জীবনের জলাঞ্জলি মনোমালিন্যে সমাধান নয়

বিপ্লব কুমার শীল | সোমবার , ২ মার্চ, ২০২৬ at ১১:৩৬ পূর্বাহ্ণ

যেখানেই সম্পর্ক, সেখানেই মালিন্য বাসা বাঁধে। মনোমালিন্য রাষ্ট্ররাজনীতি থেকে সমাজ, সমাজ থেকে পরিবার সর্বত্র বিরাজমান। একসময় তা তিক্ততারূপে মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশের মতো গেঁথে যায়। এতে বৈচিত্র্যময় চরিত্রের নানান কুশীলব দেখা যায়। সময় বদলের সাথে সাথে এদের চরিত্রও বদল হয়। জীবনের নানান বাঁকে, নানান বিড়ম্বনায় এসবের যেমন প্রভাব বিস্তার রয়েছে, তেমনি রয়েছে বিস্তীর্ণ স্তরে সামাজিক নিবিড় যোগাযোগ। তাই প্রাণে বেঁচে থাকতে কাছের মানুষ থেকেও মাঝেমাঝে অপমান, অপদস্ত সয়ে যেতে হয়। মাঝেমাঝে অবজ্ঞা, তিরস্কারও মেনে নিতে হয়। আপনজনের রূঢ়ভাষী অকথ্য ভাষা শুনে ; না শুনবার মতো করে বাতাসে মিলিয়ে দিতে হয়! তখনই কাছের মানুষকে চেনা যায়। আরো সহজ হয় এতদিনের প্রিয়বন্ধুর ভালোবাসার দিনলিপির ছন্দের ব্যবহার। কারণ এক্ষণিক জীবনের পূর্ণতা পেতে এসবের ছাঁকন প্রয়োজন। ছাঁকন ব্যতিরেকে সহসাই কোনো সম্পর্ককে এতো গুরুত্ব দিতে নেই। গুরুত্ব দিতে গেলেই জীবন হয়ে যায় বিপন্ন ও দুর্বিষহ । কারণ সময় ও বাস্তব প্রেক্ষাপটেই মানুষের জীবন বয়ে যায়। কখনো দাঁড়িয়ে থাকে না কারোর জন্য। খুঁড়িয়ে হলেও চলতে চেষ্টা করে। যা প্রতিনিয়ত নদীর স্রোতের মতো বহমান। একদিকে পলি জমে উর্বর, আরেকদিকে স্রোতের তোড়ে ভেঙেচুরে নিশ্চিহ্ন করে দেয় সমস্ত। এ জীবন পাড়ি দেয়া আসলেই কঠিন! কারণ জীবনের জোয়ারভাটার সময়সূচিতে মানঅপমান, অপদস্ত, তিরস্কারের জবাব প্রকৃতিই দৈববাণীর মতো তাদেরকে জানান দেয়। একটা সময় মানুষের জীবনে স্থিরতা খুবই প্রয়োজন। নিজেকে সময় দেওয়া অত্যাবশ্যক। এখানে কোনো আবেগ দুলে ওঠে না। অকস্মাৎ ভেসে যেতে হয় না কালের অমোঘ নিয়মে। সংবেদনশীল চালচলন কখনো প্রাসঙ্গিক হলেও কখনো একদম বেমানান। তবুও জীবন থিতু হওয়ার মোক্ষম সুযোগ বের করে নিতে হয়। নিজেকে কখনো ফেলনা কাগুজে টুকরো ভাবা ঠিক নয়। নিজেকে ভাবতে হবে পরম্পরায় মুখিয়ে থাকে প্রিয় পরিবারপরিজনের ভালোবাসার মুহুর্তগুলোকে। যেখানে মমতাভরা সুখ আছে। স্নেহ থাকে পরতেপরতে। অর্থাৎ এ যাপিতজীবনের সান্নিধ্যে শৈশব থেকে তারুণ্যকে পরাণের গহীনে লুকিয়ে আগলে রাখতে হয়। অনুভব করতে হয় বিশাল সুপরিসরে। সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিকে এক্ষেত্রে এড়িয়ে যাওয়া উত্তম। অতঃপর প্রৌঢ়ে এসে আহাম্মকের কাছে যেন মাথা নত করতে না হয়। কারণ জীবনের ঘুর্ণিপাকে মনুষ্যত্বের বোধগম্যই নিজেকে পরিচালিত করতে সহজ করে দেয় । তবেই জীবনের স্বপ্ন ছুঁয়ে দেখার সদ্য চিত্রনাট্য রচনায় সূচনা থেকে উপসংহার বেশ রোমাঞ্চকর হয়ে উঠে। কিন্তু আমার প্রিয় ছোটভাই “মাইকেল” সেই চিত্রনাট্যের রোমাঞ্চকর মুহূর্তের জীবন সাজাতে গিয়ে আজ কঠিন এক যন্ত্রণায় নিজেকে জলাঞ্জলি দিয়েছে। বুঝতে পারেনি একবারও এইসব নিরেট এক ছলনার আগুনের ফাঁদ। যেখানে জলেপুড়ে অঙ্গার হলেও এ সমাজ শুধুই আপসোস করবে। কারণ এ মোহ সমাজে অপ্রিয়। তবুও ছলনার প্রতিটি মুহূর্তে সে নিজেকে তিলেতিলে নিঃশেষ করে দিয়েছে। একবার ভাবেনি একসময় অথৈজলেও এআগুন নেভানো যায় না। নিঃস্ব ছাইয়েও থাকে এর আহাজারি। থেমে যায় এক জীবনের নীরব জয়যাত্রা। কারণ ছলনা শুধুমাত্র সর্বত্র জলসাঘর। এখানে ক্ষণিকের অনুভূতি বাড়িয়ে দেয় উচ্ছ্বাস। এর ব্যত্যয় হলে জীবনে গভীর সংকট ঘনিয়ে আসে। যেখান থেকে মানুষ আর কোনোদিন ফিরে আসার সুযোগ হয় না। প্রতিমুহুর্ত শুধু হাহাকার ধ্বনিত হয়। আকাশে মেঘের ঘনঘটা বেড়েই চলেছে। যেন চারদিকে বজ্রপাতের ধ্বনিতে প্রকম্পিত। তবে এসবের প্রতিকূল আবহ ও বিস্তর বাস্তবতার নিরিখে ছোটভাইয়ের জীবনে নেমে এলো বিভীষিকাময় এক কালরাত। যেন লন্ডভন্ড হলো মাইলের পর মাইল। আচমকায় নিথর হলো পুরো গ্রামনগর। কান্নায় ভেঙে পড়েছে পুরো লোকালয়। কি থেকে কি হয়ে গেলো বোঝা মুশকিল! যেন অনাথ হলো সমস্ত দেহ। অথচ কথা ছিলো স্নিগ্ধসকালে রোদ্দুর ঝলমলে এ জীবন একদিন মধুময় হবে। উল্লসিত হবে উৎসুক কত আয়োজন। শরিক হবে নানান উদযাপন। কিন্তু সময় কখনো কখনো বড়ই নিষ্ঠুর। কখনো কখনো বেদনার্ত এক গারল নীলকন্ঠ। নানান ছলনায় তার জীবনকে বারবার দংশনে নীল করে তুলেছে। বিষিয়ে তুলেছে এসুন্দর জীবনের সমস্ত আবেগ। যেখানে একটি সুন্দর জীবনের সময়কে প্রিয়জনরূপী ছলনার ফাঁদে সে নিজেকে অপব্যবহার করেছে। সবশেষ জীবনের জলাঞ্জলিকে সে বেছে নিয়েছে প্রিয়জনের ছলচাতুরী ও মনোমালিন্যের সেরা ট্রেন্ডি এক উপহার হিসেবে। কারণ ছলনার উন্মাদনায় অমর হতে এবয়সেই দেখা যায় এমন নির্মম ‘আত্মাহুতি’র সংবাদ। অথচ জীবনের জলাঞ্জলিমনোমালিন্যে কোনো সমাধান নয়।

পূর্ববর্তী নিবন্ধরাশেদ রউফ – এর অন্ত্যমিল
পরবর্তী নিবন্ধটরেন্টায় এক চিলতে চট্টগ্রাম