জন্মশতবর্ষে অধ্যাপক ড. মুনীর চৌধুরীর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি

কামরুল আনোয়ার চৌধুরী | সোমবার , ৫ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৫:০৫ পূর্বাহ্ণ

অধ্যাপক ড. মুনীর চৌধুরী অনেক গুণে গুণান্বিত একজন ব্যক্তিত্ব। অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীকেVersatile Genius’ বা ‘All Round Scholar’ বললেও কম বলা হবে। ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন জনপ্রিয় ও সফল শিক্ষক, প্রতিভাধর নাট্যকার, বিশাল মাপের গবেষক লেখক, অসাধারণ বাগ্মী। ড. মুনীর চৌধুরী রচনা করেছেন সাড়া জাগানো নাটক ‘কবর’ ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’ ‘দন্ডকারণ্য’ সহ বেশ কিছু অসাধারণ নাটক। তিনি একজন দক্ষ অনুবাদক। তিনি অনুবাদ করেছেন জর্জ বার্নাড শ-এর You Never Can Tell নাম দিয়েছেন, কেউ কিছু বলতে পারে না, অনুবাদ করেছেন William Shakespeare এর Taming of the Strew দিয়েছেন মুখরা রমণী বশীকরণ এগুলোসহ আরো বেশ কিছু নাটক। মীর মোশাররফ হোসেনকে নিয়ে লেখা গবেষণা গ্রন্থ সাহিত্যে একটি অসাধারণ সৃষ্টিকর্ম। ২০২৫ সাল শহীদ অধ্যাপক ড. মুনীর চৌধুরীর শততম জন্মবার্ষিকী। ১৯২৫ সালে জন্ম নেয়া মুনীর চৌধুরীকে ১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর ঘাতক বাহিনী পৈতৃক বাসায় অবস্থান করা অবস্থায় ধরে নিয়ে যায়। স্বাধীনতার এতবছর পরও তার কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। তার লেখা দুটি বিখ্যাত নাটক ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’ ও ‘কবর’। ১৯৭১ সালের পুরো সময় জুড়ে ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ও তাদের এ দেশীয় সহযোগী বাহিনী সাধারণ বাঙ্গালীদের উপর খুন, ধর্ষণ, ভয়াবহ পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছিল।তাদের জঘন্য কর্মকাণ্ডে পুরো দেশ হয়ে উঠেছিল রক্তাক্ত প্রান্তর। এ রক্তাক্ত প্রান্তরে ‘কবর’ নাটকের নাট্যকার মুনীর চৌধুরীর কবর হয়নি।

ড. মুনীর চৌধুরী একজন যশস্বী সফল শিক্ষক ছিলেন। ক্লাস পাঠদানে ছিল অভূতপূর্ব দক্ষতা। কোনও বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করে পাঠদান কিভাবে শিক্ষার্থীদের জন্য আকর্ষণীয় ও সহজবোধ করে তুলতেন তা ছিল এক কথায় অপূর্ব। কোনও পাঠ শিক্ষার্থীদের বোধগম্য হয়েছে কিনা তা অপরূপ কৌশলে বুঝে নিতেন। পাঠ বোধগম্য করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট যত্নবান ছিলেন।

অধ্যাপক ড. মুনীর চৌধুরীর অনেক ছাত্র-ছাত্রী বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠা ও খ্যাতি লাভ করেছেন। বর্তমান সময়ের বরেণ্য বুদ্ধিজীবী ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মুনীর চৌধুরীর সরাসরি ছাত্র। পরে মুনীর চৌধুরীর সহকর্মী হয়েছিলেন।

ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার স্মৃতিচারণে উল্লেখ করেছেন, “অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয়ে যে কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে, নাটকের আয়োজনে ছাত্র-ছাত্রীদের উৎসাহিত অনুপ্রাণিত ও সহযোগিতা করতেন। আমরা ছাত্র থাকাকালীন সময়ে মুনীর চৌধুরীকে ‘মুনীর ভাই’ বলে সম্বোধন করতাম। আর কোনও শিক্ষককে করতে পারতাম না। এতে তাঁর ব্যক্তিত্বের বিন্দুমাত্র ক্ষতি হত না। অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর ছিল বিশাল মহিমাময় (Charismatic) ব্যক্তিত্ব। সবার প্রতি ছিলেন সহানুভূতিশীল ও সংবেদনশীল। সবাইকে সহজে আপন করে নেবার ক্ষমতা মুনীর চৌধুরীর মধ্যে ছিল’’।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তিনি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন ও পার্টির কার্যক্রমে অংশ নেন। এজন্য তাঁকে ১৯৫০ সালে স্বল্প সময়ের জন্য কারাবরণ করতে হয়েছিল। এরপর ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার কারণে কারাবরণ করতে হয়েছিল। কারাগারে অনেক বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, প্রখ্যাত বামপন্থী কবি লেখকদের সঙ্গ পেয়েছিলেন কারাবন্দী থাকা অবস্থায় মুনীর চৌধুরী দুটি উল্লেখযোগ্য কাজ করেছিলেন। কারাগারে বসে রচনা করেন ‘কবর’ নাটক। রচনার পর এ নাটকটি ভাষা শহীদদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে কারাবন্দী রাজনৈতিক নেতারা হারিকেনের আলোয় এ নাটকে অভিনয় করেছিলেন। দ্বিতীয় কাজটি হচ্ছে জেলে বসে তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে মাস্টার্স পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন এবং কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল অর্জন করেন। ১৯৫৫ সালে কারামুক্ত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ইংরেজী বিভাগে তার যে সব ছাত্র-ছাত্রী পরীক্ষার্থী ছিল তাদের প্রয়োজনীয় ক্লাস শেষ করে ও প্রয়োজনীয় সমস্যার সমাধান করে ইংরেজী বিভাগ ত্যাগ করে বাংলা বিভাগে যোগ দেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাসে পাঠদানে যেমন ছিল তার অভূতপূর্ব দক্ষতা, সৃষ্টিশীল সাহিত্য রচনায় যেমন ছিল তার অসাধারণ ক্ষমতা, তেমনি সভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, বিতর্ক, আলাপচারিতা ছিল তার অভূতপূর্ব পারদর্শিতা। বক্তৃতায় তিনি যেভাবে যুক্তির পর যুক্তি দিয়ে বক্তব্য দান করতেন তার যুক্তি খণ্ডন করার মত আর কারো সুযোগ পাওয়া যেতো না। ১৯৫০ সালে কার্জন হলে কবি ইকবালের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় তিনি এক স্মরণীয় ভাষণ দান করেছিলেন। কবি ইকবালের রচনার মধ্যে কীভাবে সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারণা ও ধ্যান ধারণার উন্মেষ ঘটেছে তা বিশদভাবে তুলে ধরেন। কবি ইকবাল দৃঢ় ধর্ম বিশ্বাসী হওয়া সত্ত্বেও তার রচনার মধ্যে সামাজিক রূপান্তর, সমানাধিকার। প্রভৃতির ধারণা যেভাবে তুলে ধরেছেন তা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের অগ্রপথিক লেনিনের চিন্তাধারাও দর্শনের সাথে মিলে এবং ইকবালের চিন্তাধারায় সাম্যবাদী দর্শনের মিথস্ক্রিয়া বলে মুনীর চৌধুরী অনবদ্যভাবে উল্লেখ করেন। বক্তৃতায় প্রসঙ্গক্রমে ইকবালের বেশ কিছু কবিতা চমৎকার উর্দূতে আবৃত্তি করেন এবং সাথে সাথে ইংরেজতিে অনুবাদ ও করে দেন। উল্লেখ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার আগে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও ডিগ্রী নেন ও ভালোভাবে উর্দূভাষা রপ্ত করেন। ১৯৫৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী বিভাগের উদ্যোগে এক সেমিনারে আয়োজন করা হয়। সেমিনারের বিষয় ছিল ‘The Capacity of Bangali Language for Economic and Political question’ এতে তিনি এক অনবদ্য ভাষণ দেন। শিক্ষকদের মধ্যে কেউ তার বিপক্ষে থাকলেও তিনি জোরালোভাবে মোকাবেলা করেন। আরো অনেক সভা সমাবেশে একজন বক্তা ও বাগ্মী হিসেবে অতুলনীয় প্রতিভার পরিচয় দেন।

১৯৬২/৬৩ সালের দিকে আমেরিকা সরকারের বৃত্তি নিয়ে তিনি আমেরিকা গমন করেন। সেখানে তিনি Linguistics এর উপর পড়াশুনা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে Linguistics বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা হচ্ছেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক প্রথিতযশা অধ্যাপক আবদুল হাই। অথচ অধ্যাপক আবদুল হাই ইংল্যান্ডের London School of Oriental Studies থেকে Phonetics বা ধ্বনি বিজ্ঞানের উপর উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। Linguistics বা ভাষা বিজ্ঞানের উপর ডিগ্রি অর্জন করলেও মুনীর চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্যই পড়াতেন। নাটক ছাড়াও তার আগ্রহের আরেকটি বিষয় হচ্ছে তুলনামূলক সাহিত্য। তুলনামূলক সাহিত্যের উপর তিনি অনেক লেখালেখি করেছেন এবং অনেক সভা সেমিনারে বক্তব্য দিয়েছেন।

বর্তমান বাংলাদেশ সহ সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি ছিলেন আইয়ুব খান। তার রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা যাদের সাথে ঘনিষ্ঠতা ছিল তাদের কয়েকজন ছিলেন কবি ও লেখক। তাদের একজন হচ্ছে স্বনামধন্য উর্দূকবি কুদরত উল্লাহ। এ কবির আগ্রহে ও পরামর্শে রাষ্ট্রপতি পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের কবি, লেখকদের নিয়ে‘All Pakistan Writers Guild’ প্রতিষ্ঠা করেন।

দুই প্রদশের কবি লেখকদের নিয়ে কেন্দ্রীয় পরিষদ গঠন করেন। সরকারি অর্থে পরিচালিত এ সংগঠনে অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী বলিষ্ঠ ভুমিকা পালন করেন। মুনীর চৌধুরীর উদ্যোগে পরিক্রমা নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এত ইংরেজী শাখার সম্পাদনা করতেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও বাংলা শাখার সম্পাদনা করতেন রফিকুল ইসলাম। এ পত্রিকায় মুনীর চৌধুরীর বেশ কিছু নাটক ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়।

Pakistan Writers Guild’ এর উদ্যোগে পাকিস্তানের লাহোরে এক সাহিত্য সম্মেলন হয়। এতে বেশ কিছু ছাত্র ও শিক্ষক সহ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে যোগদান করেন। সভায় সাহিত্যের উপর এক অনবদ্য ভাষণ দিয়ে সারা পাকিস্তানীবাসীর কাছে সুখ্যাতি ও সুপরিচিতি লাভ করেন।

পূর্বে আমরা জেনেছি অধ্যাপক ড. মুনীর চৌধুরী বামপন্থী রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। কিন্তু এক পর্যায়ে রাজনীতির সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করেন। এক পর্যায়ে বুঝতে পারলেন রাজনীতি তার ক্ষেত্র নয়। তাই, রাজনীতির সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করেন। জীবনের বাকী সময়ের পুরোটাই তিনি লেখালেখি, জ্ঞানানুশীলন, পঠন, পাঠন, গবেষণা কর্ম, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম তিনি নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। লেখক শহীদুল্লাহ কায়সার বা রণেশ দাশগুপ্ত যেভাবে রাজনীতি করে জীবন যাপন করেছেন এটা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। অনেকে মুনীর চৌধুরকে আদর্শচ্যুতি ও সুবিধাবাদের অভিযোগে অভিযুক্ত করেন। তার উপর পারিবারিক দায়িত্ব ছিল। মুনীর চৌধুরীকে তার বোন নাদিরা বেগমকে উচ্চ শিক্ষিত বানিয়ে গড়ে তুলতে যথেষ্ট সময় ও শ্রম ব্যয় করতে হয়েছে। নাদিরা বেগম এক সময় কমিউনিস্ট ছিলেন এবং কারাবরণ করেন। পরবর্তীতে নাদিরা মজুমদার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইংরেজী বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। এক্ষেত্রে এক উদাহরণ টানা যায়। অমিয় ভূষণ চক্রবর্তী নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী বিভাগে একজন শিক্ষক ছিলেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় এ দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে ভারতে পাড়ি দিয়ে কোলকাতায় শরণার্থী হিসেবে জীবন যাপন করতে থাকেন। পরে নাগরিকত্ব গ্রহণ করে এক কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে চাকরি নেন। পরে নকশাল আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন।

অধ্যাপক ড. মুনীর চৌধুরী যেমন জানতেন, পড়তেন, ঠিক তেমনি অন্যদের পঠন, পাঠনে ও জ্ঞানানুশীলনে উৎসাহিত করতেন। তার মাতৃভাষা প্রেমের আর উজ্জ্বল উদাহরণ বাংলা ভাষায় টাইপ রাইটারের প্রবর্তন। যা মুনীর অপটিমা নামে পরিচিত। কোন দিবস বা অনুষ্ঠান উপলক্ষে বেতার, টিভি, পত্র-পত্রিকার সাক্ষাতকারে তার জ্ঞানের গভীরতা ও স্বতঃস্ফূর্ততার পরিচয় পাওয়া যেত। একজন সফল শিক্ষক, একজন অসাধারণ প্রতিভাধর লেখক, দক্ষ অনুবাদক, প্রেরণাদায়ক বক্তা হিসেবে তাঁর অবদান বহুধাবিস্তৃত। অধ্যাপক ড. মুনীর চৌধুরীর মতো প্রতিভাধর মানুষের অভাব একশ বছরেও পূরণ হয় না।

লেখক : প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবাউল শাহ আব্দুল করিমের তত্ত্ব ও গান
পরবর্তী নিবন্ধভেজাল খাদ্য গ্রহণে শিশু কীরূপ ক্ষতির শিকার