সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. রওনক জাহান বলেছেন, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন কিভাবে হবে, সেই নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারছে না। অনেকে বলছেন, যেভাবে হোক নির্বাচনটা হয়ে যাক। মানুষ অন্ধভাবে বিশ্বাস করছে, নির্বাচনের পরই সংকট কেটে যাবে। কিন্তু বাস্তবে সে ধারণার পক্ষে কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। ৮ জানুয়ারি সকালে সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র ও সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার’ শীর্ষক সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে রওনক জাহান বলেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে শুধু সংখ্যালঘু নয়, সাধারণ মানুষও এখন অধিকারের প্রশ্ন পেছনে ফেলে নিরাপত্তাকেই প্রধান চাহিদা হিসেবে দেখছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেন রাষ্ট্রের দায়িত্ব না হয়ে এক ধরনের ‘চ্যারিটি’ বা দয়ার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবার মনে এখন একটাই দাবি, নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
নির্বাচনকালীন ভয়ভীতির প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, নির্বাচন এলেই সংখ্যালঘুরা চরম আতঙ্কে থাকে। তারা আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়, এমন একটি ধারণা থেকে তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। অথচ সংখ্যালঘুরা কাকে ভোট দিচ্ছে, তা যাচাই করার কোনো সুযোগ নেই। তিনি আরো বলেন, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট কেবল এক দলের সঙ্গে আরেক দলের দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নয়, দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দলও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার ঘটনায় রাজনৈতিক কর্মীদের ভূমিকার সমালোচনা করে ড. রওনক জাহান বলেন, সহিংসতার শিকার মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো লোক নেই। রাজনৈতিক কর্মীদের দায়িত্ব শুধু ভোট সংগ্রহ বা কর্মসূচিতে অংশ নেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। বিপদের সময় সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা ও শিক্ষা তাদের মধ্যে গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, কোনো দেশের সংবিধানে কী লেখা আছে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই দেশের সংখ্যালঘুরা নিজেদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে কী ভাবছে। সংখ্যালঘুদের অধিকার ও নিরাপত্তার বাস্তব চিত্রের ওপরই একটি দেশের গণতন্ত্রের প্রকৃত মান নির্ভর করে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘রাষ্ট্রের দায়িত্ব জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রের পক্ষে এই দায়িত্ব পালন করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীল আচরণ ও ভূমিকা প্রত্যাশা করি। আমরা চাই, পুলিশ প্রশাসন দুষ্কৃতদের উদ্দেশে কড়া বার্তা দিক। তারা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে সর্বোচ্চ নজর দিক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের নানাবিধ দায়িত্ব রয়েছে, সেগুলো যথাযথভাবে পালন করুক। সড়ক–মহাসড়কের পাশাপাশি পাড়ামহল্লায়ও টহলদারি বাড়াক। সেই সঙ্গে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে জোরদার অভিযান পরিচালনার জন্যও আমরা বলি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ার পেছনে কোনো অজুহাত থাকতে পারে না, থাকা উচিত নয়। প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে হবে। তাদেরকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। প্রশাসনকে সাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তবে এ কথা সত্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানো একা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলসহ সমাজের সব স্তরের মানুষেরও সমর্থন এবং সহযোগিতা প্রয়োজন। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করায় সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর দায় অনেক বেশি, তবে রাজনীতিকসহ সমাজ প্রতিনিধিদের দায়ও কম নয়। আমরা চাই, সরকার সবার সহযোগিতায় সাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জননিরাপত্তা এখনও পরিপূর্ণভাবে দেশে নিশ্চিত করা যায়নি। তবে এর পেছনে নানা কারণও বিদ্যমান তা অনেকের অভিমত। ড. ইউনূস আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ব্যক্তিত্ব হলেও বৈশ্বিক পর্যায়ে একটি দেশের ভাবমূর্তি রক্ষা করা তার একার পক্ষে সম্ভব নয়। বিশেষত পশ্চিমা দেশগুলো দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো এবং নিরাপত্তা নিয়েই শঙ্কিত। এ শঙ্কার প্রভাব পড়ছে বৈদেশিক বিনিয়োগ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে। এমনকি রাজনৈতিক একটি পক্ষ অর্থনৈতিক অঞ্চলেও ইন্ধন জোগাচ্ছে এমন অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। তাঁরা বলেন, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পুলিশ বাহিনীকে তৎপর হতে হবে। জনগণের ভীতি দূর করে জনগণের সেবা করা পুলিশের দায়িত্ব। পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা ছিল। যে কারণে হোক বর্তমানে পুলিশের ভেতর যে ভয় ঢুকেছে, তা দূর করতে হবে। এই আস্থা অটুট রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।







