বাংলাদেশের চারিদিকে যখন মুক্তিযুদ্ধের ডামাডোল। হানাদার পাক বাহিনী যখন গ্রামেগঞ্জের হাজার হাজার ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিচ্ছে, অকাতরে পশুর মত বাঙালিদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মা বোনের ইজ্জত লুন্টন করছে ঠিক সেই সময় কাট্টলীর প্রায় অর্ধশতাধিক তরুণ যুবক জীবনের মায়া ত্যাগ করে অস্ত্র হাতে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। জাতির সেই বীর শ্রেষ্ঠসন্তানদের মধ্যে একজন ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা চৌধুরী বেলায়েত আলী। এলাকায় তিনি বেলা নামেই সমধিক পরিচিত।
চৌধুরী বেলায়েত আলী ১৯৫৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি উত্তর কাট্টলীর মুন্সীপাড়ার প্রসিদ্ধ শেখ বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার দাদা ছিলেন তৎকালীন বিশিষ্ট জমিদার সমাজহিতৈষী আমীর হোসেন চৌধুরী। সেই আমীর হোসেন চৌধুরীর প্রথমপুত্র কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী ৪ ছেলে ও ৬ মেয়ের মধ্যে ভাইদের মাঝে বেলা ছিলেন তৃতীয় সন্তান। বাড়ির পাশেই মুন্সীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তার শিক্ষাজীবন শুরু। তখন থেকেই মেধার সাক্ষর রেখেপঞ্চম শ্রেণিতে মেধা বৃত্তি লাভ করেন বেলায়েত আলী বেলা। এরপর চট্টগ্রাম কলেজিয়েট হাই স্কুলে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর তিনি ঢাকায় বোনের বাসায় চলে যান এবং সেখানে ঢাকা ওয়েস্টার্ন স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করেন। পরে চট্টগ্রাম এসে সিটি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে চৌধুরী বেলায়েত আলী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ও বাংলা সাহিত্যে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে তিনি অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করে কানাডায় চলে যান। দীর্ঘদিন কানাডা থেকে ২০২২ সালে দেশে ফিরে আসলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে বীর মুক্তিযোদ্ধা চৌধুরী বেলায়েত আলী বেলার সাহসী ভুমিকা ও অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। দেশে যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় তখন বেলায়াত আলী সবে এসএসসি পাশ করা টগবগে এক দুরন্ত তরুণ। যে বয়সে তরুণরা রঙিন জগতে ডানামেলে উড়ে, গল্পগুজব ও আড্ডায় মেতে থাকে, ঠিক সেই বয়সে বেলায়েত আলী দেশপ্রেমে অদম্য সাহসে জীবনের মায়া ত্যাগ করে দেশমাতৃকার স্বাধীনতার অকুতোভয় সৈনিক হিসাবে পাকহানাদার বাহিনী নিধনে অস্ত্র হাতে তুলে নেন।
চট্টগ্রামের চারিদিকে তখন তুমুল যুদ্ধ চলছে। চারিদিকে যখন ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থা ঠিক তখনই গেরিলা গ্রুপ কমান্ডার ডাঃ মাহফুজুর রহমানের নির্দেশনায় কৈবল্যধাম পেট্রোল ট্রেন অপারেশনের পরিকল্পনা করা হয়। পাকিস্তানী আর্মিরা এই রেলপথে পেট্রোল আনা নেয়া করত।
টার্গেট করা হল কৈবল্যধামের উত্তরে ব্রিজসহ পেট্রোল ট্রেন উড়িয়ে দেয়া হবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী উক্ত অপারেশনের জন্য বিএলএফ কে সি – ৩ এর প্রধান হতে দায়িত্ব নিয়ে কে সি ৪ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা রইসুল হক বাহারকে পূর্ব পরিকল্পনা নিয়ে কাট্টলী নজুমিয়া বাড়িতে লজিং রাখার ব্যবস্থা করা হয়। লজিংয়ে এসে রইসুল হক বাহারের (প্রয়াত) সাথে এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে কমান্ডার শাহাবুদ্দিন চৌধুরী, শফিকুল আলম চৌধুরী, ডাঃ রাগিব মনজুর, মোঃ মুসা, ইমতিয়াজ উদ্দিন পাশা, চৌধুরী বেলায়েত আলী বেলা, শহিদুল আলম বাদলসহ কয়েকজনের সাথে পরিচয় ঘটে এবং অপারেশনের বিষয়টা তাদের অবহিত করেন।
এরপর গ্রুপে বিভক্ত হয়ে কয়েকদিন যাবৎ অপারেশনের স্থান রেকি করা হয় । চারপাশের অবস্থা ওয়াচ করে চূড়ান্ত হয় কৈবল্যধামের উত্তরে পেট্রোলট্রেন ও ব্রিজ উড়িয়ে দেয়ার।
তবে এরজন্য কী পরিমাণ বিস্ফোরক, আনুষঙ্গিক অস্ত্রশস্ত্র এবং ট্রেনিংপ্রাপ্ত কজন গেরিলা যোদ্ধা লাগবে তার একটা পূর্ণ তালিকা অতিগোপনীয়তার সাথে গ্রুপ কমান্ডারের নিকট পাঠানো হয়। কমান্ডার থেকে যথাসময়ে প্রয়োজনীয় বিস্ফোরক দ্রব্য, অস্ত্র ও দক্ষ গেরিলাযোদ্ধা হিসাবে তোফাজ্জল ও আনোয়ারকে কাট্টলীতে পাঠানো হয়।
সরাইপাড়ার একটি গোপন আস্তনায় এবং সমুদ্রপাড়ে গেরিলাদের ট্রেনিং দেয়া শুরু হল। ট্রেনিং দিতেন, মুক্তিযোদ্ধা আবুল কাশেম, প্রয়াত মোঃ শরীফ, আহমদ হোসেন, প্রয়াত আবুল হোসেন সরকারসহ কয়েকজন।
এদিকে মুক্তিযোদ্ধা নুরউদ্দিনের দেউরি ঘরে ও মুন্সীপাড়ার বেলায়েত আলীর বাড়িতে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে গেরিলাযোদ্ধারা গোপনে মিলিত হতে লাগল। রইসুল হক বাহার অপারেশন সম্পর্কে যোদ্ধাদের ব্রিফ করেন।
১৯৭১ সালের ২৬ অক্টোবর অপারেশনের দিনক্ষণ ঠিক করা হয় । অপারেশনের স্থান রেকি করার সময় প্রতিদিন দেখা গিয়েছিল ট্রেনটি ঠিক সন্ধা সাড়ে ৬ টায় কৈবল্যধামের উত্তরের ব্রিজ পার হয়। সে মতে অপারেশন গ্রুপেরও কাজ শুরু হয়।
এতে গেরিলা যোদ্ধা রইসুল হক বাহারের নেতৃত্বে গ্রুপের অন্য যোদ্ধারা হলেন তোফাজ্জল, আনোয়ার, শফিকুল আলম, প্রয়াত মোঃ মুসা খান, ডাঃ রাগিব মনজুর, প্রয়াত চৌধুরী বেলায়েত আলী বেলা, ইমতিয়াজ উদ্দিন পাশা, শহিদুল আলম বাদলসহ আরো দুয়েকজন ছিলেন।
কমান্ডের আদেশমতে ঐদিন সকাল থেকে থেমে থেমে অতি গোপনে অপারেশনের কাজ চলছিল। রেল লাইনে ছোট ছোট প্লাস্টিক স্লেভ বসানো হল। এই ব্যাপারে রইসুল হক বাহারকে সাহায্য করছিলেন ইমতিয়াজ উদ্দিন পাশা ও বেলায়েত আলী বেলা। কভারিংয়ে ছিলেন আনোয়ার ও তোফাজ্জল। অন্যদের বাহিরে নজরদারির দায়িত্ব দেয়া হয়। কিন্তু ট্রেনটি প্রতিদিন সাড়ে ৬ টায় আসলেও উক্তদিন ৬ টার দিকে চলে আসতে দেখে গেরিলা যোদ্ধারা পুরোপুরি রেডি হয়ে যায়। ট্রেন ব্রিজে উঠার সাথে সাথেই সাহসী যোদ্ধা রইসুল হক বাহার ঞ ্ ঞ এর ঈড়ৎফ ‘র লাগানো সুতা টান দিলে বিকট শব্দে পুরো পেট্রোল ট্রেন ও ব্রিজ বিস্ফোরিত হয়ে যায়। সেকেন্ডের মধ্যে ট্রেনের বগিগুলো ছিটকে পড়ে ভেঙে চুরে বিধ্বস্ত হয়ে যায় এবং জানা মতে সেদিনের অপারেশনে ৪০ থেকে ৫০ জন পাকহানাদার আর্মির স্পট মৃত্যু হয় এবং অসংখ্য সেনা গুরুতর আহত হয়।
অপারেশন সফল করে গেরিলা যোদ্ধারা মুহূর্তের মধ্যেই ফিরোজশাহ জানারখীল হয়ে উত্তর কাট্টলীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার শাহাবুদ্দিন চৌধুরী বাড়ির কাছারি ঘরে জমায়েত হয়। তারপর অতি গোপনে নিজ নিজ স্থানে ফিরে যান।
এছাড়াও সীতাকুণ্ডর বাঁশবাড়িয়ার মুক্তিযোদ্ধা মোজাফফর ও মতিনদের কাছ থেকে কাট্টলীর সমুদ্রপাড়ে যেখানে বর্তমানে জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে সেখানে গভীর রাতে অস্ত্র গোলাবারুদ আসত। কাট্টলী ও সরাইপাড়ার গেরিলা যোদ্ধারা জীবনের বিরাট ঝুঁকিবহন করে
উক্ত অস্ত্রশস্ত্র গোলাবারুদ গ্রুপ কামান্ডের নিকট পাঠিয়ে দিতেন। এই ঝুঁকিপূর্ণ অস্ত্র আদান প্রদানে বেলায়েত আলী খুবই দক্ষ ছিলেন।
এছাড়াও এই গেরিলাযোদ্ধারা কর্ণেলহাট ও সিডিএ মার্কেটের দুইটি পেট্রোল পাম্পকে বোমামেয়ে উড়িয়ে দিলে হানাদার বাহিনীকে পেট্রোল সংকটে ফেলেন।
আগেই বলেছি কানাডা থেকে দেশে ফেরার পর মুক্তিযোদ্ধা চৌধুরী বেলায়েত আলী বেলা অসুস্থ হয়ে পড়েন। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুর নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে অনেকদিন তার চিকিৎসা চলে।
ক্রমাগত তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকলে দেশে নিয়ে আসা হয় এবং চট্টগ্রামে হসপিটালে তার চিকিৎসা চলতে থাকে। আরো অবনতি হলে তাকে বাসায় নিয়ে আসা হয় এবং বাসায় চিকিৎসা চলাকালে মুক্তিযোদ্ধা চৌধুরী বেলায়েত আলী বেলা গত ৩০ জানুয়ারি রাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরেরদিন ৩১ জানুয়ারি দুপুর ২ টায় তার নিজবাড়ি উত্তর কাট্টলীর মুন্সীপাড়া শেখবাড়িতে নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে জাতির শ্রেষ্ঠসন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা চৌধুরী বেলায়েত আলীকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয় এবং পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
দেশ প্রেমিক চৌধুরী বেলায়েত আলী জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও সাদামাটা জীবনযাপনে অভ্যস্থ ছিলেন। উদার মনের এই মানুষটি প্রগতিশীল রাজনীতি ধারণ করেছেন এবং তৎকালীন সময়ে জাসদ ছাত্রলীগ উত্তর জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। এছাড়া তিনি বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।
তার হাতের লেখা ছিল খুব সুন্দর তাই সেই সময় পোস্টার লেখা ও দেয়ালচিকা মারায় তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম নগরীর অন্যতম একজন। তিনি কম কথা বললেও ছিলেন অত্যন্ত সদালাপী ও আন্তরিক এক মানুষ। মৃত্যুকালে মুক্তিযোদ্ধা চৌধুরী বেলায়েত আলী স্ত্রী তাহলিয়া আফরোজ ও এক পুত্র সন্তান রেখে যান। তথ্যসূত্র : বাঙালি জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম গ্রন্থ–মুক্তিযুদ্ধের গবেষক ডাঃ মাহফুজুর রহমান।
লেখক : প্রাবন্ধিক












