গতকাল ৫ জানুয়ারি ছিল জাতীয় ছড়া দিবস। যাঁর জন্মদিনকে ঘিরে এই দিবস তিনি চলে গেলেন ২ জানুয়ারি। তিনি আর কেউ নন ছড়াসম্রাট সুকুমার বড়ুয়া। ছড়ার জাদুকর, ছন্দের জাদুকর সুকুমার বড়ুয়া। ‘অসময়ে মেহমান/ ঘরে ঢুকে বসে যান/ বোঝালাম ঝামেলার/ যতগুলো দিক আছে/ তিনি হেসে বললেন/ ঠিক আছে, ঠিক আছে’–এরকম অনেক ছড়ার জনক সুকুমার বড়ুয়া। তাঁকে চারণ ছড়াশিল্পী বলা যায় নিঃসন্দেহে। বাংলাদেশ বানের দেশ, ধানের দেশ, গানের দেশ অথবা বাঙালির গোলায় গোলায় ধান আর গলায় গলায় গান। ছড়া শিশুতোষ রচনা হিসেবে পরিচিত। শিশুর মনোরঞ্জন, অবসরযাপন, জ্ঞান ও নীতিশিক্ষা ইত্যাদি কারণে ছড়ার চর্চা হয়ে থাকে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে লৌকিক ছড়া কেবল শিশুর জন্য রচিত হয়নি, শিশু–কিশোর, তরুণ–যুবক, বয়স্ক সকল শ্রেণির জন্য সুকুমার বড়ুয়া ছড়া লিখেছেন। তিনি আঞ্চলিক ছড়া রচনা করেছেন।‘চম্পাবতীর জামাইয়ে/ পয়সা দু’য়া কামাইয়ে/ গরম গরম টেঁয়া ঢালি/ টেম্পু দুইয়ান নামাইয়ে’ কিংবা ‘গাছ বাড়িয়ার ব্যাপারি/ গোল মোহাম্মদ রেজা/ নিজের দোষে ক্ষতি হইলে/ পোয়ার মারে গেজা’। গ্রামে গরু–ছাগল ঠিকমতো না বাধলে পাড়া–পড়শির কথা শুনতে হয়। কেননা গরু–ছাগল ছুটে অন্যের খেত নষ্ট করে। ‘বেআক্কইল্যা এত গাধা/ ন শিখিল গরু বাধা/ এতবড় ছৈইয়র ডুয়া/ খাবা ফেলাইয়ে’। ছড়াকে ‘গ্রাম্য কবিতা’ বলা হয়। এটি সৃজনশীল রচনা, এতে ব্যক্তির আবেগ ও কল্পনা বাণীরূপ লাভ করে। সমাজের সমষ্টিগত মানুষের আবেগ ও কল্পনার ব্যঙ্গময় রূপ ছড়া। সুকুমারের ছড়ায় বাস্তব ও কল্পিত বিষয়ের মিশ্রণ আছে। রবীন্দ্রনাথ বলেন, ছড়ার অর্ধেক কল্পনার, অর্ধেক বাস্তবের। তিনি ছড়াকে ‘স্বপ্নদর্শী’ মনের সৃষ্টি বলেও উল্লেখ করেন।
সুকুমার বড়ুয়া অল্প বয়স থেকেই বিভিন্ন সময় মেসে কাজ করেছেন। জীবিকা নির্বাহের জন্য তিনি এক সময় তিনি ফেরি করে নানা পণ্য বিক্রি করতেন। মা বাবা মারা যাওয়ার পর ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬৪ টাকা বেতনে একটি চাকরি জোটে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্নপদস্থ কর্মচারী হয়েও লেখালেখির কারণে তিনি সবার নজরে চলে আসেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিভবনের ‘সহকারী স্টোর কিপার’ পদ থেকে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। সুকুমার বড়ুয়ার প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় ৩ জুলাই ১৯৫৮ সালে দৈনিক সংবাদের ‘খেলাঘর’ পাতায়। ‘বৃষ্টি নেমে আয়’ শীর্ষক ছড়াটি প্রথম লেখা হলেও ঐ পাতার তৃতীয় পুরস্কারে ভূষিত হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিল। প্রথম হয়েছিলেন নাজমা জেসমিন এবং দ্বিতীয় হয়েছিলেন ইমরুল চৌধুরী।
সুকুমার বড়ুয়ার বিখ্যাত কিছু সাহিত্যকর্ম হলো ‘পাগলা ঘোড়া’, ‘ভিজে বেড়াল’, ‘চন্দনা রঞ্জনার ছড়া’, ‘এলোপাতাড়ি’ এবং ‘নানা রঙের দিন’। তার ১০১টি ছড়া– ‘চিচিং ফাঁক’, ‘কিছু না কিছু’, ‘প্রিয় ছড়া শতক’, ‘বুদ্ধ চর্চা বিষয়ক ছড়া’, ‘ঠুস্ঠাস্’, ‘নদীর খেলা’, ‘আরো আছে’, ‘ছড়া সমগ্র’, ‘ঠিক আছে ঠিক আছে’, ‘কোয়াল খাইয়ে’, ‘ছোটদের হাট’, ‘লেজ আবিষ্কার’ প্রভৃতি। তিনি ১৯৭৭ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৯৭ সালে অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য সম্মাননা, ১৯৯৯ সালে আলাওল শিশুসাহিত্য পুরস্কার এবং ২০১৭ সালে একুশে পদক লাভ করেন।
সুকুমারের ছড়ায় মানুষ, সমাজ, সংসার, প্রকৃতি, বিশ্বলোকের নানা চিত্র প্রতিফলিত। কবি আসাদ চৌধুরী বলেন, ছন্দ যেন ভিটেবাড়ির প্রজা, যেমন খুশি ব্যবহার করছেন, হাসানোর জন্য, চটানোর জন্য, রাগিয়ে দেওয়ার জন্য, কী কাঁদাবার জন্য। অসম্ভব ক্ষমতা থাকলেই অতো সহজেই সমিল ছড়া ও কবিতা লেখা সম্ভব। মিল খোঁজার জন্য তাঁকে বোধ হয় কোনদিন নিজের চুল ছিঁড়তে হয়নি।…কবি না হলে এমন ছড়া ও কবিতা লেখা কিছুতেই সম্ভব নয়। তাঁর ছড়ার সংখ্যা অগুণতি। তাঁর রয়েছে অনেক রাজনৈতিক ছড়া। এখনো সমানতালে লিখে চলেছেন। শিশু থেকে বয়স্ক পর্যন্ত সকলের কাছে সুকুমারের ছড়া এখনো দোলা দেয়। তিনি এখনো শিশু। অনাগত শিশুর মাঝে বেঁচে থাকবেন।
অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী সুকুমার বড়ুয়া, সেসাথে পরিশ্রমীও। মেধা ও শ্রমের সংমিশ্রণে তিনি পেয়েছেন লেখালেখির ক্ষেত্রে অসামান্য খ্যাতি।
লেখক : সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক।












