বাংলা ছড়ার আকাশে আজ হঠাৎ করেই নিভে গেল এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ছড়াজাদুকর, একুশে পদক ও বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি সুকুমার বড়ুয়া আর নেই। ২০২৬ সালের ২ জানুয়ারি ভোরের আলো ফোটার আগেই, চট্টগ্রামের রাউজানের এক হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর। তাঁর প্রয়াণে বাংলা ছড়াসাহিত্য হারাল এমন এক কণ্ঠস্বর, যে কণ্ঠে ছিল হাসি, ব্যঙ্গ, মমতা, জীবনসংগ্রাম ও মানুষের প্রতি অগাধ বিশ্বাস।
শৈশবেই তাঁকে নামতে হয় জীবনের কঠিন বাস্তবতায়–রোজগারের তাগিদে। শিশুশ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন মাত্র বারো বছর বয়সে। কখনো শিশুকে সঙ্গ দেওয়া, কখনো রান্নার কাজ, কখনো আইসক্রিম কিংবা বাদাম ফেরি–জীবন চালাতে কোনো কাজই বাদ রাখেননি।
অভাবের কারণে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন থেমে যায় তৃতীয় শ্রেণীর আগেই। নিজেই বলতেন-“মাত্র আড়াই ক্লাস পর্যন্ত পড়েছি আমি।” কিন্তু এই অল্প শিক্ষাই তাঁর জ্ঞানকে সীমাবদ্ধ করতে পারেনি। লোকজ ছড়া, পুঁথিপাঠ, গ্রামবাংলার কণ্ঠস্বর আর গভীর আত্মশিক্ষার ভেতর দিয়ে তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন এক স্বশিক্ষিত সাহিত্যিক হিসেবে। শৈশবে মনসার পুঁথি, ভেলুয়ার পুঁথি, যোগীন্দ্রনাথ সরকারের ‘হাসিখুশি’–এসবই তাঁর কল্পনাজগৎকে ছন্দে ছন্দে রাঙিয়ে দিয়েছিল।
১৯৫৮ সালের ৩ জুলাই দৈনিক সংবাদের ‘খেলাঘর’ পাতায় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম ছড়া– ‘বৃষ্টি নেমে আয়’। সেই ছড়াই তৃতীয় পুরস্কার পেয়ে জানান দেয়, ছন্দের জগতে এক নতুন কণ্ঠস্বরের আগমন ঘটেছে। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। শিশুদের হাসি, সমাজের অসংগতি, নৈতিক শিক্ষা, ব্যঙ্গ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, এমনকি রাজনৈতিক বাস্তবতাও তাঁর ছড়ায় জায়গা পেয়েছে অনায়াসে।
জীবিকার তাগিদে ১৯৬২ সালে সুকুমার বড়ুয়া মাত্র ছয়ষট্টি টাকার মাসিক বেতনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে যোগ দেন। আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তিনি দায়িত্বের প্রতি সততা ও নিষ্ঠা প্রদর্শন করেছিলেন। সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে পদোন্নতি পেয়ে তিনি স্টোর কিপার পদে উন্নীত হন এবং ১৯৯৯ সালে এই পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। কর্মজীবনে তিনি ছিলেন নীরব, সহজাত ভদ্র ও পরিমিত, কখনো নিজের সাফল্যকে প্রদর্শনের চেষ্টা করেননি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্নপদে থেকেও তিনি সাহিত্যচর্চায় ছিলেন প্রবলভাবে সক্রিয়–ছড়া, গল্প, শিশুতোষ লেখা এবং নৈতিক ও সাংস্কৃতিক বার্তা তার লেখায় প্রতিফলিত হত। এই সাধারণ, নীরব কর্মজীবন এবং অদম্য সৃজনশীলতা একত্রিত হয়ে তাকে বাংলা সাহিত্যের এক অনিবার্য নাম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। সুকুমার বড়ুয়ার জীবন প্রমাণ করে যে, পদমর্যাদা বা সামাজিক অবস্থান নয়, বরং নিষ্ঠা, পরিশ্রম এবং সৃজনশীল প্রতিভাই একজন মানুষকে সত্যিকারের মর্যাদা দেয়। এটি এক অনন্য জীবনদৃষ্টান্ত, যা শুধু সাহিত্যিক প্রজন্ম নয়, সকলের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
সুকুমার বড়ুয়ার ছড়ার প্রকৃত শক্তি ছিল তার ভাষার জাদুতে। সাধারণ কথাকে তিনি করে তুলতেন এক অনন্য ছন্দময় সৃষ্টি, যেখানে শাণিত বুদ্ধি আর কোমল মানবিকতা এক সঙ্গে মিলিত হতো। তাঁর ছড়ায় রয়েছে সেই শক্তি, যা শিশুদের মুখে হাসি ফুটায়, আনন্দের সঞ্চার করে, আবার একই সঙ্গে চিন্তার খোরাকও দেয়–যেন ছোটো মনে বড়ো বাস্তবতার ছোঁয়া। আটপৌরে বিষয়, ব্যঙ্গাত্মক রস, নৈতিক শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা–সবকিছুই তিনি সরল ভাষায় ছন্দে গেঁথে দিয়েছেন। তাঁর লেখায় প্রাণ রয়েছে, প্রতিটি লাইন যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে।
দীর্ঘ ও নিরলস সাহিত্যচর্চার স্বীকৃতি হিসেবে সুকুমার বড়ুয়া জীবদ্দশায় অর্জন করেছেন অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা। ১৯৭৭ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে তাঁর সাহিত্যিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর বাংলাদেশ শিশু একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, আলাওল শিশুসাহিত্য পুরস্কার, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব সম্মাননাসহ দেশ–বিদেশের নানা সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান তাঁকে সম্মানিত করেছে। ২০১৭ সালে ভাষা ও সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন। এই স্বীকৃতিগুলো শুধুমাত্র একজন ছড়াকারকে নয়, বরং জীবনের বাস্তব সংগ্রাম ও সৃজনশীল প্রতিভার প্রতি শ্রদ্ধার প্রতীক, যা বাংলার শিশুতোষ সাহিত্যের মানদণ্ডকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন এক সংসারী মানুষ। ১৯৬৪ সালের ২১ এপ্রিল ননী বালা বড়ুয়ার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তিন কন্যা ও এক পুত্রকে নিয়ে তাঁর সংসার ছিল নির্লোভ, সহজ ও স্নেহময়। সুকুমার বড়ুয়ার মৃত্যু শুধু একজন কবির মৃত্যু নয়–এটি বাংলা ছড়াসাহিত্যের এক দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি। তবে তাঁর লেখা ছড়া, তাঁর জীবনসংগ্রামের গল্প, তাঁর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি–সবই থেকে যাবে প্রজন্মের পর প্রজন্মের পাঠে, কণ্ঠে ও স্মৃতিতে। ছন্দের মানুষটি চলে গেছেন, কিন্তু ছন্দ রয়ে গেছে–চিরকাল।
লেখক : প্রাবন্ধিক











