হে মানব মন্ডলী! আল্লাহ তা’য়ালাকে ভয় করুন। খোদা প্রদত্ত ধন সম্পদের যাকাত আদায় করুন। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে নামাযের সাথে যাকাতকে সংযুক্ত করা হয়েছে। যাকাত অস্বীকার কারী কাফির হিসেবে গণ্য হবে। যে কৃপণতা ও অবহেলা বশত: যাকাত দানে বিরত থাকবে সে হবে গুনাহগার।
যাকাতের আভিধানিক অর্থ ও শরয়ী সংজ্ঞা:
সম্মানিত মুসলিম ভাইয়েরা! জেনে রাখুন “যাকাত” আরবী শব্দ। আরবী অভিধানে শব্দটি ছয়টি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে যথাক্রমে পবিত্রতা, প্রবৃদ্ধি অর্জন, কল্যাণ, প্রশংসা, অধিকার এবং ব্যয় করা । যাকাত একদিকে যাকত দাতার আত্মা পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করে এবং তার ধন সম্পদকেও পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন করে। যাকাত আদায়ের কারণে আল্লাহ তা’আলা যাকাত আদায়কারীর সম্পদ বৃদ্ধি করে দেন। পবিত্র কুরআনুল করীমের ১৯টি সূরায় ৩২টি আয়াতে যাকাত শব্দটি উল্লেখ করা হয়েছে। (লিসানুল আরব: ২য় খন্ড, পৃ: ৩৬)
যাদের উপর যাকাত ফরজ:
যাকাত ইসলামের পঞ্চ বুনিয়াদের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি। প্রত্যেক বিবেক সম্পন্ন প্রাপ্ত বয়স্ক মুসলিম নারী–পূরুষ যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়। তাদের উপর যাকাত দেয়া ফরজ।
স্বর্ণ, রৌপ্য ও নগদ অর্থের নিসাব:
স্বর্ণ হল বিশ মিছকাল দেশীয় হিসেবে সাড়ে সাত তোলা প্রায় (৮৮ গ্রাম) রৌপ্য হল দুইশত দিরহাম অর্থাৎ সাড়ে বায়ান্ন তোলা (প্রায় ৬১৩ গ্রাম) কিংবা কারো নিকট সমপরিমাণ মালামাল বা অর্থ সঞ্চিত থাকলে উল্লেখিত সম্পদের চল্লিশ ভাগের এক ভাগ বা শতকরা আড়াই ভাগ যাকাত দিতে হবে। ফকীহগণের সর্ব সম্মতিক্রমে কারো নিকট গড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্য বা সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ না থাকলেও সমপরিমাণ মূল্যের নগদ টাকা থাকলে তার উপর যাকাত ফরয হবে। (ফতোওয়ায়ে শামী)
যাকাত আদায়ের সময় নিয়ত করা ফরজ। নিয়ত না করলে যাকাত আদায় হবেনা। যাকাত গ্রহীতা যদি যাকাত গ্রহণের উপযোগী হয় তাকে যাকাত দেয়ার সময় যাকাতের মাল দেয়া হচ্ছে এ কথা বলার প্রয়োজন নেই।
আল কুরআনের আলোকে যাকাত:
মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ তা’য়ালা যাকাতের বিধান বর্ণনা প্রসঙ্গে আটটি খাতের কথা উল্লেখ করেছেন, এরশাদ হয়েছে “ সাদকা তো কেবল ফকীর ও মিসকীনদের জন্য এবং সাদকা সংক্রান্ত কাজে নিযুক্ত লোকদের জন্য, যাদের চিত্রাকর্ষণ করা হয় তাদের জন্য, দাসমুক্তির জন্য, ঋণ গ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে ও মুসাফিরদের জন্য এটা আল্লাহর বিধান আল্লাহ সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়।” (সূরা : তাওবা ৯: ৬০)
উপরোক্ত আটটি খাতের বর্ণনা সংক্ষিপ্ত ভাবে উপস্থাপন করা হলো:
১.ফকীর : এমন ব্যক্তিকে বলা হয় যার কাছে কিছু সম্পদ আছে তবে তা নিসাব পরিমাণ নয়, তার কাছে যা আছে তা দ্বারা প্রয়োজন পূরণ হয় না তাকে ফকীর বলে।
২. মিসকীন : নি:স্ব অসহায় যার কাছে কিছুই নেই তাকে বলা হয় মিসকীন। এমনকি খাবার ও শরীর আবৃত করার জন্য অন্যের মুখাপেক্ষী হতে হয়।
৩. আমিলুন : যাকাত সংগ্রহের কাজে নিযুক্ত লোকদের আমিলুন বলা হয়। যাকাত সংগ্রহ, হিসাব সংরক্ষণ যাকাত বিতরণ ইত্যাদি কাজে নিযুক্ত লোকদের যাকাতের অর্থ দেয়া যাবে।
৪. মুয়াল্লাফাতুল কুলুব: হৃদয় মন জয় করার উদ্দেশ্য নও মুসলিমদের সমস্যা দূর করার জন্য ইসলামের উপর অটল অবিচল রাখার স্বার্থে নওমুসলিমদের যাকাতের অর্থ দেয়া যাবে।
৫. দাসমুক্তি : মুক্তিপণ ধার্যকৃত দাসমুক্তির জন্য যাকাত দেয়া যাবে। শত্রুর হাতে বন্দী মুসলিমদের মুক্তকরণে এবং মিথ্যা মামলায় কারাবন্দী অভাবী লোকদের মুক্ত করণে যাকাত দেয়া যাবে।
৬. ঋণগ্রস্তদের ঋণ পরিশোধের জন্য কিংবা ঋণমুক্ত করার জন্য ঋণভারে জর্জরিত লোকদের মানসিকভাবে চিন্তামূক্ত করার জন্য যাকাত দেয়া যাবে।
৭. আল্লাহর পথে : অমুসলিমদের সাথে জিহাদকারী মুসলিম মুজাহিদদের উপকরণ সংগ্রহ যেখানে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত নেই সেখানে ইসলামের দাওয়াত পৌছানোর কাজে যাকাতের অর্থ দেয়া যাবে। আল্লাহর পথে দ্বীনি ইলম অর্জনকারী, দরিদ্র, অভাবী শিক্ষার্থীদের যাকাতের অর্থ দেয়া যাবে।
৮. মুসাফির: মুসাফির ব্যক্তি নিজ দেশে ধনী হলেও সফরত অবস্থায় যদি অভাবগ্রস্থ হয়ে পড়ে তাকে যাকাত দেয়া যাবে।
রমজানে যাকাত দেয়া উত্তম :
নিসাব পরিমান সম্পদের মালিক মালিকানার এক বৎসর পূর্ণ হলে তখনি যাকাত আদায় করবে। নির্ধারিত কোন মাসে যাকাত প্রদান অপরিহার্য নয় তবে রমজানুল মুবারকে প্রত্যেক নেক আমলের সওয়াব দশগুণ হতে সাতশগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয় বিধায় অধিক সওয়াব লাভের আশায় রমজানে আদায় করা উত্তম।
যাকাত আদায়ে মাল পবিত্র ও পরিশুদ্ধ হয়:
যাকাত আদায়ে ধন–সম্পদ পবিত্র হয় এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’য়ালা এরশাদ করেছেন “ তাদের সম্পদ থেকে সাদাকা গ্রহণ করবেন, এর দ্বারা আপনি তাদেরকে পবিত্র করবেন এবং পরিশোধিত করবেন। আপনি তাদের জন্য দোয়া করবেন, আপনার দোয়া তাদের জন্য শান্তির বাহক, আল্লাহ সর্ব শ্রোতা সর্বজ্ঞ। (আল কুরআন: ৯: ১০৩)
আল্লাহ তায়ালা আরো এরশাদ করেছেন, “আর যাদের সম্পদে নির্ধারিত হক রয়েছে প্রার্থী ও বঞ্চিতের।” (আল কুরআন ৭০: ২৪–২৫)
যাকাত অনাদায়ে জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তি:
যাকাত অনাদায়ীদের ব্যাপারে কঠোর শাস্তির বার্তা বিঘোষিত হয়েছে। পবিত্র কুরআনুল করীমে এরশাদ হয়েছে “ যারা স্বর্ণ–রৌপ্য পুঞ্জীভূত করে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না তাদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তির সংবাদ দাও, যেদিন জাহান্নামের আগুণে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তা দ্বারা তাদের ললাট পাশ্বদেশ ও পৃষ্ঠদেশে দাগ দেয়া হবে। সেদিন বলা হবে, এটাই তা যা তোমরা নিজেদের জন্য পূঞ্জীভূত করতে। সুতরাং যা পূঞ্জীভূত করেছিলে তা আস্বাদন কর। (আল কুরআন: ৯: ৩৪–৩৫)
হাদীসের আলোকে যাকাত অনাদায়ীর করুণ পরিণতি:
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন রসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছ থেকে ধন–সম্পদ পেয়েছে কিন্তু সে এর যাকাত আদায় করেনি কিয়ামতের দিন ঐ ধন–সম্পদ এমন বিষধর সর্পে পরিণত হবে। যার মাথার উপর থাকবে দুটি কালো দাগ। এ সর্প সে ব্যক্তির গলায় পেছিয়ে দেয়া হবে। অত:পর সাপ উক্ত ব্যক্তির গলায় ঝুলে তার দু গালে কামড়াতে থাকবে এবং বলবে আমি তোমার মাল আমি তোমার সঞ্চিত সম্পদ। (বুখারী ও নাসায়ী হাদীস নং ২৪৮২)
যাদেরকে যাকাত দেয়া যাবে এবং দেয়া উত্তম:
নিজের ভাই বোন, ভাই বোনের ছেলে মেয়ে, নিজ চাচা, ফুফু, তাদের ছেলে মেয়ে, নিজ মামা খালা ও তাদের ছেলে মেয়ে অতপর অন্যান্য আত্মীয় স্বজন অত:পর প্রতিবেশীকে দেয়া উত্তম।
যাদেরকে যাকাত দেয়া জায়েজ হবে না:
১. নিসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী ব্যক্তিকে যাকাত দেয়া যাবে না। ২. নিজের মূল যেমন পিতা মাতা, দাদা দাদী, নানা নানী, ছেলে মেয়ে, নাতি নাতনী প্রৌপুত্র প্রৌপুত্রী এদেরকে যাকাত দেয়া যাবে না। অনুরূপ সাদকা ফিতরা মান্নত কাফফারা ওদেরকে দেয়া যাবে না, তবে নফল সাদকা ওদেরকে দেয়া যাবে বরং দেয়াটা উত্তম। (আলমগীরি, রদ্দুল মোহতার, বাহারে শরীয়ত, খন্ড: ৫)- স্ত্রী স্বামীকে, স্বামী স্ত্রীকে যাকাত দিতে পারবেনা। (দুররে মুখতার আলমগীরি)
যাকাতের টাকা দিয়ে বেতন ভাতা দেয়া যাবে না:
মাদরাসা মসজিদে কর্মরত শিক্ষক–কর্মচারী, খতীব ইমাম মুয়াজ্জিনের বেতন ভাতা যাকাতের টাকা থেকে আদায় করা জায়েজ নেই। যাকাতের ক্ষেত্রে শর্ত হলো যাকাত বিনিময় ছাড়া দিতে হবে, কাজের বিনিময়ে যাকাত দেয়া শরীয়তে জায়েজ নেই। (দুররুল মুখতার, খন্ড: ২, পৃ: ৩৪৪, ফাতওয়ায়ে আলমগীরি, খন্ড:১, পৃ: ১৯০)
রাসূলুল্লাহর বংশধরদেরকে যাকাত দেওয়া যাবে না:
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র বংশধর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ১. হযরত হারেস ইবনে আবদুল মুত্তালিব (রা.) এর আওলাদগন। ২. হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব (রা.) এর আওলাদগন। ৩. হযরত আলী ইবনে আবী তালিব (রা.) এর আওলাদগন। ৪. হযরত জাফর ইবনে আবী তালিব (রা.)’র আওলাদগন। ৫। হযরত আকীল ইবনে আবি তালিব (রা.)’র বংশধরকে যাকাত দেওয়া যাবে না। (আলমগীরি, খন্ড:১, পৃ: ১৮৯, বাহারে শরীয়ত: ৫ম খন্ড, পৃ: ৮৬)
তবে সায়্যিদ বংশের লোক যদি গরীব বা অভাবী হয় তাঁদেরকে যাকাত ও ওয়াজিব সাদকা ব্যাতীত আর্থিক ভাবে তাঁদের সাহায্য সহযোগিতা করা এবং তাঁদের দু:খ কষ্ট ও মুসিবত দূর করা অনেক বড় সওয়াবের কাজ। এটা নবীজির ভালোবাসার সর্বেত্তম প্রমাণ নতুবা পরকালে জবাব দিহিতা ও অপমানিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। (ফাতহুল কদীর, খন্ড:২, পৃ: ২১২)
মুরতাদকে যাকাত দেওয়া জায়েজ নেই:
যে ইসলাম ত্যাগ করেছে সে মুরতাদ হয়ে গেছে, তার বেঁচে থাকার অধিকার নেই। ইসলামী রাষ্ট্রের দন্ডবিধি অনুযায়ী তাকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হবে। সে মুরতাদ হিসেবে গণ্য, তাকে যাকাত দেয়া যাবেনা। (বাদায়েউস সানায়ে, খন্ড:২, পৃ: ৪৯)
শীয়াদেরকে যাকাত দেয়া যাবে না: শীয়াদের ইসনা আশারিয়া সম্প্রদায় তারা “নিকাহে মুতা” সাময়িক বিয়ে করা বৈধমনে করে। হযরত আবু বকর, হযরত ওমর ফারুক প্রমূখ সাহাবায়ে কেরামকে মুরতাদ হওয়ার আকিদা পোষন করার কারণে তারা ইসলামের গণ্ডি থেকে বের হয়ে গেছে। তাদের যাকাত দেয়া জায়েজ নেই। কাফির, মুরতাদকে যাকাত দেওয়া জায়েজ নেই, অনুরূপ শিয়াকেও যাকাত দেওয়া জায়েজ নেই। (আলমগীরি, খন্ড:২, পৃ: ২৬৪)
বদ মাযহাবীকে যাকাত দেওয়া জায়েজ নেই: আল্লাহর প্রতি অসম্মান ও শানে রিসালাতের প্রতি মানহানি উক্তিকারী ও বদমাযহাবী সম্প্রদায় যারা নিজেদেরকে মুসলমান দাবী করে ওদেরকে যাকাত দেওয়া হারাম, কঠোর হারাম। (দুররুল মোখতার, বাহারে শরীয়ত, খন্ড:৫, পৃ: ৮৮)
কাদিয়ানীকে যাকাত দেওয়া জায়েজ নেই: কাদিয়ানী সম্প্রদায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বশেষ নবী হওয়াকে স্বীকার করেনা। খতমে নবুওয়তকে অস্বীকার করায় তারা কাফের। কাদিয়ানীদের যাকাত দেওয়া কঠিন গুনাহ, তাদের যাকাত দিলে আদায় হবেনা, তাদেরকে কোন প্রকার সাদকা দেওয়াও জায়েজ নেই। (আলমগীরি, খন্ড:১, পৃ: ১৮৮, দুররুল মুখতার, খন্ড:২, পৃ: ৩৫১, ফতোওয়ায়ে রিজভীয়্যাহ, খন্ড:৯ম)
আল্লাহ তা’আলা কুরআন হাদীসের আলোকে শরয়ী নির্দেশনা মোতাবেক যাকাতের বিধান অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসা–এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রী), বন্দর; খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।












