চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ

প্রীতিশ রঞ্জন বড়ুয়া | বৃহস্পতিবার , ৯ এপ্রিল, ২০২৬ at ৭:৩৫ পূর্বাহ্ণ

চৈত্রবৈশাখ মাসকে কেন্দ্র করে অনেক আচার অনুষ্ঠান পালিত হতো আগেকার দিনে। তবে সময়ের সাথে সাথে অনেক প্রাচীন প্রথা আজ প্রায় বিলুপ্ত। আগেকার দিনে চৈত্রমাস শুরুর আগে অর্থাৎ ফাগুন মাসের শেষ দিনে গ্রামাঞ্চলে গৃহস্থের বাড়ির ‘ঘাটা বাঁধা’র প্রচলন ছিল। গরুর গোবরের মাঝে মাদার গাছের লাল ফুল দিয়ে ঘাটায় ঢুকবার মুখে আড়াআড়ি আঁট দিয়ে ঘাটা বাঁধা হতো। কারণ হিসেবে বলা হতো, বিগত এগারো মাসের প্রাপ্তি যেন চৈত্র মাসে ম্লান হয়ে না যায় ও কোনো প্রতিবন্ধকতায় না পড়ে। সাধারণত চৈত্র মাসে কোনও মাঙ্গলিক কাজযেমন বিয়েশাদী, কর্ণচ্ছেদ, বস্ত্রালংকার, অন্নপ্রাশন ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হয় না। চৈত্রের প্রথম দিন নব বিবাহিত বধূ শ্বশুর বাড়ির ঘরের চাউনি দেখা ভালো নয়, তাই ঐদিন অন্য কোথাও নাইয়র যাওয়ার রীতি আছে।

চৈত্র মাসে গৃহস্থের ঘরে ঘরে ঢাক বাজানো, গৈরা (একটি ছেলেকে মেয়ের সাজে উপস্থাপন), কালী (কালীর মুখোশ ও পোশাক পরানো) নাচানোর প্রচলন ছিল। অনেকের বাড়ির উঠোনে গানের আসর বসিয়ে এই গৈরাকালীর নাচ প্রদর্শন করা হতো। যারা ‘ছিব গাছ’ তোলেন তারা শিবের পূজার জন্য এই ঢাক (ঢেড্ডেয়াঁ), গৈরাকালী নাচাতে আনেন। গৃহস্থরা তাদেরকে চাল, ডাল, ফলমূল ও অর্থ ‘সিদা’ হিসেবে প্রদান করেন। এ সময় নাপিত বাড়ি বাড়ি গিয়ে চুল কাটতেন এবং গ্রহাচার্য ব্রাহ্মণ নতুন পঞ্জিকা নিয়ে বছরপঞ্জি শুনাতেন, তিনি নতুন বছর কেমন যাবে সে সম্পর্কে আভাস দিতেন।

চৈত্র মাসের শেষ দিনটিকে বলে চৈত্র সংক্রান্তি বা বিষুব সংক্রান্তি এবং ১লা বৈশাখ হল বৈসাবী উৎসব বা বাংলা নববর্ষ। চৈত্র সংক্রান্তির দিন খালের পানিসহ সাত পুকুরের পানি সংগ্রহ করে তাতে সোনারুপাসহ মূল্যবান ধাতু ডুবিয়ে সেই সোনারূপার পানি ঘরে ছিটিয়ে সমস্ত ঘরকে নাইয়ে দেয়া হয়। ঘরে ঘরে পাঁচন রান্না করা হয় এবং অনেকে ঐদিন তিতা খেয়ে থাকেন। এদিন গৃহপালিত গরুছাগলকে স্নান করানো হয়। ঘিলা ফল বেঁটে কপালে লাগিয়ে স্নান শেষে মুরুব্বিদের প্রণাম করার রীতি ছিল। বিউ ফুল ও নিম পাতা ঘরের দরজা, আলমারি, চালের ভান্ড, সিন্দুক, ধানের গোলায়, প্রার্থনার আসনে ও গরুছাগলের গলায় বেঁধে দেওয়া হয়। খৈ এর ছাতু ও মিঠা দিয়ে নাড়ু বানানো হয়। চাল ভাজিতে বাদাম, চনা, সীমবীচি, তিসি, অরহর, কলাই, ফেলন প্রভৃতি মিশিয়ে ‘আট কড়ই’ বানানো হয়। এদিন ব্যবসায়ীরা পুরানো হিসাব বন্ধ করেন। চৈত্র সংক্রান্তির দিন ও পহেলা বৈশাখ ভোরে ‘জাঁকের আগুন’ দেওয়া হয়। বিভিন্ন ধরনের কাঁটাযেমন বিষ কাঁটালি, মন কাঁটা, বেত কাঁটা, আমুই গাছ, কেড়ং পাতা, নিম পাতা. কেঁয়া ঝাড় ইত্যাদি দিয়ে বাড়ির উঠানে জাঁক পোড়ানো হয়। জাঁকের আগুন পোড়ানোর সময় আঞ্চলিক ভাষায় বিভিন্ন ছড়া ও পুঁথির মাধ্যমে মানুষ তাদের মনের আকুতি প্রকাশ করে। যেমনযাক্‌রেযাক্‌ এ বাড়ির সকল আপদবালাই দূর হয়ে যাক/ যাক্‌রেযাক্‌পোক্‌জোঁক্‌, রোগশোক, হাত দইজ্জা পার হই যাক।

এসব ছড়ায় আপদবিপদ, অশুভ ও অন্তরায় থেকে পরিত্রাণের আকুতি আছে। এসব ছড়া, পুঁথি, দোঁহার মাধ্যমে ধনসম্পদ ও জ্ঞানবুদ্ধি সম্পন্ন সুন্দর জীবনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করা হতো। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই গ্রামীণ ছড়ার সাথে মিল রেখে নববর্ষের আগমনী গীতিতে প্রকাশ করেছেন

এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ,

তাপস নিঃশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,

বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক”।

এখানে কবি পুরনো বছরের সকল গ্লানি, দুঃখ, কষ্ট আর হতাশাকে পিছনে ফেলে নতুন বছরকে সুখময় করে তোলার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন এবং মানুষের জাগতিক চাহিদা ও মানবিক প্রয়োজন মিটাবার প্রেরণা ও আপন জীবনকে নব উদ্যমে উজ্জীবিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রাচীন ভারতে বর্ষ গণনায় অগ্রহায়ণ মাস ছিল বৎসরের প্রথম মাস। অগ্র অর্থ প্রথম ও হায়ন অর্থ বছর বা মাস। অগ্রহায়ণ হল প্রথম মাস এবং কার্তিক মাস বৎসরের শেষ মাস। ষোড়শসপ্তদশ শতকে দিল্লীর সম্রাট আকবর বিভিন্ন ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ নির্যাস নিয়ে ‘দীন এ এলাহী’ধর্ম প্রবর্তন করেন। হিজরী চান্দ্র মাসকে সৌর বর্ষের সাথে মিলিয়ে সম্রাটের নবরত্ন সভার অন্যতম আমীর ফতেহ্‌ উল্লাহ্‌ সিরাজী এই ‘দীন এ এলাহী’র পথ ধরে বাদশাহী খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে বাংলা সনের প্রচলন করেন। কারণ অগ্রহায়ণ মাসে কৃষক ঘরে নতুন ফসল তোলার সাথে সাথে তা বিক্রি করে খাজনা পরিশোধ করা কঠিন ছিল এবং কৃষক ফসলের ন্যায্য মূল্য পেত না। বৈশাখে খাজনা প্রদান করা কৃষকের জন্য সহজ এবং আমীরের রাজস্ব আদায়ও সুবিধাজনক হয়। তাছাড়াও ভারতবর্ষে জন্মজাত মহামানব গৌতম বুদ্ধের জন্ম, বুদ্ধত্ব লাভ ও মহাপরিনির্বাণ এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বৈশাখ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে সংঘটিত হয়েছিল। এই বৈশাখ মাস বিশ্ববৌদ্ধদের নিকট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণও বটে।

পহেলা বৈশাখ বাঙালির জাতীয় উৎসব। এই দিন নানা আয়োজনে আনন্দ উৎসব উদযাপন করা হয়। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছাড়াও বই মেলা, কারুপণ্য ও হস্তশিল্প প্রদর্শনী, বলী খেলা, গরুর লড়াই, পাহাড়ি এলাকায় পানি উৎসব, সাংগ্রাই উৎসব, রাজ পুণ্যাহ ইত্যাদি। পহেলা বৈশাখে ব্যাবসায়ীরা নতুন হালখাতা খোলেন। মিষ্টি, পিঠা পুলি সহ বিভিন্ন সুস্বাদু ফল ও পান্তা ইলিশ খাওয়া উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ। এই উৎসব বাঙালি জীবনে এক অনন্য মিলন মেলা। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে এগিয়ে যান সমপ্রীতির মহা মিলনের আঙিনায়। এই বাংলা নববর্ষে মিলে মিশে একাকার হয়ে আছে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও সভ্যতার নাড়ির স্পন্দন।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও সংগঠক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঅনন্ত সন্ন্যাস
পরবর্তী নিবন্ধঅনলাইন পাঠদান ও প্রাসঙ্গিক কথা