ছড়িয়ে পড়ুক ঈদ আনন্দ, বয়ে আনুক অনাবিল সুখ শান্তি

ফখরুল ইসলাম নোমানী | বৃহস্পতিবার , ১৯ মার্চ, ২০২৬ at ১০:১৯ পূর্বাহ্ণ

ঈদ মুসলিম বিশ্বের এক অতি আনন্দময়, পবিত্র এবং মর্যাদাপূর্ণ উৎসব। ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে আনন্দ। এই দিনে ধনীগরিব, উঁচুনীচুর সব ভেদাভেদ ভুলে সবাই এক কাতারে শামিল হয়। প্রতিটি প্রাণে ছড়িয়ে পড়ে খুশির আমেজ। ইসলামে দু’টি ঈদ রয়েছে, ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহা। তন্মধ্যে ঈদুল ফিতর ইসলামের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব যা রমাদান মাসের শেষে পালন করা হয়। দীর্ঘ এক মাস সিযাম সাধনার পর খুশির বার্তা নিয়ে হাজির হয় ঈদুল ফিতর। ঈদ মানে খুশি। ঈদ মানে যা বারবার ফিরে আসে। মুসলমানদের জীবনে অপার আনন্দের বার্তা নিয়ে বারবার ঈদ আসে। ফিতর মানে ভঙ্গ করা। পবিত্র রমজান মাসের সিয়াম আদায়ের পর শাওয়াল মাসের প্রথম দিন সকালে সিয়াম ভঙ্গ করে আল্লাহর বিশেষ নিয়ামতের শুকরিয়া স্বরূপ আনন্দ উৎসব করা। এটিকে রোজার ঈদও বলা হয়। দরজায় কড়া নাড়ছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। চারদিকে যেন আনন্দের বন্যা বইছে। পশ্চিমাকাশে ঈদের চাদ উঁকি দিলেই এ আনন্দ পূর্ণ মাত্রা পাবে। কিন্তু ঈদের রাতটি (চাঁদ রাত) অবহেলার রাত নয়। ইসলামে যে রাতগুলো ইবাদতের জন্য এবং ফজিলতে পরিপূর্ণ সেসবের অন্যতম এই ঈদের রাত। চাঁদরাতের প্রথম সুন্নত ও ফরজে কিফায়া আমল হলো সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে চাঁদ দেখা। চাঁদ দেখলে বা চাঁদ দেখার সংবাদ নিশ্চিত হলে দোয়া পড়া সুন্নত। নতুন চাঁদকে আরবিতে বলে হিলাল। হিলাল হচ্ছে এক থেকে তিন তারিখের চাঁদ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখো, চাঁদ দেখে রোজা ছাড়ো, ইফতার করো বা ঈদ করো। যে সন্ধ্যায় আকাশে চাঁদ দেখা যায় সে রাত হলো চাঁদরাত। আরবি চান্দ্র বছরের নবম মাস রমজান এবং দশম মাস শাওয়াল। রমজানের রোজার শেষে পয়লা শাওয়াল ঈদুল ফিতর বা রমজানের ঈদ। শাওয়ালের চাঁদরাত হলো ঈদের রাত। শাওয়ালের চাঁদরাত তথা রমজানের ঈদের রাতের আমল হলো: পুরুষদের মাগরিব এশা ও ফজর নামাজ মসজিদে জামাতের সঙ্গে পড়ার চেষ্টা করা এবং নারীদের আওয়াল ওয়াক্তে ফরজ নামাজ আদায় করা। রাতের ইবাদতের জন্য বিশেষভাবে পবিত্রতা অর্জন করা; সম্ভব হলে গোসল করা। ইবাদতের উপযোগী ভালো কাপড় পরিধান করা। মাগরিবের পর আউওয়াবিন নামাজ পড়া এবং শেষ রাতে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়া। রাত জেগে নফল ইবাদত করা। নফল নামাজ পড়া। কোরআন শরিফ তিলাওয়াত করা, সুরা ইয়াসিন, সুরা রহমান, সুরা ওয়াকিআ, সুরা মুলক, সুরা মুজাম্মিল, সুরা মুদ্দাচ্ছির, সুরা ফাতহ, সুরা নাবা ইত্যাদি পাঠ করা। দরুদ শরিফ পাঠ করা, ইঁস্িতগফার করা, তাসবিহ তাহলিল, জিকির আসকার ইত্যাদিতে মশগুল থাকা।

মহান আল্লাহ এই রাতকে বিশেষভাবে মহিমান্বিত করেছেন। মুয়াজ (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন যে ব্যক্তি পাঁচ রাত জেগে থাকবে তার ওপর জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যাবে। রাতগুলো হলো:-১৫ শাবানের রাত, ঈদুল ফিতরের রাত, ৮ জিলহজের রাত, ৯ জিলহজের রাত ও ঈদুল আজহার রাত। নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেন যে দুই ঈদের রাতে সওয়াবের নিয়তে ইবাদত করবে তার অন্তর সেদিন মরবে না যেদিন অন্যদের অন্তর মরে যাবে। মুসলমানদের ধর্মীয় দুটি উৎসব: ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার প্রবর্তন হয় দ্বিতীয় হিজরি সনে। এবছরই বদরের বিজয়ের ১৩ দিন পর পয়লা শাওয়াল ঈদুল ফিতর উদ্‌যাপন করা হয় এবং মদিনার সুদখোর মহাজন ইহুদি বনু কাইনুকা সম্প্রদায়কে নিরস্ত্র করার পর ১০ জিলহজ ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ পালন করা হয়। নবীজি (সা.) বলেন প্রতিটি জাতির উৎসব আছে আমাদের উৎসব হলো এই দুই ঈদ। ঈদের নামাজ পড়া পুরুষদের জন্য ওয়াজিব। ঈদের নামাজের সময় হলো সূর্যোদয়ের পর থেকে মধ্য দিবসের পূর্ব পর্যন্ত। ঈদের নামাজের আগে বা পরে কোনো নফল নামাজ পড়া যায় না। ঈদের নামাজের জন্য আজান ও ইকামাত দিতে হয় না। রমজানের ঈদ অপেক্ষা কোরবানি ঈদে জামাত একটু আগেই করা হয় কারণ তারপরে কোরবানির পশু জবাইসহ নানান কাজ থাকে। রমজানের ঈদের নামাজের আগে এবং কোরবানির ঈদে ঈদের নামাজের পরে নাশতা খাওয়া সুন্নত। দুই রাকাত ঈদের ওয়াজিব নামাজ ছয়টি অতিরিক্ত ওয়াজিব তাকবিরসহ আদায় করতে হয়। প্রথম রাকাতে সানা পড়ার পর সুরা পড়ার পূর্বে তিনটি তাকবির এবং দ্বিতীয় রাকাতে সুরা কিরাআত পড়ার পর রুকুতে যাওয়ার আগে তিনটি তাকবির বলতে হয়। প্রতিটি তাকবির বলার সময় কান পর্যন্ত উভয় হাত তুলে হাত ছেড়ে দিতে হয়। ঈদের নামাজের অতিরিক্ত ওয়াজিব তাকবিরে ভুল হলে অর্থাৎ তাকবির কম বা বেশি হলে অথবা বাদ পড়লে সাহু সিজদার প্রয়োজন নেই। ঈদের নামাজের পর খুতবাহ প্রদান করতে হয়। খুতবাহ মানে ভাষণ বা বক্তৃতা। ঈদের খুতবাহ প্রদান ও শ্রবণ উভয়ই ওয়াজিব। সকল প্রকার খুতবার সময় মুক্তাদিগণের নীরবতা ওয়াজিব। এ রাতের অন্যতম আমল হলো চাঁদ দেখা। এটি একটি সুন্নত আমল ও ফরজে কিফায়া। চাঁদ দেখলে বা চাঁদ দেখার সংবাদ পেলে এই দোয়া পড়বে-‘আল্লাহুম্মা আহিল্লাহু আলাইনা বিল আমনি ওয়াল ঈমান, ওয়াছ ছালামাতি ওয়াল ইসলাম ; রব্বি ওয়া রব্বুকাল্লাহ। হিলালু রুশদিন ওয়া খায়র। অর্থ : হে আল্লাহ! এই মাসকে আমাদের জন্য নিরাপত্তা ঈমান, প্রশান্তি ও ইসলাম সহযোগে আনয়ন করুন ; আমার ও তোমার প্রভু আল্লাহ। এই মাস সুপথ ও কল্যাণের। ঈদের রাতটি (চাঁদরাত) মুমিনদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি রাত। তাই এই রাতে অনর্থক কোনো কাজে লিপ্ত না হয়ে তার যথাযথ মর্যাদা দেওয়াই একজন প্রকৃত মুমিনের কাজ।

ঈদুল ফিতরের দিন কতিপয় কাজ করা সুন্নত আর তা হলো : . যতদূর সম্ভব অতিপ্রত্যুষে শয্যা ত্যাগ করা। ২. মিসওয়াক করা এবং সকাল সকাল গোসল করা। ৩. নিজের সাধ্যানুযায়ী উৎকৃষ্ট তথা পবিত্র, পরিষ্কারপরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করা। ৪. সুগন্ধি দ্রব্য ও চোখে সুরমা ব্যবহার করা। ৫. যথা শিগ্‌িগর প্রত্যুষে ঈদগাহে গমনে অযথা বিলম্ব না করা। ৬. সামর্থ্য অনুযায়ী উত্তম খাবারের বন্দোবস্ত করা এবং প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, ইয়াতিম, ফকিরমিসকিন, গরিবদুঃখীকে পানাহার করানো। ৭. ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহে যাওয়ার আগে মিষ্টি মুখ করা, আর ঈদুল আজহার নামাজের পূর্বে কোনো প্রকার আহার গ্রহণ না করে নামাজের পর যথা শিগ্‌িগর সম্ভব পশু কুরবানি করে সেই গোশত দ্বারা আহার করা। ৮. ঈদগাহে গমনের আগেই সাদকায়ে ফিতর আদায় করা। ৯. ঈদগাহে একপথে যাওয়া আর ফেরার সময় অন্য পথে আসা এবং যথাসম্ভব হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া। ১০. ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহে যাওয়ার পথে চুপে চুপে তাকবির (আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, লাইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার ওয়াল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ) পাঠ করা আর ঈদুল আজহা তথা কুরবানির ঈদের দিন উচ্চস্বরে ওই তাকবির পাঠ করা। ঈদের দিনের এসব চমৎকার আমল ও আয়োজন আমাদের ঈদ আনন্দ বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে ইনশাআল্লাহ। ঈদুল ফিতর বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্মীয় উৎসব। ঈদের মাধ্যমে যে আনন্দ আত্মতৃপ্তি অনুভব হয় তা অন্য কোনো উৎসবে হয় না। অন্যান্য উৎসব থেকে ঈদের পার্থক্য হলসবাই এর অংশীদার। সবার মাঝে নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার মধ্যে রয়েছে অপার আনন্দ। ঈদের দিন ধনীগরিব নির্বিশেষে সবাই এককাতারে শামিল হয়ে মহান সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি কামনা করে। ঈদের আগের এক মাস সিয়াম সাধনার মাধ্যমে আমরা আত্মাকে পরিশুদ্ধ করি। অপরের দুঃখকষ্ট বুঝতে সচেষ্ট হই। রোজার প্রধান লক্ষ্য ত্যাগ ও সংযম। ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ত্যাগের অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারলে তা হবে সবার জন্য কল্যাণকর। ঈদ শুধু আনন্দ উৎসবের নাম নয় বরং মহান রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে মুসলিম মিল্লাতের জন্য একটি বিশেষ রহমত ও আল্লাহর দেয়া আদেশ। যার মাধ্যমে আমরা আল্লাহতায়ালার নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি। দুনিয়াবাসী এই দিনকে ঈদের দিন বললেও আসমানে একে বলা হয় ইয়াউমুল জায়িজা বা পুরস্কার প্রদানের দিন। এদিন আল্লাহ তার রোজাদার বান্দাদের পুরস্কৃত করে থাকেন। ঈদ কেবল একটি খুশির বা আনন্দের দিন নয়। ঈদ একটি ইবাদতের নাম। এ দিনটি আমলের জন্য এক বিরাট নেয়ামত। এদিনেও বিশেষ কিছু ইবাদত বা আমল রয়েছে যে গুলোতে অনেক পুণ্য লাভ করা যায়। রাসুল (সা.) বলেছেন যে ব্যক্তি পাঁচটি রাত জেগে ইবাদত করবে তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যাবে।

ঈদের বর্জনীয় : . জামাতের সঙ্গে ফরজ নামাজ আদায়ে অলসতা ২. ঈদের দিন রোজাপালন করা ৩. বিজাতীয় আচরণ প্রদর্শন করা ৪. নারীপুরুষ একে অপরের বেশ ধারণ করা ৫. নারীদের খোলামেলা অবস্থায় রাস্তাঘাটে বের হওয়া ৬. গানবাজনা করা ৭. অযথা কাজে সময় নষ্ট করা ৮. অপচয় ও অপব্যয় করা ৯. আতশবাজি করা ১০. ঈদের নামাজ আদায় না করে আনন্দফূর্তি করা। ঈদ মানে আনন্দের জোয়ার। ঈদ মানে খুশির সঞ্চার। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর রমজানের শেষ দিনে আকাশের এক কোণে বাঁকা চাঁদের মিষ্টি হাসি ঈদের জানান দেয়। সবাই একই সুরে গেয়ে ওঠে কাজী নজরুল ইসলামের সেই অমর সংগীত ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।’ ঈদ মুসলমানদের জন্য শুধু একটি ধর্মীয় উৎসবই নয় সম্প্রীতিভ্রাতৃত্ববোধ শেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। আমাদের স্মরণে রাখতে হবে ঈদ উৎসব অন্য দশটি উৎসবের মতো নয় এটি ইবাদত কেন্দ্রিক উৎসব। তাই উৎসবের নামে বাড়াবাড়ি পরিহার করার সর্বাত্মক চেষ্টা করা সবার কর্তব্য। সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা। ঈদ মোবারক। লেখক : ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঈদ সৌহার্দ ও সমপ্রীতির প্রতীক
পরবর্তী নিবন্ধমোগলদের হাত ধরে এ দেশে ঈদ উৎসবের সূচনা