জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের এঙ আইডি থেকে প্রকাশিত ‘নারীবিদ্বেষী’ পোস্টের জন্য দলটি ‘হ্যাকারদের’ দায়ী করলেও তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে বিএনপি। দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, ‘সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন ওঠে যে, নারীবিদ্বেষী পোস্টের প্রায় ৯ ঘণ্টা পর সমালোচনার মুখে, রাত ১টার দিকে আইডি হ্যাকের দাবি কতটা যৌক্তিক?’ খবর বিডিনিউজের।
শফিকুর রহমানের এঙ হ্যান্ডেল থেকে প্রকাশিত ওই পোস্ট শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে জামায়াতে নারী নেতৃত্ব এবং কর্মজীবী নারীদের বিষয়ে বক্তব্য নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। পরে রাতে হাতিরঝিল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন জামায়াতের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ও ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি সিরাজুল ইসলাম। শফিকুর রহমানের ভেরিফায়েড এঙ হ্যান্ডেল ‘হ্যাক করে’ ওই পোস্ট দেওয়া হয়েছে বলে সেখানে অভিযোগ করা হয়। এছাড়া রাত ১২টা ৪০ মিনিটে ফেইসবুকে প্রকাশিত জামায়াতের এক বিবৃতিতে বলা হয়, অত্যন্ত সমন্বিত পদ্ধতি ব্যবহার করে হামলাকারীরা সাময়িকভাবে জামায়াতের আমিরের এঙ অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নেয়। তবে দ্রুত পদক্ষেপ ও বিদ্যমান নিরাপত্তাব্যবস্থার মাধ্যমে দলের সাইবার টিম অল্প সময়ের মধ্যেই অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে সক্ষম হয়। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পোস্ট প্রকাশিত হয়। পোস্টে জামায়াতের আমিরের নামে মিথ্যা বক্তব্য প্রচার করা হয়েছে। তারা স্পষ্টভাবে জানাচ্ছে, এই পোস্ট বা কনটেন্ট জামায়াতের আমিরের কোনো বক্তব্য, মতামত বা অবস্থানকে প্রতিফলিত করে না। এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর। গতকাল রোববার গুলশানে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা অফিসে এক সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে কথা বলেন মাহদী আমিন। তিনি বলেন, আমরা অত্যন্ত বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করেছি যে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, তার ভেরিফায়েড এঙ (টুইটার) হ্যান্ডেল থেকে নারীদের উদ্দেশ্য করে যে নোংরা, জঘন্য ও অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করেছেন বলে দেশব্যাপী যে আলোচনা চলছে, সেটি সঠিক হলে এর মাধ্যমে পুরো সমাজব্যবস্থাকে মধ্যযুগীয় অন্ধকারে ঠেলে দেওয়ার প্রচেষ্টা বলে মনে করি। তিনি তার এঙ (টুইটার) অ্যাকাউন্টের পোস্টে গতকাল তথা ৩১শে জানুয়ারি বিকেল ৪টা ৩৭ মিনিটে যা লিখেছেন, তার একটি অংশ অনুবাদ করলে দাঁড়ায়, আমরা বিশ্বাস করি যে যখন মহিলাদের আধুনিকতার নামে ঘর থেকে বের করা হয়, তখন তারা শোষণ, নৈতিক অবক্ষয় এবং নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হয় এটি অন্য কোনো রূপে পতিতাবৃত্তির মতই। কয়েক দিন আগে আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জামায়াত আমির বলেছিলেন, তার দলের শীর্ষ পদে কখনো কোনো নারী যেতে পারবেন না, কেননা তার ভাষায়, আল্লাহ নারীদের নেতৃত্ব দেবার মত করে তৈরি করেননি।
ওই সাক্ষাৎকারের প্রসঙ্গ মনে করিয়ে দিয়ে মাহদী আমিন জামায়াত আমিরের এঙ হ্যান্ডেলের পোস্ট এবং অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়ে যাওয়ার দাবি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, আমরা সবাই জানি, কোনো গুরুত্বপূর্ণ বা ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট হ্যাক হলে প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হল দ্রুততম সময়ে জনগণকে অবহিত করা, যাতে বিভ্রান্তি না ছড়ায় এবং সবাই সতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু এখানে দেখা গেল, জনগণের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার পর হঠাৎ করে হ্যাকিংয়ের দাবি তোলা হয়েছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এই দাবি কতটা বিশ্বাসযোগ্য? এমনকি ওই সময়ের মধ্যে জামায়াত আমিরের ফেইসবুক অ্যাকাউন্টে অনেক পোস্ট হয়েছে, যার মধ্যে আমরা তার এঙ অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার কোনো পোস্ট দেখতে পাইনি।
মাহদী আমিন বলেন, পরবর্তীতে আমরা লক্ষ্য করি, তারা গভীর রাতে, তথা রাত ৩টা ৩০ মিনিটে হাতিরঝিল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গিয়েছেন। সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তারা বিকাল ৪টা ৫৫ মিনিটে অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার বিষয়টি জানতে পেরেছেন। যদি তাই হয়ে থাকে, তবে প্রায় ১২ ঘণ্টা পরে কেন জিডি করা হল? এই বিলম্বের আদৌ কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা আছে কি? তাছাড়া হ্যাক হওয়ার ঘোষণা দেয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই অ্যাকাউন্ট ফিরে পাওয়ার দাবিটিই বা কতটা বিশ্বাসযোগ্য? বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র দাবি করেন, তার দল নারীদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, সম্মান ও সমঅধিকারের পক্ষে।
জামায়াত আমিরের এঙ হ্যান্ডেলে প্রকাশিত ওই পোস্টের প্রসঙ্গ ধরে তিনি বলেন, এই ধরনের ভাষা ও মানসিকতা কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এটা প্রকাশ্যেই নারীবিদ্বেষী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ। দুঃখজনক হলেও সত্য, এই রাজনৈতিক দলটির জন্য এটি নতুন কোনো আচরণ নয়। এর আগেও আমরা দেখেছি, একই দলের একজন নেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বোনদের উদ্দেশ্য করে ঠিক একই অশালীন শব্দ ব্যবহার করেছিলেন। আমরা দেখেছি, এই দলের প্রধান প্রকাশ্যে নারীদের কাজের জন্য কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনার মতো পশ্চাৎপদ বক্তব্য দিয়েছেন।
যে দল মুখে ‘ইনসাফ কায়েমের’ কথা বলে বেড়ায়, সেই দল কেন এবারের নির্বাচনে একটি আসনেও কোনো নারীকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়নি, সেই প্রশ্ন রাখেন মাহদী আমিন।
তিনি বলেন, এ বিষয়টি নিশ্চয় নারীদের প্রতি তাদের হীন মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ। সেই দলের একজন সদস্যকে আমরা টকশোতে দেখলাম, নারীদের সংসদে যাওয়াকে তাচ্ছিল্য করে ‘ট্রফি’র সাথে তুলনা করেছেন। আমরা দেখলাম, এই দলটি প্রকাশ্যে বারবার ঘোষণা দিয়েছে, তাদের দলের প্রধান পদে কোনো নারী কখনোই আসতে পারবে না। অথচ তাদের নারীরাই বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষের এনআইডি কার্ড ও বিকাশ নম্বর সংগ্রহ করছে। এটাই কি তাদের তথাকথিত ইনসাফ?
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী জোট করায় এনসিপির কয়েকজন নারী নেতা যে কিছুদিন আগে পদত্যাগ করেছেন, সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে বিএনপির মুখাপত্র বলেন, অনেকেই প্রকাশ্যে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। যারা জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করছেন, তারাও স্বীকার করেছেন যে এই দলটির কারণে তারা নানাভাবে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। এমনকি নারী প্রার্থীদের পোশাক–পরিচ্ছেদ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যা চরম রুচিহীনতা ও নারীবিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ। আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, বিভিন্ন আসনে আমাদের প্রার্থীদের নারী সদস্যরা নির্বাচনী প্রচারে নামলে তাদেরকেও অনলাইন, অফলাইনে নানাভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে।












