জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন সংক্রান্ত হয়রানি বন্ধ হওয়া জরুরি

জিয়া হাবীব আহসান | সোমবার , ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৭:২৩ পূর্বাহ্ণ

আইন ও সার্কুলার অনুযায়ী উল্লেখিত যাবতীয় তথ্য অনলাইনে সাবমিট করার পরও সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিল অফিসে অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্র চাওয়া হয়। এতে বিশেষ করে প্রবাসীরা মারাত্মক বিড়ম্বনা ও হয়রানির শিকার হতে হয়। এ ব্যাপারে আইনী সহায়তা চেয়ে জনৈক প্রবাসী মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনবি.এইচ.আর.এফ মহাসচিব বরাবরে আবেদন করেছেন। তিনি জন্ম সূত্রে বাংলাদেশি নাগরিক এবং সম্পত্তির খতিয়ান, হোল্ডিং ট্যাক্স রশিদ, হলফনামা ও আপন ভাই, বোন এর এন.আই.ডি, জন্মসনদ ইত্যাদি সাবমিট করা সত্ত্বেও উক্ত প্রবাসীর জন্মসনদ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অনুমোদন দেয়নি। ফলে তিনি তাঁর ছুটি শেষ হওয়ায় জন্মসনদ ছাড়াই প্রবাসে ফিরে যেতে হয়। এতে তাঁর অপূরণীয় ক্ষতির কারণ সৃষ্টি হয়। জন্মসনদ হচ্ছে কোন ব্যক্তি তাঁর জন্মের তারিখ ও স্থানটা কোথায় তার প্রমাণ স্বরূপ। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪ এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী জন্ম নিবন্ধন ও জন্মসনদ ইস্যুর ক্ষেত্রে মূলত নাম, জন্ম তারিখ ও স্থান, পিতামাতার তথ্য এবং প্রাথমিক পরিচয়/ঠিকানার প্রমাণ যাচাই করা হয়, কিন্তু এক্ষেত্রে তাঁর কাছে চাওয়া হয় দ্বৈত নাগরিকত্ব যা সম্পুর্ণ অযৌক্তিক ও প্রচলিত আইনগত প্রক্রিয়ার পরিপন্থী। দেরিতে নিবন্ধনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান রেকর্ড, হলফনামা বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সনদের মতো কাগজপত্র গ্রহণযোগ্য। নিয়মিত জন্মসনদ প্রদান বা পুনঃইস্যুর ক্ষেত্রে পাসপোর্ট কপি জমা দেওয়া বা একক নাগরিকত্ব প্রমাণের কোনো বাধ্যবাধকতা এসব আইনে নেই।

বাস্তবে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি নাগরিক কোনো পাসপোর্ট কপি ছাড়াই জন্মসনদ সংগ্রহ করেন যা এই আইনি কাঠামোর সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোচট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন থেকেই ১৯৮৪ সালে উক্ত প্রবাসীর জন্মসনদ ইস্যু করা হয়েছিল। সেই পূর্ববর্তী সরকারি রেকর্ডকে সম্মান জানালে বিষয়টির একটি যৌক্তিক ও দ্রুত সমাধান সম্ভব হতো, কিন্তু তা করা হয়নি। বাংলাদেশে জন্ম নিবন্ধন, জন্মসনদ ইস্যু এবং কর্তৃপক্ষের সম্ভাব্য ক্ষমতার অপব্যবহার (যেমন নাগরিকত্বে প্রমাণ বা পাসপোর্ট কপি দাবি করা) সংক্রান্ত প্রাসঙ্গিক প্রধান আইনগুলো হলো: জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪ (বাংলাদেশে জন্ম নিবন্ধনের প্রধান আইন)। এই আইন অনুযায়ী জন্ম নিবন্ধন বাধ্যতামূলক এবং জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে নিবন্ধন করতে হয় (দেরিতে নিবন্ধনের জন্য পৃথক বিধান রয়েছে)। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো জন্ম ও মৃত্যু সংক্রান্ত মৌলিক তথ্য লিপিবদ্ধ করা, যেমনশিশুর নাম, জন্ম তারিখ, জন্মস্থান, পিতামাতার নাম ও জাতীয়তা, ঠিকানা ইত্যাদি। কিছু বাচ্চার বয়স টিকার কার্ড অনুযায়ী ৫ বছরের উপরে, কিন্তু কোন স্কুলেও ভর্তি হয়নি, তাহলে সে স্কুল সনদ/প্রত্যয়ন পত্র কিভাবে সংগ্রহ করবে। টিকার কার্ড থাকার পরও শুধুমাত্র নতুন নিয়মের কারণে সে জন্ম নিবন্ধন করতে পারছে না। ২০১৩ ইং হতে জন্মগ্রহণকারীদের আবেদনের ক্ষেত্রে পিতামাতার এন.আই.ডি থাকার পরও পিতামাতার জন্ম নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তাহলে এন.আই.ডি এর মূল্যায়নটা আর থাকলো কোথায়?

কোন আবেদনে পিতামাতার জন্ম নিবন্ধনের সাথে জন্ম নিবন্ধন সার্ভার কপিও দিতে হয়। তার সাথে পিতামাতার এন.আই.ডি ও এন.আই.ডি সার্ভার কপিও দিতে হয়। প্রশ্ন হলো মূল কপি থাকলে সার্ভার কপি কেন? এন.আই.ডি সার্ভার কপি, জন্ম নিবন্ধন সার্ভার কপি’র মতো অনলাইনে পাওয়ার কোন সিষ্টেম নাই। এগুলো তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে নিতে হয়। ভুক্তভোগীদের মতে, এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের কিছু লোকের অবৈধ সুবিধার জন্য (সবার জন্য উন্মুক্ত না করে) এই সিস্টেম করে সাধারণ জনগনের ভোগান্তি করছে। এই আইনে কোথাও জন্মসনদ ইস্যু বা পুনঃইস্যুর পূর্বশর্ত হিসেবে পাসপোর্ট কপি, একক নাগরিকত্বের প্রমাণ, বা দ্বৈত নাগরিকত্ব যাচাই বাধ্যতামূলক করা হয়নি। সাধারণত যেসব কাগজপত্র চাওয়া হয় সেগুলো হলো, বয়স ০ হতে ৪৫ দিন হলে ইপিআই (টিকার) কার্ড, পিতামাতার অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সহ জাতীয় পরিচয়পত্র কার্ড, বাসার হোল্ডিং নাম্বার ও চৌকিদারি নাম্বার, আবেদনকারী/অভিভাবকের মোবাইল নাম্বার, ফরমের সাথে ১ কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি। বয়স ৪৬ দিন হতে ৫ বছর হলে, ইপিআই (টিকার) কার্ড, স্বাস্থ্য কর্মীর প্রত্যয়ন পত্র, পিতামাতার অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সহ জাতীয় পরিচয়পত্র কার্ড, বাসার হোল্ডিং নাম্বার ও চৌকিদারি নাম্বার, আবেদনকারী/অভিভাবকের মোবাইল নাম্বার, ফরমের সাথে ১কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি। বয়স ৫ বছরের অধিক হলে, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্র পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি শিক্ষা যোগ্যতার সনদপত্র না থাকলে সরকারি হাসপাতালের এম.বি.বি.এস ডাক্তারের প্রত্যয়ন সনদ এবং জন্ম নিবন্ধন আবেদন ফরমের ৭ এর ১নং কলামে স্বাক্ষরসহ সীল মোহর। পুরনো সনদ পুনঃইস্যুর জন্য সাধারণত যেসব অতিরিক্ত নথি চাওয়া হয়, হলফনামা, স্কুল সার্টিফিকেট বা অন্যান্য সহায়ক কাগজপত্র, বয়স নির্ধারণে প্রয়োজন হলে মেডিক্যাল সার্টিফিকেট। উল্লেখ্য যে, যাদের জন্ম ০১/০১/২০০১ বা এর পর সে ক্ষেত্রে পিতামাতার জন্ম নিবন্ধন সনদ ও জাতীয় পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক। যাহাদের জন্ম ০১/০১/২০০১ এর পূর্বে সেই ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয় পত্র বাধ্যতামূলক। যদি জন্ম ০১/০১/২০০১ এর পূর্বে এবং পিতামাতা মৃত্যু হলে মৃত্যু সনদপত্র বাধ্যতামূলক। যাহাদের জন্ম ০১/০১/২০০১ এর পরে তাহাদের পিতামাতা মৃত্যু হলে প্রথমে অনলাইন জন্ম নিবন্ধন গ্রহণ এরপর অনলাইন মৃত্যু নিবন্ধন সনদ গ্রহণ উভয় সনদ আবেদনপত্রের সহিত দাখিল করতে হবে। বাসার হোল্ডিং নাম্বার ও চৌকিদারি টেক্সের দাখিলা, আবেদনকারী/অভিভাবকের মোবাইল নাম্বার, ফরমের সাথে ১কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি। আবেদনের সাথে সংযুক্ত সকল ডকুমেন্টপত্র সরকারি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক/ইউপি সদস্য/ইউপি সদস্যা কর্তৃক সত্যায়িত করতে হবে। আবেদনের সাথে সংযুক্ত সকল ডকুমেন্টপত্র আবেদন জমা দেওয়ার সময় মূলকপি প্রদর্শন করতে হবে। উপরোক্ত চাহিত ডকুমেন্ট ছাড়া আবেদন কোন প্রকার গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি নাগরিক জন্মসনদ সংগ্রহ করেন এক্ষেত্রে পাসপোর্ট বা নাগরিকত্ব যাচাই কোনো রুটিন শর্ত নয়। বিধিমালার লক্ষ্য তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করা ইমিগ্রেশন বা নাগরিকত্ব যাচাই নয়। নাগরিকত্ব আইন, ১৯৫১ (সংশোধিতসহ) এই আইন নাগরিকত্ব নির্ধারণের জন্য প্রযোজ্য। ধারা ৪ অনুযায়ী, সাধারণভাবে বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তি জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক (কূটনীতিক বা শত্রু রাষ্ট্রের নাগরিকদের সন্তান ব্যতীত)। ধারা ১৪ অনুযায়ী, দ্বৈত নাগরিকত্ব সাধারণভাবে অনুমোদিত নয়, যদিও পরবর্তী সরকারি আদেশে নির্দিষ্ট কিছু দেশের ক্ষেত্রে সীমিতভাবে দ্বৈত নাগরিকত্বের সুযোগ রয়েছে সেক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ডুয়াল ন্যাশনালিটি সার্টিফিকেট প্রয়োজন হয়। কিন্তু এই আইন জন্ম নিবন্ধন বা জন্ম সনদ ইস্যুর প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে না। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন বা অন্য কোনো সিটি কর্পোরেশন এই আইনের আওতায় নাগরিকত্ব যাচাই বা পাসপোর্ট কপি দাবি করার ক্ষমতা রাখে না। তারা কেবল ২০০৪ সালের আইনের অধীনে রেজিস্ট্রার হিসেবে জন্ম নিবন্ধনের কাজ করে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান সংবিধানে সরাসরি জন্ম সনদের অধিকার বলা না থাকলেও অনুচ্ছেদ ২৭: আইনের দৃষ্টিতে সমতা, অনুচ্ছেদ ৩১: আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার অনুচ্ছেদ, ৩২: ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা এই মৌলিক অধিকারগুলোর আলোকে দেখা যায়, একটি মৌলিক পরিচয়পত্র (যেমন জন্মসনদ) প্রদান না করা বা অযৌক্তিক শর্ত আরোপ করে তা আটকে রাখা স্বেচ্ছাচারিতা, বৈষম্য ও ন্যায্য প্রক্রিয়ার লঙ্ঘন হতে পারে। বিশেষ করে যদি ১৯৮৪ সালের একটি পূর্ববর্তী জন্ম সনদ বিদ্যমান থাকে তাহলে সেটিকে অস্বীকার করা বা পুনঃইস্যুতে বাধা দেওয়া আরও গুরুতরভাবে আইনবিরোধী। আশা রাখি এ ব্যাপারে সকল বিড়ম্বনার অবসান হবে ইনশাআল্লাহ।

লেখক: আইনবিদ, মানবাধিকার ও সুশাসন কর্মী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদূরের দুরবিনে
পরবর্তী নিবন্ধবান্দরবানে এপেক্স ক্লাবের চিত্রাঙ্কন ও সুন্দর হাতের লেখা প্রতিযোগিতা