চিকিৎসা সেবার প্রসারে রাঙামাটি পার্বত্য জেলায় অত্যাধুনিক ভবন নির্মাণ করেছে সরকার। এসব ভবনে রয়েছে লিফটসহ আধুনিক অপারেশন থিয়েটার, আইসিইউ ও আইসোলেশন ইউনিট। রাঙামাটি জেলায় ১১ তলা ভিতবিশিষ্ট ৬ তলা ভবন নির্মাণ সম্পন্ন করে স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে হস্তান্তর করেছে গণপূর্ত বিভাগ (পিডব্লিউডি)। তবে জনবল সংকটের কারণে নতুন ভবনে কার্যক্রম স্থানান্তর বা শুরুই করতে পারেনি রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। গণপূর্ত অধিদপ্তর (পিডব্লিউডি) রাঙামাটি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে ‘চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টিখাত কর্মসূচির (৪র্থ এইচপিএনএসপি)’ আওতায় রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালের জন্য ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট অত্যাধুনিক হাসপাতাল ভবন নির্মাণ করে সরকার। ১১ তলা ভিতবিশিষ্ট ৬ তলা ভবনটি নির্মাণে প্রকল্প (প্রথম পর্যায়) ব্যয় ছিল মোট সাড়ে ৪৮ কোটি টাকা। এরমধ্যে ভৌতখাতে ৩৪ কোটি এবং বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি খাতে ব্যয় ছিল সাড়ে ১৪ কোটি টাকা। ভবনটিতে ১ হাজার ৬০০ কেজি ধারণ সক্ষমতা সম্পন্ন দুইটি ও ১ হাজার কেজি ওজন সক্ষমতা সম্পন্ন দুইটিসহ মোট চারটি লিফট রয়েছে। এছাড়া সেন্ট্রাল অঙিজেন সরবরাহের জন্য রয়েছে পাইপলাইন। ২০১৯ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া ৫ বছর মেয়াদী প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হয় ২০২৪ সালের জুনে। তবে রাঙামাটি স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে এটি হস্তান্তর করা হয় ২০২৫ সালের নভেম্বরে। নির্দিষ্ট সময়ে ভবনের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলেও এক বছরের অধিক সময় পর ভবন বুঝে নেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তবে এখনো পর্যন্ত হাসপাতালের নতুন ভবনে সেবা প্রদান কার্যক্রম শুরু করা যায়নি।
পিডব্লিউডি রাঙামাটির নির্বাহী প্রকৌশলী শর্মি চাকমা বলেন, রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালের ২৫০ শয্যার ১১ তলা ভিতবিশিষ্ট ৬ তলা ভবনটি ইতোমধ্যেই স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ ভবন বুঝে নিলেও এখনো সেবা কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি বলে জেনেছি। নতুন নির্মিত ভবন হলেও সেটি যদি অব্যবহৃত থাকে, সেক্ষেত্রে লিফটসহ অন্যান্য যেসব ইলেকট্রিক্যাল সামগ্রী রয়েছে সেগুলো নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
সমপ্রতি সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গিয়েছে, রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালের পূর্ব পাশে নির্মিত অত্যাধুনিক ভবনটির ফটকে তালা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। ফটক বন্ধ থাকায় হাসপাতালের ভেতরে প্রবেশ করা যায়নি। হাসপাতালের সামনের ফাঁকা স্থানটিতে বিভিন্ন যানবাহন পার্ক করে রাখা হয়েছে।
রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতাল ও পিডব্লিউডি সূত্রে জানা গেছে, ছয় তলা ভবনটির নিচতলায় হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, ফার্মেসি, স্টোর, টিকেট কাউন্টারসহ সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালিত হবে। দ্বিতীয় তলায় ২০ শয্যার আইসিইউ ও আইসোলেশন কক্ষ রয়েছে। তৃতীয় তলায় বিশেষত পরীক্ষা–নিরীক্ষা সংক্রান্ত প্যাথোলজিক্যাল ল্যাব, এঙ–রে, এমআরআই ও কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিট হবে। চতুর্থ তলাজুড়ে অপারেশন থিয়েটার (ওটি), পঞ্চম তলায় পোস্ট অপারেটিভ ইউনিট (অপারেশনের পর রোগীদের নীবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা কক্ষ) এবং ষষ্ঠ তলায় রোগীদের জন্য ওয়ার্ড ও কেবিন থাকবে।
হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে ১০০ শয্যা বিশিষ্ট রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালের প্রতিনিয়ত ১০০’র অধিক রোগী ভর্তি থাকেন। বিভিন্ন সময়ে বাড়তি বসানো সিট বরাদ্দ না পেয়ে অনেক রোগীকে থাকতে হয় হাসপাতালের মেঝে ও করিডোরে। মেঝে ও করিডোরে গাদাগাদি করে থাকা রোগীদের জন্য স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিও রয়েছে। নতুন অত্যাধুনিক ভবনে কিছু বিভাগ ও রোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত ওয়ার্ড ও কেবিন স্থানান্তর করা হলে এ সংকটের লাঘব হবে। তবে ১০০ শয্যার বর্তমান হাসপাতালটিতে রোগীদের সেবা প্রদানকারী জনবল পর্যাপ্ত না থাকায় নতুন ভবনে স্থানান্তর হতে পারছে না কর্তৃপক্ষ।
চিকিৎসকরা বলছেন, পাহাড়ি জেলা রাঙামাটি অন্যান্য জেলার চেয়ে চিকিৎসা সেবাদানের ক্ষেত্রে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। তবে এ জেলায় মেডিকেল কলেজ স্থাপন, উপজেলাকেন্দ্রিক আধুনিক স্বাস্থ্য কমপ্লেঙ নির্মাণ এবং জেলার একমাত্র জেনারেল হাসপাতালের উন্নীতকরণের ফলে স্বাস্থ্য সেবায় কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। উপজেলাকেন্দ্রিক উন্নীত চিকিৎসার সুযোগ না থাকা এবং চিকিৎসক সংকটের কারণে রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতাল রেফার্ড হাসপাতাল হিসেবে ভূমিকা রাখছে। এখানকার উপজেলাগুলো দুর্গম হওয়ার কারণে উপজেলার প্রান্তিক মানুষের চিকিৎসা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে অনেকটাই ‘শেষ ভরসা’ রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতাল।
রাঙামাটির সিভিল সার্জন ও ১০০ শয্যা বিশিষ্ট রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. নূয়েন খীসা বলেন, গণপূর্ত বিভাগ আমাদের গত বছরের শেষদিকে হাসপাতাল ভবনটি হস্তান্তর করে। নতুন ভবনটিতে রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য অত্যাধুনিক ব্যবস্থাপনা থাকলেও আমরা শুধুমাত্র জনবল সংকটের কারণে কার্যক্রম শুরু করতে পারছি না। ১০০ শয্যার হাসপাতালটি ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের জন্য অনুমোদন নিতে হবে। আমরা যদি ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের প্রশাসনিক অনুমোদন পেতাম, সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জনবলের জন্য চাহিদাপত্র দিতে পারতাম। দাপ্তরিক কাজ হলে একই ব্যক্তি দুইটা উপজেলায়ও একই সঙ্গে দায়িত্বপালন করতে পারেন। কিন্তু এখানে দুইটা আউটলেট একই জনবল দিয়ে চালানো সম্ভব নয়। সে কারণে আমাদের সেবা প্রদানে হিমশিম খেতে হলেও পুরনো ভবনেই কার্যক্রম চলছে।
ভবনের বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ নষ্ট হচ্ছে–এমন কথা স্বীকার করে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক বলেন, যে কোনো কিছুই অব্যবহৃত থাকলে ভালো থাকে না। আমি ইতোমধ্যেই আরএমও বলে রেখেছি মাঝেমধ্যে যেন হাসপাতালের লিফটগুলো চালানো হয়। এছাড়া স্বল্প জনবলের মধ্যেও আগামী কিছুদিনের মধ্যে আমরা সীমিত আকারে চালু করার চেষ্টা করব। বিশেষত আমরা চাইছি আগামী মাসের মধ্যেই নতুন ভবনে চোখের অপারেশনগুলো করা যায় কিনা।












