জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের ভয়াবহ হামলায় র্যাবের উপসহকারী পরিচালক–ডিএডি মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া হত্যার ঘটনায় বুধবার রাতে সীতাকুণ্ড থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। চট্টগ্রাম র্যাব–৭ এর ডিএডি আবদুর রহমান বাদি হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় জঙ্গল সলিমপুর আলিনগরের ইয়াছিন বাহিনীর প্রধান ইয়াছিন ও তার ভাই ফারুক, সহযোগী নুরুল হক ভান্ডারীসহ ২৯ জনের নামোল্লেখ এবং ১৫০ থেকে ২০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। সীতাকুণ্ড থানার মামলা নং–২৪(১)/২৬ ধারা–৩৫৩/ ৩৩২/ ২২৪/ ২২৫/ ৩৩৩/ ৩০৭/ ৩৮৬/ ৩৬৪/ ৩৪২/ ৪২৭/ ৩০২/৩৪ বিপিসি। মামলাটি র্যাব ছায়া তদন্ত করছে এবং ঘটনার সাথে জড়িত দুইজনকে র্যাব গ্রেপ্তার করে। পুলিশও একজনকে গ্রেপ্তার করেছে বলে জানিয়েছে।
এছাড়া ঘটনার সময় র্যাব সদস্যদের লুট হওয়া ৪টি পিস্তল উদ্ধারের পর পুলিশ বাদী হয়ে বুধবার রাতে পৃথক একটি মামলা দায়ের করে।
মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সীতাকুণ্ড মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মাহিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, এই ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদিকে ঘটনার পর থেকে এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। সাধারণ বাসিন্দাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা। স্থানীয় সূত্র জানায়, জঙ্গল সলিমপুরের বিস্তৃত এলাকা নিয়ন্ত্রণে ইয়াছিন– রোকন বাহিনীসহ সক্রিয় রয়েছে একাধিক সন্ত্রাসী বাহিনী। তাদের আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজিসহ নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে গত দেড় বছরে ৫টি হত্যাকাণ্ড ছাড়া একাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
১৯ জানুয়ারি বিকেলে জঙ্গল সলিমপুরে অভিযানের সময় সন্ত্রাসীদের অতর্কিত হামলায় র্যাব কর্মকর্তা মোতালেব নিহত ও চারজন আহত হন। এসময় আহত র্যাব সদস্য ছাড়াও নুরুল আলম মনা নামে এক আহত ব্যক্তিকে পুলিশ উদ্ধার করে হেফাজতে নিয়ে চিকিৎসা দেয়। সে হত্যাসহ একাধিক মামলার এজাহার নামীয় আসামি। জঙ্গল সলিমপুরে বিএনপির অফিস উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে রোকন বাহিনী দখলে নেওয়ার চেষ্টা করলে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ইয়াছিন বাহিনী অফিসটি উদ্বোধন করছিলো, ওতে বাধা সৃষ্টি করে রোকন বাহিনী।
তবে ঘটনার পর রোকন ও ইয়াছিন পৃথক ভিডিও বার্তায় ঘটনার সাথে নিজেদের সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেন। তারা র্যাব কর্মকর্তা হত্যায় পরস্পর পরস্পরকে দায়ী করেও বক্তব্য দেন।
পাহাড়ি এলাকা জঙ্গল সলিমপুরে বিগত ৪০ বছর ধরে বসতি গড়ে উঠে। সরকারি পাহাড় ও খাস জমি দখল করে হাজার হাজার মানুষ অবৈধ বসতি স্থাপন করে। প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর আয়তনের বিস্তৃত এলাকাটি অত্যন্ত দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল হওয়ায় পাহাড়খেকো, ভূমিদস্যু ও সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ইতোমধ্যে এলাকার বহু পাহাড়ই সাবাড় করে দেয়া হয়েছে। পাহাড় ও টিলা কেটে গড়ে তোলা বসতি পরিণত হয়েছে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে। এলাকাটি ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে সংঘর্ষ, খুনোখুনি ও সন্ত্রাসী তৎপরতা চললেও প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। যতবারই প্রশাসন অভিযানে গেছে প্রায় প্রতিবারই হামলার শিকার হয়েছে। সর্বশেষ গত সোমবার সন্ধ্যায় র্যাব কর্মকর্তাকে হত্যা, তিনজনকে অপহরণ গুরুতরভাবে আহত এবং চারটি রিভলবার লুটের ঘটনা ঘটে। ফৌজদারহাট পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ইন্সপেক্টর সোহেল রানা ওইদিন রাতে গোপন খবরের ভিত্তিতে জঙ্গল সলিমপুরের একটি দোকানের পাশ থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় লুণ্ঠিত রিভলবারগুলো ইতোমধ্যে উদ্ধার করেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার র্যাব মহাপরিচালক জঙ্গলসলিমপুরে র্যাব কর্মকর্তা হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও সন্ত্রাস নিমূলে যৌথ বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান শুরুর ঘোষণা দেন। পুলিশ বলেছে, উপরের নির্দেশ পেলে যে কোনো সময় এই অভিযান শুরু হবে।
সীতাকুণ্ড থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মহিনুল ইসলাম জানান, বুধবার রাতে মামলা রেকর্ডের পর তারা জঙ্গল সলিমপুর এলাকার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছেন। মামলার মূল আসামি ইয়াসিনের বিরুদ্ধে চারটি ও নুরুল হক ভান্ডারীর বিরুদ্ধে সাতটি মামলা রয়েছে। গ্রেপ্তার অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও ওসি জানান।
অপরদিকে র্যাবের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, র্যাবের ডিএডি মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রুজুকৃত মামলার পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে র্যাব গোয়েন্দা নজরদারি এবং ছায়াতদন্ত শুরু করেছে। এরই ধারাবাহিতকায় গোপন খবরের ভিত্তিতে মামলার
এজাহারনামীয় আসামি মোহাম্মদ ইউনুছ আলী হাওলাদারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরবর্তীতে তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে নগরীর পতেঙ্গা থানাধীন ওয়াসা গলি এলাকা থেকে খন্দকার জাহিদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের সীতাকুণ্ড থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলেও র্যাব জানায়।












