জাকাত বিত্তবান ও বিত্তহীনদের সেতুবন্ধন

ড. আ. ম. কাজী মুহাম্মদ হারুন উর রশীদ | বুধবার , ৪ মার্চ, ২০২৬ at ১০:৫৬ পূর্বাহ্ণ

জাকাত বাধ্যতামূলক ইবাদত। সমাজের ধনীগরিবের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ জাগরণের একটি বিরাট উপকরণ। ইসলামে কোনো ব্যক্তির উপার্জিত অর্থের পুরোটাই এককভাবে নিজেকে ভোগ করার অধিকার দেওয়া হয়নি; বরং বছর শেষে নিসাব পরিমাণ ধনসমপদ হলে এর দ্বারা গরিব আত্মীয়স্বজন, নিঃস্ব এবং হতদরিদ্র লোকদের সাহায্য করতে হয়। যাতে তারাও উপার্জনক্ষম হতে পারে। মানুষ সমপদের জাকাত দিলে জাকাতদাতার সমপত্তি কমে না; বরং জাকাতদাতার সমপদ আরও বহু গুণে বৃদ্ধি হয়।

পবিত্র কুরআনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিরাশি আয়াতে জাকাতের তাগিদ এসেছে। আভিধানিক নিয়মে জাকাতের দু’টি অর্থ রয়েছে। একটি বর্ধিত হওয়া। অপরটি পবিত্র করা। পরিভাষায়কোনো কিছুর বিনিময় ব্যতিরেকে শরিয়তের নির্দেশিত খাতে নিজের মাল সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ গরিবমিসকিন ও অভাবী লোকদের মাঝে বন্টন করাকে জাকাত বলা হয়। জাকাত দ্বিতীয় হিজরিতে মদিনায় ফরজ করা হয়।

রাসুলুল্লাহ(সা.)-এর ইন্তেকালের পর কিছু সংখ্যক সাহাবি জাকাত দিতে অস্বীকার করায় ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর (রা.) জাকাত বিরোধী লোকদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করে দৃপ্তকন্ঠে বলেছিলেনআল্লাহ্‌র শপথ! যে নামাজ এবং জাকাতের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে (অর্থাৎ, নামাজ আদায় করতে প্রস্তুত থাকে; কিন্তু জাকাত আদায় করতে অস্বীকৃতি জানায়) আমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করবো, তাদেরকে হত্যা করবো। -(সহিহ আলবুখারি, হাদিস নং১৪০০) কারণ, জাকাত অস্বীকারকারীরা প্রকৃত মুমিন থাকে না।

জাকাতের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহপাক ইরশাদ করেছেন– ‘তোমরা নামাজ কায়েম করো এবং জাকাত প্রদান করো। আর বিনয়ীদের সাথে বিনয় প্রকাশ করো।’ -(সুরা বাকারাহ, আয়াত: ৪৩)। আল্লাহপাক আরো ইরশাদ করেছেন– ‘তাদেরকে কেবল এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে, তারা খাঁটি মনে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করে, নামাজ কায়েম করে এবং জাকাত দেয়। আর এটিই হলো সঠিক ধর্ম।’ -(সুরা বায়্যিনাহ, আয়াত: )। কুরআনুল কারিমে আরো এসেছে-‘তারা যদি তাওবা করে, নামাজ কায়েম করে এবং জাকাত প্রদান করে। তাহলে তারা তোমাদের দ্বীনি ভাই হবে।’ -(সুরা তাওবা, আয়াত: ১১)

নামাজ ও জাকাত মুসলিমদের অবশ্যই করণীয়। যারা জাকাত প্রদান করে না, তাদের পরিণাম সম্পর্কে আল্লাহপাক বলেছেন-‘যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য পুঞ্জিভূত করে এবং তা আল্লাহর পথে খরচ করে না, তাদের বেদনাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দাও। যে দিন জাহান্নামের আগুনে তা গরম করা হবে এবং তা দ্বারা তাদের কপালে, পার্শ্বে এবং পিঠে সেঁক দেওয়া হবে। সে দিন বলা হবে এগুলো হলো তাই,যা তোমরা নিজেদের জন্যে জমা করেছিলে। সুতরাং যা জমা করেছিলে তার স্বাদ উপভোগ করো।’-(সুরা তাওবা, আয়াত: ৩৪৩৫)

বুখারি শরিফের হাদিসে এসেছে, হজরত ইব্‌ন আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত। নবী (সা.) মুয়াজ ইব্‌ন জাবাল (রা.)-কে ইয়ামেনে পাঠানোর সময় বললেনতুমি তাদেরকে দাওয়াত দিবে, আল্লাহ্‌ ছাড়া প্রকৃত কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহ্‌র রাসুল। তারা যদি তা মেনে নেয়, তাদেরকে জানিয়ে দিবে যে, নিশ্চয় আল্লাহ্‌ তায়ালা দিনেরাতে তাদের উপর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেছেন। তারা যদি তা মেনে নেয়, তাদেরকে জানিয়ে দিবে যে, আল্লাহ্‌ তায়ালা তাদের সমপদের জাকাত ফরজ করেছেন। তা ধনীদের থেকে গ্রহণ করা হবে এবং ফকিরদের মধ্যে বণ্টন করা হবে। -(সহিহ আলবুখারি, হাদিস নং১৩৯৫)

যারা কৃপণতা করে এবং জাকাত প্রদান করে না; তাদের সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেছেন -‘যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে ধনসম্পদ পেয়েছে; কিন্তু সে এর জাকাত আদায় করে না, কিয়ামতের দিন তার ঐ সম্পদকে দু’টি বিষের থলিবিশিষ্ট মাথায় টাক পড়া বিষধর সাপে রূপান্তর করা হবে। কিয়ামতের দিন ঐ সাপ তার গলদেশে বেড়ি স্বরূপ পেঁচানো হবে। তারপর সাপটি তার মুখের দু’দিকে কামড় দিয়ে বলবেআমি তোমার ধনসম্পদ, আমিই তোমার সঞ্চিত ধনভান্ডার।’-(সহিহ আলবুখারি, হাদিস নং১৪০৩)

হজরত আবুজর গিফারি (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসুল (সা.) বলেছেন -‘যে কোনো ব্যক্তির উট, গরু, কিংবা ছাগল, ভেড়া থাকবে; কিন্তু সে তার হক আদায় করবে না। কিয়ামতের দিন সেগুলোকে আগের চেয়ে অধিক বিরাট ও মোটা তাজা অবস্থায় আনা হবে। সেগুলো দলে দলে তাদের ক্ষুর দ্বারা সে মালিককে পিষতে থাকবে এবং শিং দ্বারা আঘাত করতে থাকবে। যখনই তাদের শেষ দলটি অতিক্রম করবে তখন প্রথম দলটি পুনরায় আনা হবে। এভাবে শাস্তি চলতেই থাকবে, যতক্ষণ না মানুষের মধ্যে বিচার ফায়সালা হয়ে যাবে।’ -(সহিহ আলবুখারি, হাদিস নং১৪৬০)

যারা সন্তুষ্টচিত্তে জাকাত আদায় করবে, তাদের সম্পর্কে নবী করিম (সা.) বলেছেন-‘প্রতিদিন সকালে দু’জন ফেরেশতা অবতরণ করেন। তাদের একজন বলেন যে দাতা তাকে আরো দাও। আরেকজন বলেনহে আল্লাহ! যে কৃপণ তার অর্থ সম্পদ ধ্বংস করে দাও।’ -(সহিহ আলবুখারি, হাদিস নং১৪৪২) হাদিসে প্রিয়নবী (সা.) বলেছেন– ‘তোমরা কৃপণতা থেকে আত্নরক্ষা করো। কারণ, কৃপণতাই তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে ধ্বংস করেছে।’ -(সহিহ মুসলিম, হাদিস নং২৫৭৮) রাসুল (সা.) আরো বলেছেন – ‘দানশীল ব্যক্তি আল্লাহপাকের নিকটতম,মানুষের নিকটতম, বেহেশতেরও নিকটবর্তী। আর দোযখ থেকে এ লোকটি দূরবর্তী। পক্ষান্তরে যে কৃপণ সে আল্লাহ থেকে দূরে এবং বেহেশত থেকে দূরে এবং মানুষের নিকট থেকেও দূরে। তবে দোযখের নিকটবর্তী।’ -(জামে আততিরমিজি, হাদিস নং১৯৬১)

একদিন নবী করিম (সা.) দেখলেন যে, এক মহিলা তার কন্যাকে নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট আসলো। তার কন্যার হাতে দু’টি মোটা স্বর্ণের চুড়ি ছিলো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি এর জাকাত দাও? সে বললো, না। তিনি বললেন, মহান আল্লাহ্‌ এ দু’টি চুড়ির বিনিময়ে কিয়ামতের দিন তোমাকে আগুনের দু’টি চুড়ি পরিয়ে দিলে তুমি কি খুশি হবে? বর্ণনাকারী বলেন, সে তৎক্ষণাৎ তা খুলে নবী (সা.)-এর সামনে রেখে দিয়ে বললো, এ দু’টি আল্লাহ্‌ ও তার রাসুলের জন্য।-(সুনান আবু দাউদ, হাদিস নং১৫৬৩)

প্রাপ্ত বয়স্ক এবং বুদ্ধি জ্ঞান সম্পন্ন মুসলিম নরনারী যাদের কাছে বাৎসরিক যাবতীয় খরচের পর সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ অথবা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্য অথবা দু’টি মিলের যে কোনো একটির সমপরিমাণ অথবা যে কোনো একটির মূল্যের সমান অর্থ সম্পদ থাকে তাদের ওপরই জাকাত ফরজ। এ সমপদের শতকরা আড়াই ভাগ জাকাত দিতে হয়। এ হিসেবে অতিরিক্ত মালের ওপর জাকাত ফরজ। জাকাত নগদ অর্থ দ্বারা পরিশোধ করা যায়। স্বর্ণ বা রৌপ্য দ্বারা নির্মিত অলঙ্কারাদি, বাসনপত্র, আসবাবপত্র ইত্যাদি ব্যবহার করা হোক কিংবা না হোক সমান অর্থ সম্পদ হলেই জাকাত দিতে হবে। সমপরিমাণ অর্থ সম্পদ এক বছর মালিকানায় থাকলেই জাকাত দিতে হবে। আর ব্যবসার জন্যে কেনা মালের জাকাত দিতে হবে। তামা, খাসা পিতল দ্বারা প্রস্তুতকৃত দ্রব্যাদি যদি ব্যবসার জন্যে রাখা হয়, ঐ দ্রব্যাদি জাকাত দেওয়ার পরিমাণ হলেই জাকাত দিতে হবে। উদ্বৃত্ত টাকা এবং সোনারূপা মিলিয়েও যদি কোনো একটি সোনারূপার জাকাত দেওয়ার সমপরিমাণ হয় তাহলে জাকাত দিতে হবে। যে সব বাড়িঘর, দোকান সরাসরি ক্রয় করে সরাসরি বিক্রয় করা হয় তার জাকাত দিতে হবে। আর ধান, গম, যব, আম, কাঁঠাল প্রভৃতি শষ্য ও ফলমূল বৃষ্টির পানিতে জন্মিলে দশ ভাগের এক ভাগ। আর সেচের মাধ্যমে জন্মিলে বিশ ভাগের এক ভাগ ওশর হিসেবে দিতে হবে। গৃহের কাজের অতিরিক্ত ত্রিশটি গরুমহিষ বা চল্লিশটি ভেড়া থাকলে বছর শেষে একটি করে জাকাত দিতে হবে।

পবিত্র কুরআনের মধ্যে সুরায়ে তাওবার ষাট নম্বর আয়াতে আট প্রকার লোককে জাকাত দেওয়া যাবে বলে উল্লেখ রয়েছে। আল্লাহপাক ইরশাদ করেছেন– ‘নিশ্চয় সদকা হচ্ছে ফকির ও মিসকিনদের জন্যে এবং এতে নিয়োজিত কর্মচারীদের জন্যে। আর যাদের অন্তর আকৃষ্ট করতে হয় তাদের জন্যে। দাস আজাদ করার ক্ষেত্রে, ঋণগ্রস্তদের মধ্যে, আল্লাহর রাস্তায় এবং মুসাফিরদের মধ্যে। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।’ -(সুরা তাওবা, আয়াত: ৬০)

আর যে সব খাতে জাকাত ব্যয় করা যাবে না তা হচ্ছে. স্বচ্ছল ধনী ব্যক্তি। ২. উপার্জনশীল শক্তিসম্পন্ন ব্যক্তি। ৩. খোদাদ্রোহী। অর্থাৎ, ইসলামের সাথে শত্রুতা পোষণকারী কিংবা প্রতিবন্ধকতাকারী ৪. জাকাত দাতার সন্তান, পিতামাতা এবং তার স্ত্রীরাও পাবে না। এছাড়া অন্যান্য নিকটাত্মীয়গণ পাবে। ৫. নবী (সা.)-এর পরিবার ও বংশধরগণ।

মুসলিম সমাজ ব্যবস্থায় জাকাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাকাতের মাধ্যমে নিজের ধনসম্পদকে পবিত্র করা যায় এবং জাকাত বিত্তবান ও বিত্তহীনদের একটি সেতুবন্ধন। জাকাত সামাজিক চেতনায় বিকাশ ঘটায়।রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আদ্দু জাকাতা আমওয়ালিকুম’। অর্থাৎ, তোমরা তোমাদের ধনসমপদের জাকাত আদায় করে দাও। -(সুনান আততিরমিজি, হাদিস নং৬১৬) জাকাত প্রদানের মাধ্যমে মানুষ অনুভব করে সকল সম্পদই আল্লাহর, আমাদের কিছুই নয়। জাকাত মানুষের বিবেককে জাগ্রত করে এবং সমাজের মানুষ ঐক্যবদ্ধ সম্প্রদায়ে পরিণত হয়।

আসুন, আমরা জাকাতের যথাযথো হক আদায় করে ইহকাল ও পরকাল উভয়ের সমৃদ্ধি লাভ করি। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন। আমীন॥

লেখক: কলামিস্ট ও গবেষক; প্রফেসর, আরবি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদূরের টানে বাহির পানে
পরবর্তী নিবন্ধপ্রবাহ