতা করে আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করি। (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৬৫০২)
আল্লাহর ওলীগণ, ফরজ ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে এবং নফল ইবাদতের মাধ্যমে আরো বেশি নৈকট্য অর্জন করতে থাকে, অবশেষ আল্লাহ তাঁকে ভালোবাসেন, ওলীদের মর্যাদা অত্যন্ত উঁচু, এ মর্যাদা লাভের জন্য প্রথমে ফরজ আমল এরপর সুন্নাত, নফল তাকওয়া, ইখলাস, ইসলামের সঠিক ও বিশুদ্ধ আক্বিদা বিশাস অনুসরণ। হালাল–হারামের বিধি–বিধান আল্লাহর হক ও বান্দার হক সম্পর্কে সর্বদা যত্নবান ও সতর্ক হবেন।
হযরত শায়খ আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)’র আদর্শ ও শিক্ষা: ইসলামের ইতিহাসে ইসলামের আদর্শ ও শিক্ষার প্রচার প্রসারে আল্লাহর ওলীদের মধ্যে যাঁর নাম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে উচ্চারিত, যাঁর জীবন কর্ম অবদান অবিস্মরণীয়, তিনি হলেন কাদেরীয়া তরীকার মহান দিকপাল মাহবুবে সুবহানি, গাউসে সমদানি, কুতুবে রব্বানি, গাউসুল আযম বড়পীর হযরত শায়খ আবদুল কাদির জিলানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহ অন্যতম। তিনি আধ্যাত্মিক জগতের এক মহান সাধক, উজ্জ্বল নক্ষত্র, দ্বীনের দাঈ হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্মরণীয়, ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী তিনি ৪৭০ হিজরির দিকে জিলান শহরে জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের জন্য তৎকালীন যুগে ইসলামী জ্ঞান বিজ্ঞান, ইসলামী তাসাউফ ও আধ্যাত্নিক শিক্ষার কেন্দ্রস্থল বাগদাদে গমন করেন। সেখানে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে খ্যাতিমান মুহাদ্দিস, মুফাসসির, ফিকহবিদ, ইসলামি জ্ঞান বিশারদগণের সান্নিধ্যে ইসলামী জ্ঞান বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা প্রশাখায় অগাধ পান্ডিত্য ও ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। অসংখ্য বুজুর্গ ওলামা মাশায়েখদের সাহচর্য লাভে ধন্য হন। পরবর্তীতে তিনি নিজেও দ্বীনি ইলমের শিক্ষাদান ইলমে দ্বীনের প্রচার প্রসার দ্বীনি দাওয়াত ও শরীয়ত তরীকত ও তাসাউফ চর্চার বহুমাত্রিক খিদমতে আত্ম নিয়োগ করেন। তাসাউফ ও আধ্যাত্নিকতা চর্চা কখনো শরীয়তের জ্ঞান থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। প্রকৃত তাসাউফ হলো অন্তরকে পরিশুদ্ধ করা, আল্লাহকে ভয় করা, নফসকে নিয়ন্ত্রণ করা, আল্লাহ ও তদীয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সন্তুষ্টি অর্জন করা। জীবনের সর্বক্ষেত্রে শরীয়তের বিধান মেনে চলা।
তাঁর দ্বীনি দাওয়াত: তিনি মানুষকে আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত নামায কায়েম, মানুষের হক আদায় করা, হালাল উপার্জনের উপর গুরুত্বারোপ, হারাম থেকে বেঁচে থাকতে বাহ্যিক আমলের পাশাপাশি অন্তরের সংশোধন ও পরিশুদ্ধি অর্জনে গুরুত্ব দিতেন। তিনি মানুষকে হিংসা বিদ্বেষ, পাপাচার, মিথ্যাচার, প্রতারনা, প্রবঞ্চনা, লোভ, দুনিয়ার মোহ পার্থিব স্বার্থের ধ্বংসস্তুপ থেকে বেঁচে থাকার শিক্ষা দিয়ে মানুষকে হিদায়ত সাফল্য ও কল্যাণের পথে আহবান করেছেন। কুফর, শির্ক, বিদআত ও শরীয়ত গর্হিত কার্যকলাপ থেকে সর্বদা বিরত থাকার শিক্ষা দিয়েছেন।
শায়খ আবদুল কাদের জিলানী শাসকদের অন্যায় কাজের প্রতিবাদ করতেন: হযরত শায়খ আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)সকল প্রকার অন্যায় কাজ ও অপকর্মের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবাদী ও সোচ্চার ছিলেন। এমনকি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইসলাম বিরোধী কোনো সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শাসকের সমালোচনা করতে তিনি দ্বিধা করতেন না। যখনই রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সাধারণ জনগনের উপর অন্যায়ভাবে কোনো প্রকার জুলুম নির্যাতন দৃষ্টিগোচর হতো সেখানেই জোরালো প্রতিবাদ করতেন। ৫৪১ হিজরি ১১৪৬ খ্রিস্টাব্দে খলিফা মুকতাফি তাঁর শাষণকালে ইয়াহইয়া ইবনে সায়িদকে বিচারপতির দায়িত্ব দেন, এ বিচারক জনগণের উপর সুবিচারের পরিবের্ত অবিচার জুলুম নির্যাতন করতেন, ঘুষের বিনিময়ে অপরাধীর পক্ষাবলম্বন করতেন এ বিচারকের বিরুদ্ধে কথা বলতে কেউ সাহস করতনা, এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত আলিম ইবনুল জওজির দৌহিত্র বর্ণনা করেন, রাষ্ট্রের খলিফা মসজিদে এসেছিলেন, গাউসে পাক শায়খ আবদুল কাদির জিলানী মসজিদের মিম্বর থেকে খলিফাকে সম্বোধন করে বলেন, সবচেয়ে বড় জালিমকে বিচারকের দায়িত্ব দিয়ে যে অন্যায় করেছেন কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহর সমীপে কী জবাব দেবেন? খলিফা গাউসে পাকের সতর্কবাণী শোনা মাত্র ওই বিচারক কে বরখাস্ত করেন। (মিরআতুজ জামান ৮/২৬৫ ড. আলি মুহাম্মদ সাল্লাবি, শায়খ আবদুল কাদির জিলানী (রাহ.), পৃ: ১১০)
দ্বীনি সংস্কার ও ভ্রান্ত মতাদর্শের মোকাবিলা: বড়পীর শায়খ আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) ছিলেন, ষষ্ঠ হিজরি সনের মুজাদ্দিদ ইসলামের সঠিক রূপরেখা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আদর্শ ও শিক্ষার প্রচার প্রসার ও ইসলামের নামে সৃষ্ট সকল প্রকার ভ্রান্ত দল উপদলের আক্বিদা বিশ্বাস খন্ডন করে মুসলিম উম্মাহর ঈমান আকিদা সংরক্ষণ করেছেন। বাতিল আকিদার ভয়াবহতা থেকে জাতিকে সতর্ক করেন, তিনি ইসলামকে বিকৃতির কবল থেকে রক্ষা করেন। শিয়া, রাফিজিদের ভ্রান্ত আক্বিদার স্বরূপ উন্মোচন করেন। নাজাতপ্রাপ্ত একমাত্র দল আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আদর্শ ও শিক্ষার প্রচারে ব্যাপক ভূমিকা ও অবদান রাখেন। ইসলামের নামে উগ্রবাদী খারেজী, শিয়াদের যত সব বাতিল আকিদা সৃষ্টি হয়েছিল তিনি তাঁর রচিত “গুনীয়াতুত তালেবীন” গ্রন্থে চরমপন্থি উগ্রবাদী শিয়া সম্প্রদায়ের কুফরি আকিদা খন্ডন করেন। শিয়া রাফিজিদের ভ্রান্ত আকিদা ছিল “জিবরিল (আ.) ভুল করেছেন ওহী হযরত আলী (রা.)’র নিকট না এনে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র কাছে নিয়ে গেছেন।” শিয়ারা খোলাফায়ে রাশেদীনের প্রথম তিন খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) হযরত ওমর ফারুক (রা.) হযরত উসমান জিন্নুরাইন (রা.) প্রথম তিনি খলিফার খিলাফতকে অস্বীকার করে। শায়খ আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) শিয়াদের আকিদা বিশ্বাসকে কুরআন ও হাদীসের আলোকে দালিলিক ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি তাঁর আকিদা বিশ্বাস ওয়াজের মজলিসে স্পষ্টভাবে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উল্লেখ করতেন, আল্লাহর নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র সাহাবীদের আকিদাই হলো আমাদের আকিদা। তিনি তাঁর অসিয়ত নসীহতে সর্বদা কুরআন সুন্নাহর পথ আঁকড়ে ধরতে গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি মানব জাতির নৈতিক উৎকর্ষ সাধন ও চারিত্রিক সংশোধনের লক্ষ্যে কাদেরিয়া তরিকার প্রবর্তন করেন। তরীকত ও তাসাউফ চর্চায় সংস্কার মূলক কর্মকান্ডে তিনি হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম আবু হামিদ গাজালি অনুসৃত কর্মপদ্ধতির অনেকাংশেই অনুসরণ করেন। প্রখ্যাত তাফসীরকার আল্লামা ইবনু কাসির তাঁর সম্পর্কে বলেন, তিনি অনেক বড় মাপের জ্ঞান সাধক ছিলেন, সৎ নির্ভীক ও উচু মাপের বুজুর্গ ছিলেন, তাঁর কর্মপন্থা ছিল খুবই চমৎকার। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১৬/৪২০)
ওফাত: ইসলামের এ মহান সাধক আধ্যাত্নিক ব্যক্তিত্ব ওলীকুল সম্রাট হযরত বড়পীর শায়েখ আবদুল কদের জিলানী (রহ.) ৫৬১ হিজরি সনে ১১ রবিউস সানি সোমবার ৯১ বৎসর বয়সে মহান প্রভূর সান্নিধ্যে গমন করেন।
আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে এই মহান ওলীর আদর্শ অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন।
লেখক: অধ্যক্ষ, মাদরাসা–এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রী), বন্দর, চট্টগ্রাম; খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।












