ছড়া শুধু ছেলে ভুলানোর নয়, ছড়ায় আাছে দেশপ্রেম। একসময় ছড়া ছিল শুধু শিশুদের মনোরঞ্জনের বিষয়। বয়স্কদের মুখে মুখে ঘুরে বেড়াত। এরপর পেল লিখিত রূপ। সমাজ বদলের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হলো ছড়া– ভাষায়, উপস্থাপনায় ও প্রকাশভঙ্গিতে। বিষয়ে বৈচিত্র্য এলেও আঙ্গিকগত পরিবর্তন এলো অতি ধীরে।
সমাজের বিভিন্ন সময়ে বাঁক বদলের ক্ষেত্রে ছড়ার ভূমিকা তাই অস্বীকার করার উপায় নেই। উপায় যে নেই, তা বহু আগেই প্রমাণ হয়েছে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের আগে থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, যে কোনো শোষকের অন্যায়–অবিচার, নির্যাতন–নিপীড়নের বিরুদ্ধে ছড়া দিয়েই কড়া ভাষায় প্রতিবাদ করা হয়েছে, ব্যঙ্গ–বিদ্রুপের মাধ্যমে কাঁপিয়ে দেওয়া হয়েছে শোষকের ভিত। ছড়ায় উঠে এসেছে দেশপ্রেম। আমাদের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধকে সুকুমার বড়ুয়া তাঁর ছড়ায় সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। ছয় দশক ধরে ছড়া লিখে তিনি ‘ছড়ারাজ’, ‘ছড়াশিল্পী’, ‘ছড়াসম্রাট’ প্রভৃতি নানা অভিধায় অভিষিক্ত হয়েছেন।
‘ধন্য সবায় ধন্য/ অস্ত্র ধরে যুদ্ধ করে/ মাতৃভূমির জন্য।/ ধরল যারা জীবন বাজি/ হলেন যারা শহীদ গাজি/ লোভের টানে হয়নি যারা/ ভিনদেশীদের পণ্য।/ দেশের তরে ঝাঁপিয়ে পড়ে/ শক্ত হাতে ঘায়েল করে/ সব হানাদার সৈন্য/ ধন্য ওরাই ধন্য।/ এক হয়ে সব শ্রমিক কিষাণ/ ওড়ায় যাদের বিজয় নিশান/ ইতিহাসের সোনার পাতায়/ ওরায় আগে গণ্য।’ (মুক্তিসেনা)। বর্তমানে দ্বিতীয় শ্রেণির ‘আমার বাংলা বই’য়ের ৫৬ পৃষ্ঠায় এই ছড়াটির অংশবিশেষ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে শিল্পী–সাহিত্যিকদের আন্দোলিত করেছে, মানসপটে রেখাপাত করেছে। তাঁরা সৃষ্টি করেছেন নতুন নতুন সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্র। বলতে গেলে সাহিত্যের সব শাখায় মুক্তিযুদ্ধকে তরা ফুটিয়ে তুলেছেন। আমাদের ছড়াসাহিত্যেও এর প্রভাব লক্ষণীয়।
আবার যে মুহূর্তে তার লেখাগুলো অসাধারণ শিশুতোষ ছড়া হিসেবে পাঠকের সামনে হাজির হয় এবং পাঠককে আপ্লুত করে, তখন কিন্তু তাঁকে শিশুসাহিত্যিক ছাড়া অন্য কিছু ভাবার অবকাশ থাকে না। বাংলা ছড়াসাহিত্যের প্রধান ব্যক্তি হিসেবে যদি কারও নাম করতে হয়, তাহলে সর্বাধিক সমর্থন পাবেন সুকুমার বড়ুয়া। তার সৃষ্টি বিবেচনা করে স্বাভাবিকভাবেই আমরা তাকে একজন সমাজ–সচেতন ও শিশুতোষ ছড়াকার– এ দুভাগে ফেলতে পারি।
সমাজ সচেতনতামূলক ছড়াগুলোর দিকে যদি তাকাই তাহলে দেখতে পাব, সেখানেও তিনি ছড়ার স্বাভাবিক ধারা অর্থাৎ সহজ শব্দ ব্যবহারের প্রতি অতি সচেতন। আবার সেগুলো যাতে শিশুদের পাঠ্য হয়, সেদিকেও তার কঠোর দৃষ্টি। তিনি লিখেছেন– ‘খাদ্যে ভেজাল পথ্যে ভেজাল/ ভেজাল শখের জিনিসে/ চলছে ভেজাল দিল্লি–ঢাকা/ বিলেত–জাপান–ভিনিসে।/ ভেজাল কত রইল মিশে/ মানুষজনের চরিত্রে,/ অমনি শাদা অমনি কালো,/ অমনি কেন হরিৎ–রে?/ হিংসাতেও ভেজাল থাকে/ নইলে আবার মিলে যে,/ স্নেহের ভেজাল ধরতে পারি/ কানমলা–চড় কিলে যে…।’(ভেজাল)।
ছড়ায় অনুসৃত উপাদানই বলে দেয় বাস্তব জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে প্রতিফলিত হচ্ছে তাঁর ছড়ায়। কখনো রহস্যঘেরা কিছু, কখনো হাস্যরস কিংবা কখনো একেবারেই ছেলে ভোলানো রূপক দেখা যাবে সুকুমার বড়ুয়ার ছড়ায়। হাস্যরসের ছড়াগুলো আবার তাকে শিশুসহ সব শ্রেণির পাঠককেই আনন্দ দেয়। সে ক্ষেত্রেও সুকুমার বড়ুয়াকে মনে হতে পারে তিনি সর্বমহলেরই ছড়াকার। এর অন্যতম প্রধান কারণ, তার ছড়ার রসবোধ। পাঠক যখন শিশু হয়, তখন সে মনে করে সুকুমার বড়ুয়া তার জন্যই লিখেছেন, আবার সেই শিশুর মা–বাবা যদি পড়েন, তখন তিনিও মনে করেন– ছড়াটি তাদের জন্যই লেখা হয়েছে। এই মুন্সিয়ানা তাকে অনন্য করে তুলেছে।
শিশুর মনোরঞ্জন, অবসরযাপন, জ্ঞান ও নীতিশিক্ষা ইত্যাদি কারণে ছড়ার চর্চা হয়ে থাকে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে লৌকিক ছড়া কেবল শিশুর জন্য রচিত হয়নি, শিশু–কিশোর, তরুণ–যুবক, বয়স্ক সকল শ্রেণির জন্য সুকুমার বড়ুয়া ছড়া লিখেছেন। তিনি আঞ্চলিক ছড়া রচনা করেছেন। ‘চম্পাবতীর জামাইয়ে/ পয়সা দু’য়া কামাইয়ে/ গরম গরম টেঁয়া ঢালি/ টেম্পু দুইয়ান নামাইয়ে।’ রবীন্দ্রনাথ বলেন, ছড়ার অর্ধেক কল্পনার, অর্ধেক বাস্তবের। তিনি ছড়াকে ‘স্বপ্নদর্শী’ মনের সৃষ্টি বলেও উল্লেখ করেন।
ছড়াসম্রাট সুকুমার বড়য়ার ব্যক্তি জীবন বিস্ময়ে ভরা। সুকুমার বড়ুয়ার জন্ম ১৯৩৮ সালের ৫ জানুয়ারি রাউজানের বিনাজুরি গ্রামে। তার বাবার নাম সর্বানন্দ বড়ুয়া এবং মা কিরণবালা বড়ুয়া। ব্যক্তিগত জীবনে সুকুমার বড়ুয়া তিন মেয়ে এবং এক ছেলের জনক। বর্ণজ্ঞান থেকে প্রথম শ্রেণি পর্যন্ত তিনি মামাবাড়ির স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। এরপর ডাবুয়া স্কুলে ভর্তি হন। কিন্তু সেই স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর তার পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। অল্প বয়স থেকেই তিনি বিভিন্ন সময় নানা কাজ করেছেন। জীবিকা নির্বাহের জন্য ফেরি করে বিক্রি করেছেন হরেকরকম পণ্য। ১৯৬২ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে চাকরি হয় তার। ১৯৭৪ সালে পদোন্নতি পেয়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হন। ১৯৯৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টোরকিপার হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।
সুকুমার বড়ুয়ার বিখ্যাত কিছু সাহিত্যকর্ম হলো ‘পাগলা ঘোড়া’, ‘ভিজে বেড়াল’, ‘চন্দনা রঞ্জনার ছড়া’, ‘এলোপাতাড়ি’ এবং ‘নানা রঙের দিন’। তার ১০১টি ছড়া– ‘চিচিং ফাঁক’, ‘কিছু না কিছু’, ‘প্রিয় ছড়া শতক’, ‘বুদ্ধ চর্চা বিষয়ক ছড়া’, ‘ঠুস্ঠাস্’, ‘নদীর খেলা’, ‘আরো আছে’, ‘ছড়া সমগ্র’, ‘ঠিক আছে ঠিক আছে’, ‘কোয়াল খাইয়ে’, ‘ছোটদের হাট’, ‘লেজ আবিষ্কার’ প্রভৃতি। তিনি ১৯৭৭ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৯৭ সালে অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য সম্মাননা, ১৯৯৯ সালে আলাওল শিশুসাহিত্য পুরস্কার এবং ২০১৭ সালে একুশে পদক লাভ করেন।
গত ২ জানুয়ারি ৮৮ বছর বয়সে এই ছড়াসম্রাট আমাদের ছেড়ে গেছেন। রেখে গেছেন তাঁর অসাধারণ সৃজনাত্মক কর্ম। সৃষ্টিকর্মের মধ্য দিয়ে তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন।






