চুয়াডাঙ্গায় অভিযানে আটকের পর বিএনপি নেতার মৃত্যু, বিক্ষোভ

মৃত্যু অনাকাঙ্ক্ষিত, সেনা সদস্যদের প্রত্যাহার, তদন্তে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি : আইএসপিআর

| বুধবার , ১৪ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৬:৪৬ পূর্বাহ্ণ

চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলায় অভিযানে আটকের পর এক বিএনপি নেতার মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনার পর স্থানীয় নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ করেছেন। মৃত শামসুজ্জামান ডাবলু (৫৫) জীবননগর পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি জীবননগর বসুতি পাড়ার মৃত আতাউর রহমানের ছেলে। পরিবারের সদস্য ও পুলিশ বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শামসুজ্জামানকে সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙের সামনে তার ওষুধের দোকান হাফিজা ফার্মেসি থেকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা আটক করে। পরে তাকে ওষুধের দোকানের পেছনে উপজেলা বিএনপি কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙে নিয়ে আসা হয়। সেখানকার চিকিৎসক রাত সাড়ে ১১টার দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। খবর বিডিনিউজের।

জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম গতকাল দুপুরে বলেন, রাতে বিএনপি নেতাকে সেনাবাহিনী অভিযান চালিয়ে আটক করে বলে স্থানীয় বিএনপি নেতা ও স্বজনরা বলেছেন। অভিযানে পুলিশ ছিল না। মরদেহ হাসপাতালে আনার পর আমরা বিষয়টা জানতে পেরেছি। সেখানে স্বজন ও বিএনপির নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ করেছেন। আমি ও জেলা প্রশাসক মহোদয় সেখানে গিয়েছি। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। দুপুরের পর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে রয়েছে বলে জানান তিনি। একই কথা বলেছেন জীবননগর থানার ওসি মো. সোলায়মান শেঠ।

এদিকে বিকালে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এ ঘটনাকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত, দুঃখজনক ও কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে বলা হয়েছে। এতে আরও জানানো হয়েছে, এরই মধ্যে ক্যাম্পের কমান্ডার ও অভিযানে অংশগ্রহণকারী সব সেনা সদস্যদেরকে সেনানিবাসে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ঘটনা তদন্তে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, শামসুজ্জামানের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্বজন ও নেতাকর্মীরা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙের ফটকের সামনে বিক্ষোভ শুরু করেন। তখন ভেতরে সেনা সদস্যরা আটকা পড়েন। তারা ফটক আটকে দেন। রাতেই হাসপাতালের সামনে বিএনপির নেতাকর্মীরা আগুন জ্বালিয়ে প্রতিবাদ করেন। তারা অভিযোগ করতে থাকেন, শামসুজ্জামানকে মারধর করা হয়েছে। এতে তার মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন।

গতকাল সকালে ঘটনাস্থলে যান জেলা বিএনপির সভাপতি ও চুয়াডাঙ্গা২ আসনে বিএনপির প্রার্থী মাহমুদ হাসান খান এবং সাধারণ সম্পাদক শরীফুজ্জামান। এরপর বেলা ১১টার দিকে চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হোসেন এবং পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম। তখনও বিএনপির নেতাকর্মী ও স্থানীয়রা বিক্ষোভ করছিলেন। বিএনপি নেতৃবৃন্দ, জেলা ও পুলিশ প্রশাসন বিক্ষুব্ধদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে তারা হাসপাতালের সামনে উপস্থিত জনতার উদ্দেশে বক্তৃতা করেন।

তখন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, মৃত্যুর বিষয়টি কোনোক্রমেই সহজ করে দেখা হবে না। মরদেহ ময়নাতদন্ত হবে, মামলা হবে। দোষী কেউ থাকলে তাকে ছাড় দেওয়া হবে না। ঘটনার বিচারের আশ্বাস দেন পুলিশ সুপারও। এ সময় জেলা বিএনপির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জনতাকে শান্ত থাকার অনুরোধ করেন। তিনি বলেন, পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে থেকে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করবেন।

বিএনপির বাকা ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম মুন্সী দাবি করেন, শামসুজ্জামান ডাবলুকে বিএনপি অফিসে নিয়ে সেনাবাহিনী মারধর করে। এ কারণেই তিনি মারা যান। মৃত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে আনা হয়।

বিকালে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জীবননগর থানার ওসি মো. সোলায়মান শেঠ বলেন, এই অভিযানে আমরা ছিলাম না। শুধু সেনাবাহিনীর সদস্যরা ছিলেন। স্থানীয় লোকজন ও বিএনপি নেতাকর্মীদের বরাত দিয়ে ওসি বলেন, শামসুজ্জামান ডাবলুকে আটকের পর তাকে বিএনপি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেটি তার ওষুধের দোকানের পেছনের দিকে। সেখান থেকে অসুস্থ অবস্থায় তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এর পরই বিএনপি নেতাকর্মী ও এলাকার লোকজন হাসপাতালের সামনে বিক্ষোভ শুরু করেন। সেখানে সেনা সদস্যরা অবরুদ্ধ অবস্থায় ছিলেন।

তদন্তে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি : আইএসপিআর

এই ঘটনাটিকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত, দুঃখজনক ও কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে জানিয়েছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরআইএসপিআর। বিকালে আইএসপিআরের এক বিবৃতিতে ঘটনার বর্ণনায় বলা হয়েছে, সোমবার আনুমানিক রাত ১১টায় জীবননগর উপজেলায় সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের লক্ষ্যে যৌথবাহিনী কর্তৃক একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানকালে জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙ সংলগ্ন একটি ফার্মেসি থেকে অবৈধ অস্ত্র রাখার অভিযোগে মো. শামসুজ্জামান ওরফে ডাবলুকে (৫০) আটক করা হয়। পরবর্তীতে আটক ব্যক্তির তথ্যের ভিত্তিতে টহল দল ফার্মেসিতে তল্লাশি করে একটি ৯ মি.মি. পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন ও চারটি গুলি উদ্ধার করে।

এতে বলা হয়, অভিযান শেষে আটক ব্যক্তি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে অচেতন হয়ে পড়লে তাকে দ্রুত জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে আনুমানিক রাত ১২টা ২৫ মিনিটে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় এরই মধ্যে ক্যাম্পের ক্যাম্প কমান্ডার ও অভিযানে অংশগ্রহণকারী সব সেনা সদস্যদেরকে সেনানিবাসে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে আইএসপিআর জানিয়েছে।

ঘটনার ‘সঠিক কারণ উদঘাটনের উদ্দেশ্যে একটি উচ্চপদস্থ’ তদন্ত কমিটি গঠন করার কথা জানিয়ে এতে আরও বলা হয়েছে, তদন্তে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সেনা আইন অনুযায়ী যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধগণভোটে ‘হ্যাঁ’র পক্ষে জনমত গড়তে মাঠে নামছে জামায়াত
পরবর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামে চার আসনে ৪ জন ফিরে পেলেন প্রার্থিতা