ভাবতে পারি, মনে করে কে কখন কত কথায়, আচরণে কষ্ট দিয়েছে মনে। গহীন দুঃখের দিনগুলোতে কারা ছিল না পাশে। যাদের কাছে ছুটে যাই রোজ, তারা সকলেই বা কোথায় আজ। কিন্তু এই পৃথিবীর বুকে, এই দেশের মাটিতে আজন্ম পাপের ভাগিদার যারা, তাদের প্রত্যেকের ছোট ব্যাথায় এখন কিইবা এসে যায়? ছোটবেলায় আমাদের শেখানো হতো, তোমাকে বড় হতে হবে। বড় হলে মুশকিল, ছোট মুখে বড় কথা কারই বা ভালো লাগে। ছোটদের ছোট যত কথা, অন্তরে ভিজেছে একা। সূচনা তাই ভাবনার অন্তরালে, মিছে মিছে কেন এত জ্বালা!
এ লেখার আপাতত কোনো উদ্দেশ্য নেই, গন্তব্যহীন লেখার সূচনা তাই কিছুটা আবেগের। আমরা এখন আবেগকে ছেঁটে দিতে পারি। কারণ ছোটবেলা জীবন থেকে ছেঁটে গেছে বহু আগে। লেখার মধ্যভাগ হলো ইংরেজিতে বডি। অর্থাৎ লেখকের মূল বক্তব্য। শৈশবকে বিভাজন কিংবা নির্দিষ্ট অংশে ভাঙবার কিছু নেই। শৈশব জন্ম থেকে মৃত্যু অব্দি। এর মাঝে অচেনা যত ঝড় তুফান আসে, তাদের বরং বিভাজনের রাজনীতিতে ফেলা যায়। যেমন ধরুন, ছোটবেলায় একই ঘরের কন্যা শিশু আর ছেলেবাবুর মাঝে আকাশ পাতাল এক তফাৎ। ছেলেরা শিখে ফেলে তাদের অনেক দায়িত্ব, তারা হবে বাঘের মত শক্তিশালী কিংবা সুপারম্যান। আর কন্যাশিশু হয় মায়ের প্রতিচ্ছবি। মায়েরা হয় মায়ের মত, দায়িত্বশীল, ধৈর্য্যের মূর্ত প্রতীক, সহ্যসীমার বাইরে যার পদার্পণ। মায়ের মত হবার দৌড়ে ছোট ছোট কথায়, কখন যেন ছোট শিশুকন্যারা বড় হতে থাকে। শুনেছি আজ অধিকাংশ কন্যাশিশু দশ না পেরুতেই রক্তের সাগরে ডুবে মরে। ফলে বুঝ–জ্ঞান একটু আগেই আসে। এরপর বলা হতে পারে, এতটুকু কাজও কি তোমার দ্বারা হয় না? কোনো কাজ নেই, অন্তত নিজের দিকে যত্ন নিতে পারো। একটু পরিপাটি হয়ে থাকলে না হয়!
এই ছোট ছোট পরিপাটি জীবনের শিক্ষাগুলো কত ভারি হতে পারে কারো কাছে? কেউ হয়তো ভীতু কিন্তু সমাজের তোপের মুখে তাকে হতে হয় সাহসী। আরে সে তো ম্যানুফেকচারিং করা রোবট নয় যে, বললেই হুট করে পারমাণবিক বোমা ছুঁড়ে দিবে। হোক সে কন্যা শিশু কিংবা কারো আহ্লাদি ছেলেবাবু। ছোট কথায়, ধীরে বুঝিয়ে যদি রোবটই বানাবে তবে মানুষের পেট থেকেই বের করলে কেন? যুগ তো এগিয়েছে বহু যুগ হলো, একটা যন্ত্রের মানবই মানত করতে না হয়।
ছোট কথাকে সকলেই কি ছোট করে দেখে? কারো ছোট কথায় লুকিয়ে থাকে উপদেশ, কেউ দেয় শিক্ষা, কেউ কাটে টিপ্পনী আবার কেউ দেয় উচিত জবাব। সিনেমায় দেখছিলাম, পাত্রপক্ষ প্রায় পঞ্চাশ ঘর ঘুরেছে মেয়ে দেখতে। প্রত্যেক ঘরেই এক প্রকার বেজ্জত হয়ে ফিরলো। কারণ পাত্রপক্ষের ছোট ছোট শব্দে ভেঙ্গে পড়ছিলো শত নারীর আত্মসম্মান। যেমন, আপনি কি বিয়ের পরও চাকরি করবেন? আগের বিয়েটা ভাঙ্গলো কেন? আপনি হাত পায়ের লোম তুলেন না কেন? রেডিও জকির কাজটা নিশ্চয় শখে করেন? বিয়ের পর বাচ্চা হলে তাকে কিভাবে মানুষ করবেন? আপনার গলার স্বর এত ভারি কেন? ওজন কমাবেন নিশ্চয়? এত এত প্রশ্নের ভীড়ে হুট করে পাত্রী দাঁড়িয়ে বললো, একটা গল্প বলি। একদা গাধার সামনে ব্রেইন রাখা হলো, তাকে নিতে বললেও সে এটি নিলো না। প্রশ্ন করুন কেন? কারণ সে গাধা। হা হা হা, ছোট একটা দৃশ্য ছিল কিন্তু এত আনন্দ পেলাম। হাসলামও খুব।
ছোট কথার সারাংশেই আসছিলাম। মানুষ আজকাল খুব অল্প শব্দে, পারলে অল্প কিছু ইশারায় তার সমস্ত ভাব প্রকাশ করে ফেলে। এখন কোথাও বাড়তি, বেশি কোনো বাক্যই গ্রহণযোগ্য নয়। তাহলে এতকাল নারীরা এক বাক্যেই রেইপ কিংবা নির্যাতনের বিরুদ্ধে ‘না’ বলে আসছে, তার কোনো প্রতিফলন নেই কেন এই সমাজে। নারীদের এই ছোট একটি শব্দ কি প্রতিবাদের জন্যে যথেষ্ট নয়?
বাসে অশ্লীল হাতের ছোঁয়া, রাস্তাঘাটে ইভটেজিং, লঞ্চ–ঘাটে মব করে মোরাল পুলিসিং করে হেনস্তা, অনলাইন–অফলাইনে গালিগালাজ, ঘরে–অফিসে শারীরিক মানসিক নির্যাতন, রেইপ এই সকল কিছুর বিরুদ্ধে একটাই ছোট শব্দ ‘না’। এই ছোট শব্দ কি আমাদের এই সমাজের স্বর হতে পারে না? তারা কারা? যাদের এখনো এতটুকু সাহস হলো না, আমাদের এই ‘না’ এর পক্ষে দাঁড়াবার। যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে যার দুবার ভাবতে হয় তার সকল স্বর ও সুরের প্রতি ধিক্কার। ঘুম থেকে জেগে, ঘুমানোর আগ অব্দি যত শত আতঙ্ক প্রত্যেক নারীর বুকে, সেসকল অপশক্তির বিরুদ্ধে এই ‘না’। আমাদের ছোট এই কথা, আর না ভিজুক একা। এবার অন্তত বড় কিছু স্বপ্ন হোক, বড় চাওয়াগুলো পূর্ণ হোক।
উপরের সমস্ত কিছুর সংহার হতে পারে মাত্র একটি ছোট শব্দে, নারীর প্রতি যেকোনো ধরণের সহিংসতার প্র্রতি ‘না’ বলে।














