সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা‘আলার জন্য, যিনি তাঁর নবী ইউনুস আলাইহিস সালামকে প্রেরণ করে নিনোয়া অঞ্চলের অধিবাসীদের হেদায়াত দান করেছিলেন। তিনি আল্লাহর প্রেরিত নবী হিসেবে তাঁর পথভ্রষ্ট জাতিকে হিদায়াতের প্রতি আহবান করেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই। তিনি একক, অদ্বিতীয় তাঁর কোনো অংশীদার নেই। আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি আমাদের মহান অভিভাবক রহমতের নবী, দোজাহানের কান্ডারী, মুক্তির দিশারী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রিয় বান্দা ও প্রিয় রাসূল। তাঁর পবিত্র বংশধরগণ, সম্মানিত সাহাবাগণ, সত্যান্বেষী মুমিন নরনারীদের প্রতি অসংখ্য করুণাধারা বর্ষিত হোক।
হযরত ইউনুস আলাইহিস সালাম‘র পরিচিতি ও দ্বীনি খিদমত:
তাঁর নাম ইউনুস ইবন মাত্তা, পবিত্র কুরআনে ৪ স্থানে তাঁর নাম মুবারক উল্লেখ রয়েছে। ৬টি সূরার ১৮ আয়াতে তাঁর পরিচিতি, কুফর, শিরক ও দ্বীনের দাওয়াত প্রচারে তাঁর খিদমত ও অবদানের কথা উল্লেখ রয়েছে। পবিত্র কুরআনে তিনি বিভিন্ন নামে পরিচিতি পেয়েছেন। সূরা ইউনুস, ৯৮ আয়াতে তার নাম ইউনুস, সূরা আম্বিয়া ৮৭ আয়াতে তাঁকে যুননুন বলা হয়েছে। “নুন” অর্থ মাছ “যু” অর্থ ওয়ালা অর্থাৎ মাছ ওয়ালা। সূরা কলম ৪৮ নং আয়াতে তাঁকে সাহেবুল হুত” অর্থ মাছওয়ালা, “যুননুন ও সাহেবুল হুত” উভয়টির অর্থ এক, একটি বিশেষ ঘটনার প্রেক্ষিতে তিনি এনামে পরিচিতি লাভ করেন। বর্তমান ইরাকের মোসেল শহরের বিপরীত দিকে দজলা নদীর পূর্ব প্রান্তে তাঁর অবস্থান ছিল, এ অঞ্চলের লোকেরা মূর্তি পূজা করতো। তাদের সবচেয়ে বড়মূর্তির নাম ছিল আশতার। (তাফসীর সাবৃনী, পৃঃ ৩০৩)
হযরত ইউনূস (আ.) তাঁদেরকে দ্বীনের দাওয়াত দেন, তাঁদের সামনে আল্লাহর একত্ববাদের পরিচয় তুলে ধরেন, তাঁর দাওয়াত কবুল না করলে আসমানী গযব নাযিল হওয়ার ব্যাপারেও তাদেরকে সতর্ক করেন, তবুও তাঁরা ঈমান গ্রহণ করেননি। সে সময় আযাবের সূচনা হলো, তিনি নৌকা যোগে অন্যত্র চলে যেতে ইচ্ছা করলেন। এ উদ্দ্যেশে তিনি নৌকায় আরোহণ করলেন। নাবিকরা তাঁকে গভীর পানিতে নিক্ষেপ করে। এরপর এক বিশাল আকৃতির মাছ তাকে গিলে ফেলে, এ কারণে তাঁকে “যুননুন” মাছওয়ালা উপাধিতে ভূষিত করা হয়। অথচ আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবীকে মাছের পেটের ভেতর নিরাপদে রাখেন, তিনি সেখানে আল্লাহর নামে তাসবীহ তাহলীল পড়তে থাকেন, এক পর্যায়ে আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে মাছের পেট থেকে পরিত্রাণ দান করেন। ২৮ বছর বয়সে তিনি নবুওয়ত লাভকরেন, তিনি ইরাকে ইসলামের সুমহান বানী ও আদর্শ প্রচার করেন।
আল কুরআননের আলোকে হযরত ইউনুস আলাইহিস সালাম:
আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেছেন, নিশ্চয়ই ইউনুস রাসূলগণের অর্ন্তভূক্ত। (সূরা: সাফফাত: ১৩৯)
আল্লাহ তা‘আলা আরো এরশাদ করেছেন, অতঃপর যদি সে আল্লাহর গুণগানকারীদের অন্তর্ভুক্ত না হতেন তাহলে সে কিয়ামত পর্যন্ত মাছের পেটেই থাকতেন। অত:পর আমরা তাকে একটি বিজন প্রান্তরে নিক্ষেপ করলাম তখন সে রুগ্ন ছিল আমরা তার উপরে একটি লতা বিশিষ্ট বৃক্ষ উদগত করলাম এবং তাকে লক্ষ বা ততোধিক লোকের দিকে প্রেরণ করলাম। তারা ঈমান আনল ফলে আমরা তাদেরকে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত জীবন উপভোগ করার সুযোগ দিলাম। (সূরা, সাফফাত, আয়াত–১৪৩–১৪৮)
মাছের পেটের ভেতরে আল্লাহকে স্মরণ:
বিপদে আপদে সংকটে মুসীবতে দুঃখ বেদনা সর্বাবস্থায় আল্লাহর স্মরণই নবীদের যিকর। আল্লাহ তা‘আলা ইউনুস (আ.) সম্পর্কে এরশাদ করেন, এবং মাছ ওয়ালা (ইউনুস) এর কথা স্মরণ কর, যখন সে ক্রুদ্ধ হয়ে চলে গিয়েছিল এবং বিশ্বাসী ছিল যে, আমরা তার উপরে কোন রূপ কষ্ট দানের সিদ্ধান্ত নেব না। অতঃপর সে মাছের পেটে ঘন অন্ধকারের মধ্যে আহবান করল (হে আল্লাহ) তুমি ব্যাতীত কোন উপাস্য নেই, তুমি পবিত্র, আমি সীমালংঘনকারীদের সাড়া দিলাম আর এভাবেই আমরা বিশ্বাসীদের মুক্তি দিয়ে থাকি। (সূরা: আম্বিয়া, আয়াত ২১, ৮৭–৮৮)
ইউনুস (আ.) মাছের পেটে থাকা আল্লাহর পরীক্ষা ছিল, আল্লাহর নবী রাসূলগণের মর্যাদা অনেক ঊর্ধ্বে। তাঁরা বিভিন্নভাবে আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে পরীক্ষার সম্মুখীন হন, তাফসীরকার আল্লামা ইবনে কাছীর এর বর্ণনামতে ইউনুস (আ.) নদী পারাপারের সময় মাঝ নদীতে হঠাৎ নৌকা নদীতে ডুবে যাওয়ার উপক্রম হলে নাবিক বলল, একজনকে নদীতে ফেলে দিতে হবে। নইলে সবাইকে নদীতে ডুবে মরতে হবে। এ জন্য লটারী হলে পরপর তিনবার ইউনুস (আ.)’র নাম আসে ফলে নাবিকরা তাঁকে নদীতে নিক্ষেপ করেন, সাথে সাথে আল্লাহর হুকুমে বিরাটকায় এক মাছ এসে তাঁকে গিলে ফেলল, কিন্তু মাছের পেটের ভেতরে তিনি হজম হয়ে যাননি বরং এটা ছিল তাঁর জন্য একটি নিরাপদ স্থান। (ইবনে কাছীর, ক্বাসাসুল আম্বিয়া, ৮৭–৮৮)
ইমাম আল মাওয়ার্দী (রহ.) বলেন, মাছের পেটে তাঁর অবস্থান করাটা শাস্তি দানের উদ্দ্যেশে ছিলনা। এটা ছিল আল্লাহর পরীক্ষা (জামি ই লি আহকামিল কুরআন) মাছের পেটে কতদিন ছিলেন, তাফসীরকারদের বর্ণনা মতে মাছের পেটে কতদিন ছিলেন এ নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। কেউ বলেছেন এক ঘণ্টা ছিলেন, কেউ বলেছেন তিনি পূর্বাস্থে প্রবেশ করে অপরান্থে বেরিয়ে আসেন। কেউ বলেছেন তিন দিন কারো মতে সাত দিন, কারো মতে চৌদ্দদিন, কেউ বলেছেন ২০ দিন। (কাসাসুল আম্বিয়া, পৃঃ ২৪২)
ইমাম বায়হাকী (রহ.) এর বর্ণনামতে চল্লিশ দিন ছিলেন, ইমাম আহমদ প্রণীত “কিতাবুয যুহদ” এ উল্লেখ রয়েছে, ইমাম শাবী (রহ.)’র সামনে কেউ চল্লিশ দিনের কথা বললে তিনি প্রতিবাদ করে বলেন, হযরত ইউনুস (আ.) একদিনের অধিক ছিলেন না। ইউনুস (আ.) এর কওম ছিল নিনওয়া গ্রামের অধিবাসী। আল্লাহর আযাব প্রত্যক্ষ করার পর তারা ঈমান এনেছিল। হযরত কাতাদাহ বর্ণনা করেন, হযরত ইউনুস (আ.) যখন তাঁর কওমকে ছেড়ে চলে গেলেন তখন তাঁরা বুঝতে পারল তারা আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা পাবেনা, তখন তাদের অন্তরে তাওবা করার অনুভূতি জাগ্রত হলো তারা উলের কাপড় পরিধান করল, চল্লিশ দিন পর্যন্ত তারা কান্নাকাটি করল, আল্লাহ তা‘আলা তাদের অনুশোচনা ও বিশুদ্ধ তাওবা দেখে শাস্তি উঠিয়ে নিলেন।
হাদীস শরীফের আলোকে দুআ ইউনুসের ফযীলত:
পবিত্র আল কুরআনের সূরা আম্বিয়া এর ৮৭ নং আয়াতে উল্লিখিত দুআটি দুআ ইউনুস নামে প্রসিদ্ধ। বিপদাপদ থেকে মুক্তির জন্য এ দুই পাঠের ফযীলত হাদীস শরীফের আলোকে প্রমাণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, বিপদগ্রস্ত কোন মুসলমান যদি নেক মকসুদ হাসিলের নিমিত্তে উক্ত দুআটি পাঠ করে তবে আল্লাহ তা‘আলা তা কবুল করেন। (তিরমিযী, হাদীস: ৩৭৫২)
হে আল্লাহ! আমাদেরকে কুরআনের হিদায়ত দান করুন, নবী রাসূল আলাইহিমুস সালাম‘র আদর্শ অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসা–এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রী), বন্দর, চট্টগ্রাম; খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।













