প্রিয় মুসলিম ভাইয়েরা!
আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করুন, জেনে রাখুন, ইমামুল আম্বিয়া সৈয়্যদুল মুরসালীন রাহমাতুল্লীল আলামীন সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ তা’আলা অসংখ্য অগণিত মু’জিযা দানে ধন্য করেছেন। জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে তাঁর প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়াসাল্লামকে মি’রাজ দান করা মহান আল্লাহর কুদরত ও রাসূলুল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র বিস্ময়কর মু’জিযা।
মি’রাজ এর শাব্দিক ও শরয়ী অর্থ:
মি‘রাজ শব্দটি আরবী এক বচন। বহুবচন ‘মা‘আরিজ‘ এর অর্থ সিঁড়ি, উর্ধ্বগমন, আরোহণ, উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে উত্তরণ, শ্রেষ্ঠতম সম্মান লাভ ইত্যাদি। শব্দটি জ্বীম, রা, আইন ধাতু থেকে উৎপত্তি। শব্দটি আল কোরআনে উল্লেখ রয়েছে-“ফেরেশতা এবং রূহ আল্লাহর নিকট ওঠে।”
(আল ক্বোরআন, সুরা মা‘আরিফ, আয়াত–৪)
ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় মি‘রাজের সংজ্ঞা, আল্লাহ্ জাল্লাজালালুহু‘র ইচ্ছায় রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম–এর উর্ধ্বলোকে গমনকেই মি‘রাজ বলা হয়।
পবিত্র কুরআনের আলোকে মি’রাজ:
মি‘রাজ পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ বিস্ময়কর ঘটনা। এ ঘটনা বাস্তব ও সত্য, স্বয়ং আল্লাহ্ তা‘আলা পবিত্র কোরআনে এ ঘটনার বিবরণ দান করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেছেন, পরম পবিত্র মহিমাময় সত্বা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রি বেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদুল হারাম হতে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার চারদিকে আমি পর্যাপ্ত বরকত দান করেছি, যাতে আমি তাকে কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দিই। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। (সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত–১)
হাদীস শরীফেল আলোকে মি’রাজ:
হযরত আনাস ইবনে মালিক রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, আমার সম্মুখে বুরাক উপস্থিত করা হলো, তা শ্বেত বর্ণের জন্তু। গাধার চেয়ে বড় ও খচ্চর অপেক্ষা ছোট। তার দৃষ্টি যতদূর যেতো সেখানে পা রাখতো। আমি বুরাকে আরোহণ করে বায়তুল মোকাদ্দাস এসে পৌঁছি। অন্যান্য নবীগণ সেখানে নিজেদের সওয়ারি (বাহন) বাঁধতেন। আমি সেখানে আমার বাহনকে বাঁধলাম। অতঃপর আমি বায়তুল মোকাদ্দাস মসজিদে প্রবেশ করে দু‘রাকাআত নামায আদায় করলাম। অতঃপর মসজিদ থেকে বেরিয়ে পড়ি, তখন জিবরাঈল (আলায়হিস সালাম) আমার নিকট একটি মদের পাত্র ও একটি দুধের পাত্র নিয়ে আসেন, আমি দুধের পেয়ালা গ্রহণ করলাম। তখন হযরত জিবরাঈল আলায়হিস্ সালাম বললেন, আপনি ফিতরাত তথা স্বভাবধর্ম ইসলাম গ্রহণ করেছেন। অতঃপর জিবরাঈল (আলায়হিস সালাম) আমাকে নিয়ে উর্ধ্বজগতে যাত্রা শুরু করলেন, জিবরাঈল (আলায়হিস সালাম) আসমানের দরজা খুললেন, জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি কে? বললেন, আমি জিবরাঈল, আবার জিজ্ঞেস করা হলো, আপনার সাথে কে রয়েছেন, তিনি বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম, পুনরায় জিজ্ঞেস করা হলো, তাঁকে কী ডেকে পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, তাঁকে ডেকে পাঠানো হয়েছে। (অতঃপর আসমানের দরজা খুলে দেয়া হলো।‘ (সহীহ মুসলিম শরীফ, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা–১৪৫)
ইসরা ও মি‘রাজ:
আরবী ভাষায় রাত্রিকালে ভ্রমণকে ‘ইসরা‘ বলা হয়। মক্কা শরীফ মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত ভ্রমণকে ইসরা বলে। যা কোরআন দ্বারা প্রমাণিত এর অস্বীকারকারী কাফির। মসজিদে আকসা থেকে আসমান সমূহ ও লা–মকানের ভ্রমনকে মি‘রাজ বলা হয়। যা মশহুর হাদীস দ্বারা প্রমাণিত, এর অস্বীকারকারী বিদআতী ও ফাসিক।
(শায়খ আবদুল হক মুহাদীস দেহলভী, মাদারিজুন নবুওয়াত, ১ম খন্ড)
হযরত খাজা নিজাম উদ্দীন আউলিয়া দেহলভী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেন, মসজিদে হারাম থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত ভ্রমনকে ইসরা, বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে আসমান সমূহের ভ্রমনকে মি‘রাজ এবং আসমান থেকে কা‘বা কাউসাইন পর্যন্ত ভ্রমনকে ‘ইরাজ‘ বলা হয়। বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থে এর বিস্তারিত বিবরণ এসেছে। (খাজা নিজাম উদ্দীন ফাওয়ায়িদুল ফুয়াদ, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা ৩৫৮, তাফসীর ইবনে কাসীর, ২ খন্ড, পৃষ্ঠা–২৫৮)
মি‘রাজের যাত্রা:
হযরত ইবনে হাজর রাহমাতুল্লাহি আলায়হি বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম হযরত উম্মেহানীর গৃহে আরাম করছিলেন, সেখান থেকে মি‘রাজের যাত্রা হয়েছিল। (শরহে মাওয়াহিব, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা–৩০৭)
মি‘রাজ কখন কোন মাসে কোন তারিখে সংগঠিত হয়:
সহীহ বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাগ্রস্থ “ফাতহুল বারী‘র মি‘রাজ অধ্যায়ে উল্লিখিত বর্ণনা অনুযায়ী হয়রত উজ্জ্বল মু‘মেনীন খাদীজা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহার ওফাতের পর মি‘রাজ হয়েছে। রাসুলুল্লাহর নুবুওয়তের প্রকাশ বর্ষে তায়েফ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর কোন এক মাসে সংগঠিত হয়েছে, মাসের ব্যাপারে রবিউল আউয়াল অথবা রবিউস সানী, রজব, অথবা রমজান বা শাওয়াল মাসে হয়েছে মর্মে পাঁচটি মত পাওয়া যায়। প্রসিদ্ধ মতানুসারে রজব মাসের সাতাশ তারিখ রাতে হয়েছে। (শরহে মাওয়াহিব, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা–৩০৭)
প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দীস দেহলভী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি এ প্রসঙ্গে বর্ণনা করেন, জেনে রাখুন, আরব দেশের জনগণের ঘরে ঘরে প্রসিদ্ধ ছিল যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম‘র মি‘রাজ হয়েছিল রজবের সাতাশ তারিখে। রজবের মৌসুম আরববাসীদের মাঝে সুপ্রসিদ্ধ। (মা–সাবাতা বিসসুন্নাহ, পৃষ্ঠা–১০৯)
প্রখ্যাত তাফসীরকার আল্লামা ইসমাঈল হক্কী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি বর্ণনা করেন, শবে মি‘রাজ হলো ২৭ রজব সোমবার দিবাগত রজনীতে। এ রজনীতে মুসলমানদের আমল জারি আছে। (ইসমাইল হক্কী তাফসীর রহুল বয়ান, ৫ম খন্ড, পৃষ্ঠা–১০৫)
মি‘রাজ রজনীতে বুরাক ছিল জান্নাতী বাহন:
বুরাক আরবী শব্দ, বারকুন শব্দ থেকে উদ্ধৃত, যার অর্থ বিদ্যুৎ। বিজ্ঞানীদের গবেষণায় আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে এক লক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইল। বুরাকের গতি এর চেয়েও অকল্পনীয় দ্রুত। বুরাক প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, এটি ছিল খাচ্ছর হতে ছোট, গাধা থেকে বড়। সাদা রং এর লম্বা আকৃতি সম্পন্ন, এর গতি ছিল বিদ্যুৎসম। এর গতি সীমার অবস্থা এমন ছিলো যে, দৃষ্টি সীমায় নিজের কদম রাখতো উঁচুতে উঠার সময় তার হাত ছোট এবং পা লম্বা হয়ে যেতো। আর নীচে নামার সময় হাত লম্বা ও পা ছোট হয়ে যেতো। যার কারণে উভয় ক্ষেত্রে তার পিট সমান থাকতো এতে আরোহীর কোন ধরনের কষ্ট হতো না। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩৮৮৭)
বুরাক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে বায়তুল মুকাদ্দাসের উদ্দ্যেশে রওয়ানা হলো।
জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে মি‘রাজ:
রাসূলুল্লাহর মি‘রাজ স্বপ্নযোগে ছিল না, নবীজির মি‘রাজ ছিল সশরীরে জাগ্রত অবস্থায়। মি‘রাজ যদি স্বাপ্নিক হতো অবিশ্বাস বা বিস্ময়ের কোন কারণ ছিল না। আয়াতে করীমায় “আবদ” দ্বারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম–এর আত্মা ও দেহের সমন্বিত সত্ত্বাকে বুঝানো হয়েছে। পবিত্র ক্বোরআন ও মুতাওয়াতির হাদীস দ্বারা এ কথা প্রমাণিত। মি‘রাজ রজনীতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম সশরীরে জাগ্রত অবস্থায় স্বচক্ষে আল্লাহকে দেখেছেন। আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেছেন, তাঁর দৃষ্টি বিভ্রম হয়নি এবং তাঁর দৃষ্টি লক্ষ্যচ্যুত হয়নি।( সূরা নাজম, আয়াত–১৭–১৮)
সশরীরে মি‘রাজ একবার:
নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম‘র চৌত্রিশ বার মি‘রাজের বর্ণনা পাওয়া যায় একবার সশরীরে। শায়খে আকবর রাহমাতুল্লাহি আলাহি বর্ণনা করেন, রাসুলে করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম–এর মি‘রাজ হয়েছিল চৌত্রিশ বার, একবার সশরীরে। বাকীগুলো রূহানীভাবে হয়েছিল। হাদীস শরীফে আরো এরশাদ হয়েছে, প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, নিশ্চয় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রভুকে দু‘বার দেখেছেন, একবার স্বচক্ষে, আরেকবার স্বীয় অন্তরে। (আল্লামা বুরহান উদ্দীন হালভী, সীরাতে হালভীয়া, পৃষ্ঠা–৪০৪, তাফসীরে জালালাইন পাদটীকা, পৃষ্ঠা–২২৮)
নিম্ন বর্ণিত হাদীস শরীফ থেকেও নবীজি কর্তৃক আল্লাহর দিদার ও দর্শন সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত। হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তোমরা কি আশ্চর্যবোধ করছো? হযরত ইবরাহীম আলায়হিস্ সালাম–এর জন্য বন্ধুত্বতা, হযরত মুসা আলায়হিস সালাম–এর জন্য কথোপকথন ও হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম–এর জন্য প্রত্যক্ষ দর্শন। (ইমাম যুরকানী, মাওয়াহিব লাদুনিয়া, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা–৩৭)
হাদীস শরীফে আরো এরশাদ হয়েছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, আমি আমার মহিমাময় আল্লাহ্ তা‘আলাকে সুন্দরতম (কুদরতে) আকৃতিতে দেখেছি। তিনি আমার দু‘কাঁধের মাঝখানে স্বীয় কুদরতের হাত রাখলেন, আমি তাঁর কুদরতি হাতের শীতলতা আমার বক্ষস্থলে অনুভব করলাম। অতঃপর আমি আসমান ও যমীনের সব বিষয়ে অবগত হয়েছি। (শরহে মুসলিম ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা–৯৭, ফাতহুল বারী ৮ খ, পৃষ্ঠা–৬০৮, শিফা শরীফ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা–১৯৬।)
মুসলিম শরীফের ব্যাখ্যাকার ইমাম নভবী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি বর্ণনা করেছেন, নিশ্চয় অধিকাংশ ওলামাদের মতে প্রণিধানযোগ্য অভিমত হলো যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম মি‘রাজ রজনীতে কপালের দু‘চোখে আল্লাহকে দেখেছেন। (মিশকাত শরীফ, পৃষ্ঠা–৬৮, আনোয়ারুল বয়ান, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা–৪৩৭, ইমাম নববী, শরহে মুসলিম, পৃষ্ঠা–১৭) আল্লাহ্ তা‘আলা আমাদেরকে মি‘রাজের মাধ্যমে নবীজির মর্যাদা বুঝার তাওফিক দান করুন–আমীন।
লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসা–এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রি), বন্দর, চট্টগ্রাম। খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।











