কুরআন ও হাদীসের দৃষ্টিতে গীবতের পরিণতি
সম্মানিত মুসলিম ভাইয়েরা!
আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করুন! আল্লাহ ও তদীয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্তুষ্টি অর্জন করুন। ইসলামে নিষিদ্ধ মন্দ স্বভাব ও অপকর্মগুলো পরিহার করুন। জেনে রাখুন! গীবত করা হারাম ও কবীরা গুনাহ। কুরআন ও হাদীসে গীবতের মারাত্নক ভয়াবহ পরিণতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। গীবত অর্থ কারো অনুপস্থিতে তাঁর দোষ চর্চা করা। কারো পেছনে সমালোচনা করা পরনিন্দা করা। গীবত করা, গীবত শ্রবণ করা, গীবতকারীকে সমর্থন করা, মারাত্মক অপরাধ ও কবীরা গুনাহ। এতে কোনো কল্যাণ নেই, শান্তি নেই, গীবত দ্বারা হিংসা বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়। পারস্পরিক বিরোধ ও কলহ সৃষ্টি হয়, সম্পর্কের অবনতি হয়। ক্রমশ গুনাহের পাল্লা ভারী হয়।
আল কুরআনের আলোকে গীবত করা হারাম: কারো বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করা, কারো চরিত্র হনন করা, কাউকে অসম্মান করা, বিদ্ধেষ প্রসূত দূর্নাম রটনা করা, কারো সম্মান ক্ষুন্ন করা, কারো বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করা, কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করা, তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা, কারো উন্নতি অগ্রগতি সাফল্য সুনাম ও খ্যাতি সহ্য করতে না পেরে তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা, সম্পূর্ণরূপে অনৈতিক কাজ। ইসলামে এসব অপকর্ম থেকে বিরত থাকার জন্য কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, “তোমাদের কেউ যেন পরস্পর গীবত না করে, তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভ্রাতার মাংস ভক্ষণ করা পছন্দ করবে? তোমরা তো একে ঘৃণাই কর। আল্লাহকে ভয় কর, নিশ্চয় আল্লাহ তাওবা কবুলকারী পরম দয়ালু।” (সূরা, হুজরাত, আয়াত:১২)
হাদীস শরীফের আলোকে গীবতের সংজ্ঞা: কারো অনুপস্থিতিতে তার কোন মন্দ বিষয় নিয়ে অন্যের নিকট আলোচনা করা যা শুনলে উক্ত ব্যক্তি অপছন্দ করবে কষ্ট পাবে এধরনের গর্হিত কাজ ইসলামে কাঠোর ভাবে নিষেধ করা হয়েছে। হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে, হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, তোমরা কি জান! গীবত কী? তাঁরা বললেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এ বিষয়ে অধিক জ্ঞাত। নবীজি বললেন, তোমার ভাই সম্পর্কে এমন বিষয় আলোচনা করা যা জানতে পারলে তিনি অপছন্দ করবেন (সেটাই গীবত) জিজ্ঞেস করা হলো, যা বলা হয় তা যদি সত্যই আমার ভাইয়ের মধ্যে বিদ্যমান থাকে তবুও কি গীবত হবে? সত্যই তোমার ভাইয়ের মধ্যে যদি থাকে তবে তা–ই গীবত। আর তোমার বলা বিষয় যদি তার মধ্যে না থাকে তবে তা অপবাদ হিসেবে গণ্য হবে। (সহীহ মুসলিম, হাদীস–৬৭৫৮)
গীবত করা ও শোনা দুটিই হারাম: গীবত করা ও শোনা দুটিই অপরাধ ও গুনাহের কাজ। কেউ কারো গীবত করলে গীবতকারীকে এ কাজ থেকে নিষেধ করা উচিৎ। তার নিকটে বসে মনযোগ দিয়ে গীবত শোনা অর্থ হলো তাকে একাজে সমর্থন করা, উৎসহিত করা যা মুমিনের চরিত্র হতে পারেনা। হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চোগলখোরী করতে নিষেধ করেছেন। অনুরূপভাবে তিনি গীবত করা ও গীবত শোনা থেকেও নিষেধ করেছেন। (মুজামুল আওসাত)
গীবত যিনার চেয়েও মারাত্মক গুনাহ: ব্যাভীচারিকে শরীয়তে একশত বেত্রাঘাত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, গীবত করা এমন একটি মারাত্মক গুনাহ যার ভয়াবহতা যিনার চেয়েও কঠোর, বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় নৈতিকতার এমন মারাত্মক অবক্ষয় ঘটেছে পরিবারে, সমাজে, প্রতিষ্ঠানে, রাজনৈতিক অঙ্গনে, সর্বদা একজন অন্যজনের দোষ অন্বেষনে ব্যস্ত। একে অপরের ছিদ্রান্বেষন করা, ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য পরস্পর অশোভন আচরণ করা, অন্যজনের চরিত্রে কলিমা লেপন করা কিছু অসৎ ও চরিত্রহীন মানুষের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এসব বদ আমল মানুষের নেক আমলসমূহ বিনষ্ট করে দেয়। হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে, “হযরত আবু সাঈদ ও জাবির রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, গীবত হলো যিনার চেয়েও মারাত্মক। সাহাবাগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গীবত কী করে যিনার চেয়েও মারাত্মক? নবীজি বললেন কোনো ব্যক্তি যদি যিনা করার পর তাওবা করে আল্লাহ তা’আলা তার তাওবা কবুল করেন কিন্তু গীবতকারীকে আল্লাহ মাফ করবেন না, যতক্ষণ না যার গীবত করা হয়েছে সে মাফ করবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীস: ৪৮৭৪)
গীবতকারীকে আল্লাহ তার ঘরের মধ্যেই অপমান করে ছাড়বেন: যে ব্যক্তি অন্যের গীবত চর্চা করে আল্লাহ তাকে তার পরিবারের মধ্যে অপদস্ত করবেন। অসম্মান ও অপমানিত করবেন, তার কর্মের ফল তাকে ভোগ করতে হবে। গীবতকারীর অন্তরে ঈমান প্রবেশ করবেনা, হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে, হযরত আবু বারযা আল আল আসলামী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, মানবমন্ডলী! যারা মুখে ঈমান গ্রহণ করেছ এবং ঈমান এখনও তাদের অন্তরের গভীরে প্রবেশ করেনি, তোমরা মুসলমানদের গীবত করো না এবং তাদের দোষ অনুসন্ধান করোনা, যে ব্যক্তি তাদের দোষ অনুসন্ধান করবে, আল্লাহ তা’আলাও তাদের দোষ অনুসন্ধান করবেন, আর আল্লাহ যার দোষ অনুসন্ধান করবেন তিনি তাকে তার ঘরের মধ্যেই অপমান করে ছাড়বেন। (আবু দাউদ, হাদীস: ৪৮৮০)
যার গীবত করা হয়েছে তার মাগফিরাত প্রার্থনা করা: গীবতের কাফফারা হলো, যার গীবত করা হয়েছে তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনার দুআ করা। হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে, হযরত আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, গীবতের কাফফারা হলো, তুমি যার গীবত করেছ তার জন্য মাগফিরাতের দুআ করবে। তুমি বলবে হে আল্লাহ তুমি আমাদেরকে এবং তাকে ক্ষমা করো। (বায়হাকী, হাদীস ২/৫৭৫)
গীবতকারী সম্পর্কে ইমাম গাযযালী (র.)’র অভিমত: হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাযালী (র.) বর্ণনা করেন, আল্লাহ তা’আলা হযরত মুসা আলাইহিস সালাম এর নিকট ওহী প্রেরণ করেন, যে ব্যক্তি গীবত থেকে তাওবা করে মৃত্যু বরণ করবে সে সর্বশেষ জান্নাতে প্রবেশ করবে, যে ব্যক্তি গীবতের গুনাহ অবস্থায় মৃত্যু করণ করবে তাকে প্রথমে জাহান্নামে প্রবেশ করা হবে। (এহাইয়াউল উলুম, খন্ড: ৩, পৃ: ৩১৫)
গীবত দ্বারা আমলের নূর দূরীভূত হয়ে যায়: গীবত মারাত্নক গুনাহ, গীবত দ্বারা নামায, রোজা, ও নেক আমল সমূহের নূর দূরীভূত হয়ে যায় এবং নামায রোজায় ত্রুটি এসে যায়। (আনোয়ারুল বয়ান, খন্ড:২, পৃ: ২১৭, বাহারে শরীয়ত: খন্ড: ১ম)
হযরত হাসান বসরী (রা.) বর্ণনা করেন, আল্লাহর শপথ! গীবত এতো ভয়াবহ যে খাবারের লোকমা পেটে পৌছার আরো পূর্বে মু’মীনের দ্বীনে বিপর্যয় সৃষ্টি করে দেয়। (মুকাশিফাতুল কুলুব, পৃ: ১৩৬)
বুজুর্গদের দৃষ্টিতে গীবত থেকে বেঁচে থাকা ইবাদত: হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম আবু হামিদ ইবন মুহাম্মদ গাযালী (র.) মৃ.৫০৫ হি. বর্ণনা করেন, আমরা আসলাফ (বুজুর্গদের) দেখেছি তাঁরা কেবলমাত্র নামায রোজাকে ইবাদত মনে করতেন না, বরং মানুষের ক্ষতি করা ও গীবত করা থেকে বেচে থাকাকেও ইবাদত মনে করতেন। (এহইয়াউল উলূম, খন্ড:৩, পৃ: ৩১৭)
প্রসিদ্ধ বুজুর্গ হযরত আবুল লায়ছ বোখারী (রা.) কে গীবত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, তিনি বলেন, একবার গীবত করাকে আমি একশতবার যিনা করা থেকে আরো মারাত্নক নিকৃষ্ট মনে করি থাকি, যে ব্যক্তি কোনো আলেমেদ্বীনের গীবত করল কিয়ামতের দিবসে তার চেহারায় লিখা থাকবে যে, এ লোকটি আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত। (মুকাশিফাতুল কুলুব, পৃ: ১৩৬)। তিন ব্যক্তির অন্যায় অপরাধ বর্ণনা করা গীবত নয় হযরত হাসান বসরী (রা.) বর্ণনা করেন, তিন ব্যক্তির পাপ কর্মের প্রতিবাদ করা গীবত নয় ১. প্রবৃত্তির অনুসারী ব্যক্তির, ২. প্রকাশ্য ফাসিক ব্যক্তির, ৩. অত্যাচারী শাসকের। (এহইয়াউল উলুম, খন্ড: ৩, পৃ: ২২৮)
আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে নেক আমল করার তাওফিক দিন। গীবত থেকে রক্ষা করুন। আমীন।
লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসা–এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রী), বন্দর, চট্টগ্রাম; খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।