প্রিয় মুসলিম ভাইয়েরা!
আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করুন! নবী রাসূল আলাইহিমুস সালাম এর জীবন কর্ম থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুন। তাঁদের জীবনাদর্শ অনুসরণ করুন। জেনে রাখুন, হযরত মূসা আলাইহিস সালাম সৌভাগ্যবান নবী যিনি সরাসরি আল্লাহর সাথে কথা বলার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। কলীমূল্লাহ উপাধিতে তিনি ভূষিত হয়েছিলেন।
হযরত মুসা (আ.)’র পরিচিতি:
নাম: মূসা কিবতি ভাষায় “মূ” শব্দের অর্থ পানি, আর “সা” শব্দের অর্থ গাছ বা কাঠ। নামকরণ: ফিরআউনের হাত থেকে রক্ষার জন্য জন্মের পরেই তাঁকে কাঠের সিন্ধুকে রেখে নদীর পানিতে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছিল এ কারণে এ নামে নামকরণ করা হয়েছে। খ্রি. পূর্ব ১৫৭১ সালে হযরত মুসা (আ.) মিশরে জন্মগ্রহণ করেন, মূসা (আ.)’র পিতার নাম ইমরান, হযরত ইউসূফ (আ.)’র ৪৫০ বছর পর তিনি মিশরে জন্মগ্রহণ করেন। হযরত মূসা (আ.) ছিলেন হযরত ইবরাহীম (আ.) এর বংশধর। তাঁর বংশ তালিকা নিম্নরূপ।
ইমরান ইবন ইয়াসহার ইবন কাহাছ ইবন গাযির (য়াসহার) ইবন লাবী ইবন ইয়াকুব ইবন ইসহাক ইবন ইবরাহীম (আ.)। পবিত্র কুরআনে ১৩৫ জায়গায় হযরত মূসা (আ.) এর নাম উল্লেখ হয়েছে। তিনি খ্রি. পূর্ব ১৪০০ সালে ১৩০ বছর, কারো কারো মতে ১২০ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন। বায়তুল মুকাদ্দাসের পাশ্বে তাকে দাফন করা হয়। (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৪৩৭৪)
মূসা (আ.)’র মাতার নাম সম্পর্কে চারটি মত পাওয়া যায়, ১. মিহয়ানা বিনতে ইয়াসহার ইবনে লাবী, ২. বাযাখত, ৩. বারখা, ৪. ইউহানায চতুর্থ মতটি বিশুদ্ধ (ইতকান) হযরত মূসা (আ.) এর দেহ মুবারক তের হাত লম্বা ছিল। (তাবাকাতে ইবনে সাদ)
মিশরের শাষক ফিরআউনের প্রতি হযরত মুসা (আ.) কে প্রেরণ করেন:
প্রাচীন মিশরের রাজা বাদশাহ শাষকদের উপাধি ছিল ফিরআউন। তাঁর প্রতি আল্লাহ তা’আলা মূসা (আ.) কে প্রেরণ করেন, ইয়াকুব (আ.)’র আরেকটি নাম ছিল ইসরাইল, তার অর্থ আল্লাহর বান্দা। ইয়াকুব (আ.)’র বংশধরগন বনী ইসরাঈল নামে পরিচিত। হযরত ইউসূফ (আ.) এর সময় থেকেই বনী ইসরাঈলের লোকজন মিশরে বসবাস করতে থাকে। মিশরের শাষকগন বনী ইসরাঈলের সংখ্যা বৃদ্ধিতে আতংকগ্রস্থ হয়ে পড়ে, জনসংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকলে তারা শক্তিশালী হয়ে উঠবে, তাদের রাজত্বের জন্য হুমকী হয়ে দাঁড়াতে পারে, এ আতঙ্কে ফিরআউন এক নৃশংস অমানবিক আদেশ জারী করল যে, ইসরাঈলী পরিবারে কোন ছেলে সন্তান জন্মগ্রহণ করলেই তাকে হত্যা করতে হবে। আল্লাহ তা’আলা সেই দিকে ইঙ্গিত করে এরশাদ করেছেন, “এবং স্মরণ করো! যখন আমি তোমাদের কে ফিরআউনী সম্প্রদায় থেকে নিস্কৃতি দান করেছি যারা তোমাদেরকে মর্মান্তিক যন্ত্রণা দিত। তোমাদের পুত্রদের জবেহ করতো আর তোমাদের কন্যাদের কে জীবিত রাখতো এবং এর মধ্যে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে এক পরীক্ষা।” (অথবা এটি ছিলো মহা পুরস্কার) সূরা: বাক্বারা, আয়াত: ৪৯)
বর্ণিত আয়াতের ব্যাখ্যায় হাকীমুল উম্মত মুফতি আহমদ ইয়ার খান নঈমী (রহ.) প্রণীত “তাফসীরে নূরুল ইরফানে” উল্লেখ হয়েছে, ফিরআউন স্বপ্ন দেখেছিলো যে, বায়তুল মুকাদ্দাসের দিক থেকে একটা আগুন জ্বলে উঠলো যা কিবতিদের ঘরবাড়ী জ্বালিয়ে দিল, তাঁর গণকরা তাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিল বণী ইসরাঈলে এমন এক সন্তান জন্ম গ্রহণ করবে যে তোমাকে এবং তোমার সম্প্রদায় কিবতিদের কে ধ্বংস করে দিবে। ফিরআউন এ ব্যাখ্যা শুনে সিদ্ধান্ত নিল এবং আদেশ জারী করল এখন থেকে বনী ইসরাইলীদের ঘরে কোন পুত্র সন্তান ভূমিষ্ট হলে তাকে হত্যা করা হবে। কন্যা সন্তানদের তার সেবা করার জন্য জীবিত রাখা হবে। এভাবে সত্তর হাজার ছেলে সন্তান হত্যা করল, আর নব্বই হাজার গর্ভপাত ঘটাল। অতঃপর ক্বিততীগন তাকে অভিযোগ করলো এ ভাবে শিশু হত্যা করা হলে ইসরাঈলী নি:শেষ হয়ে যাবে, আমাদের সেবা করার জন্য কাউকে পাওয়া যাবেনা। তখন ফিরআউন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে পূনরায় নতুন আদেশ জারী করল “এক বছর ছেলে সন্তান হত্যা করা হোক” আর এক বছর হত্যা করা মওকুফ রাখা হোক। আল্লাহর কী বিস্ময়কর শান! হত্যা মওকুফ রাখার বছর আল্লাহর হযরত মুসা (আ.) এর বড় ভাই হারুন (আ.) কে প্রেরণ করেন আর হত্যার বছর হযরত মূসা (আ.) ভূমিষ্ট হলেন।
ফিরআউনের ঘরে মূসা (আ.)’র প্রতিপালন:
মূসা (আ.) ভূমিষ্ট হওয়ার পর ফিরআউনের ভয়ে মূসা (আ.) এর মা তাঁকে লুকিয়ে রাখতে চাইলেন। ফিরআউনের লোকেরা নবজাত শিশুদের হত্যার জন্য অনুসন্ধান চালাতো, তিনি শিশু হযরত মূসা (আ.) কে তিন মাস গোপন করে রাখলেন, অতঃপর অলৌকিক প্রেরণা লাভ করে বিশেষভাবে নির্মিত একটি সিন্দুকের ভেতর হযরত মূসা (আ.)কে রেখে সিন্দুকটি নদীতে নিক্ষেপ করলেন, এক পর্যায়ে নদীর অপর প্রান্তের তীরে সিন্দুকটি ভীড়ল ফিরআউন পরিবারের এক লোকের নিকট তা দৃশ্যমান হলে তা উঠিয়ে নিলেন তিনি ফুটফুট নূরানী চেহেরা (মুসা (আ.) কে দেখে ফিরআউনের স্ত্রীর নিকট হযরত মূসা (আ.) কে নিয়ে গেলেন। ফিরআউনের স্ত্রী শিশু হযরত মূসা (আ.) কে পেয়ে অত্যন্ত আনন্দিত হলেন, নিজ সন্তান হিসেবে গ্রহণ করলেন, কিন্তু তিনি কোনো মহিলার দুধ পান করছেন না, এ অবস্থায় সকলে চিন্তিত হয়ে পড়লো, এমন সময় হযরত মূসার বোন মারইয়াম ফিরআউনের প্রাসাদে গেলেন এবং শিশুটিকে প্রতিপালনের জন্য একজন ধাত্রীর প্রস্তাব দিলেন প্রস্তাব গ্রহণ করা হলো, হযরত মূসা (আ.) ধাত্রীর বুকের দুধ আগ্রহের সাথে পান করতে লাগল। সকলে চিন্তামূক্ত হল, এ ধাত্রী আর কেউ নন, তিনি ছিলেন মূসা (আ.) এর মহীয়সী জননী। আল্লাহর অপরিসীম কৃপা ও কুদরতে মূসা তাঁর মায়ের কোলে ফিরে আসলেন। প্রমানিত হলো আল্লাহ যাঁকে রক্ষা করতে চান পৃথিবীর কোনো শক্তি তাকে ধ্বংশ করতে পারেনা। শক্রর ঘরে মূসা (আ.) এর লালন পালন তারই উজ্জ্বল প্রমান।
হযরত মূসা (আ.)’র দ্বীনি দাওয়াত:
মূসা (আ.) ফিরআউনের প্রাসাদেই বয়োপ্রাপ্ত হন। ফিরআউনের কবল থেকে জাতিকে মুক্ত করার লক্ষ্যে শিরকী কর্মকান্ড চিন্তা চেতনা ধ্যান ধারণার বিরুদ্ধে ফিরআউন ও তাঁর জাতিকে সতর্ক করার উদ্দ্যেশে মহান আল্লাহ তা’আলা তাঁর রাসূল হিসেবে হযরত মূসা (আ.) কে প্রেরণ করেন, আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, “নিশ্চয় আমি মুসা (আ.) কে আমার নিদর্শনাদিসহ পাঠিয়েছি তাঁকে এমর্মে আদেশ করেছি যে, আপনার কওমকে অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে আসুন। এবং তাদেরকে আল্লাহর দিনসমূহের শিক্ষামূলক ঘটনাগুলো শুনিয়ে উপদেশ দিন, ঐসব ঘটনার মধ্যে প্রত্যেকের জন্যই নিদর্শন রয়েছে যে সবর করে এবং শোকর করে। (সূরা: ইবরাহীম, আয়াত: ৫)
ফিরআউনের প্রতি মূসা (আ.)’র দ্বীনি দাওয়াত:
দাওয়াতী কাজকে সফল করার লক্ষ্যে হিকমত পূর্ণ পন্থা অবলম্বন জরুরি। উগ্রতা নয় শালীন, আচরণ ও নসীহত পূর্ণ দ্বীনি বার্তা অত্যন্ত ফলপ্রসূ। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, “আপনারা দু’জনই (মূসা ও হারুন) ফিরাউনের কাছে যান সে বিদ্রোহী হয়ে গেছে ফিরাউনকে নরম কথা বলুন, সম্ভবত: সে নসীহত শুনবে অথবা ভয় পাবে। (সূরা: ত্বা–হা, আয়াত: ৪৩–৪৪)
আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা প্রতিকূল অবস্থায় ধৈর্যধারণ : দ্বীন প্রচারে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সর্বত্র আল্লাহর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মূলনীতি বিশ্বাস রাখার নামই তাকওয়ার অনন্য বৈশিষ্ট্য, মুসা (আ.) তাঁর জাতিকে আল্লাহ প্রদত্ত নির্দেশনার প্রতি অনুগত থাকার দাওয়াত প্রচার করেছিলেন। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, “মুসা (আ.) তাঁর কাওমকে বললেন, আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করো! এবং ধৈর্য ধারণ করো, জমিন তো আল্লাহরই, তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে চান তাকেই এর ওয়ারিশ বানিয়ে দেন। পরকালের শুভ পরিণাম ফল মুত্তাকীদের জন্যই। (সূরা: আ’রাফ, আয়াত: ১২৮)
সর্বাবস্থায় আল্লাহর উপর নির্ভরতা মু’মিনের চরিত্র: মু’মিনদের কাজ হলো দ্বীনের উপর অটল অবিচল থাকা। আল্লাহর নির্দেশিত ও নবী রাসূলগণের প্রদর্শিত জীবনাদর্শের ভিত্তিতে আল্লাহর প্রতি চুড়ান্ত আনুগত্য, দ্বীনের পথে নানাবিধ বিপদাপদ মুসীবত, সংকই প্রতিকূলতা প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে দ্বীনের অগ্রযাত্রা কে ত্বরান্বিত করা। মু’মিনের অনুপম চরিত্র। মহান আল্লাহ হযরত মুসা (আ.) এর দ্বীনি দাওয়াতে বৈশিষ্ট্য বর্ণনা প্রসঙ্গে এরশাদ করেছেন, “হযরত মূসা (আ.) তাঁর কাওমকে বললেন, তোমরা যদি সত্যিই আল্লাহর উপর ঈমান এনে থাক তোমরা তারই উপর ভরসা করো, যদি তোমরা মুসলমান হয়ে থাক। (সূরা: ইউনুস, আয়াত: ৮৪)
অহংকার দাদ্ভিকতা পতনের মূল: অহংকারী ও দাম্ভিক মানুষের পতন অনিবার্য, অহংকারীর পতন ও ধ্বংস কেউ ঠেকাতে পারেনা। অহংকারী ব্যক্তি নিজের দুর্বলতা অক্ষমতা অন্যায় অপরাধ দেখেনা। নিজকে বড় শক্তিশালী মনে করে আইন ও শাস্তির উর্ধে মান করে। এমন জঘন্য স্বভাব ও নিকৃষ্ট চরিত্রের লোক ছিলো ফিরআউন। হযরত মূসা (আ.) ফিরআউনের নিকট দ্বীনি দাওয়াত পেশ করলে ফিরআউন দম্ভভবে দ্বীনি দাওয়াত প্রত্যাখান করলো, আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, ফিরআউন বলল, রাব্বুল আলামীন কি? হযরত মূসা (আ.) বললেন, তিনি হলেন, আসমান যমীন ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী রব প্রতিপালক, যদি তোমরা নিশ্চিত বিশ্বাসী হও। (সূরা: আশ শু’আরা, আয়াত: ২৩–২৬)
ফিরআউনের স্ত্রী ঈমানদার ছিলেন, ফিরআউনের স্ত্রীর নাম আছিয়া। তিনি ঈমানদার ছিলেন। তিনি হযরত মূসা (আ.) এর ফুফু মতান্তরে চাচী ছিলেন। (ইবন কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল আজীম, ২য় খন্ড, পৃ: ৪৩৯)
ফিরআউনের স্ত্রী আছিয়ার মর্যাদা হাদীস শরীফে উল্লিখিত হয়েছে, হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, সমগ্র বিশ্বে চারজন নারী সর্বোত্তম। মারইয়াম বিনতে ইমরান, ফিরআউনের স্ত্রী আছিয়া, খাদীজা বিনতে খুয়াইলিদ এবং ফাতিমা বিনতে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আল্লাহ তা’আলা আমাদের কে নবী রাসূলগণের দ্বীনি দাওয়াতের আদর্শ অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসা–এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রী); খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।












