লোহাগাড়ায় চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে টিলা কেটে কুলপাগলীর ছড়ায় বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। উপজেলার চুনতি ও আধুনগর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী গোলাইম্যা ঘোনা এলাকায় এই বাঁধ নির্মাণ করেছে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল। বাঁধের কারণে ছড়ার প্রাকৃতিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে বাঁধের ভাটির দিকে শত শত কৃষক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত পানির অভাবে ধান, সবজি ও অন্যান্য ফসলের উৎপাদন হ্রাস পাবে।
জানা যায়, চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চল। এখানে রয়েছে বিপুল সংখ্যক স্থানীয় ও বিলুপ্তপ্রায় বন্যপ্রাণী। কিন্তু টিলা কেটে বাঁধ নির্মাণ করায় বনাঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হবে। এতে শুধু বন ও কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, বরং বন্যপ্রাণীর প্রজনন, খাদ্য সরবরাহ এবং স্থানচ্যুতিও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হতে পারে। বনের অপরিবর্তনীয় প্রাকৃতিক ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
স্থানীয়রা জানান, চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের গভীর বনাঞ্চল থেকেই পাগলী ছড়ার উৎপত্তি। এই ছড়া দিয়ে সারা বছরই প্রাকৃতিকভাবে কম–বেশি পানি প্রবাহিত হয়। গত কয়েক বছর ধরে ছড়াটিতে কোনো ধরনের বাঁধ ছিল না। ফলে প্রাকৃতিকভাবে প্রবাহিত এই পানি ব্যবহার করে শত শত কৃষক নির্বিঘ্নে চাষাবাদ করে আসছিলেন। তবে সম্প্রতি একটি কুচক্রি মহল রাতের আঁধারে টিলা কেটে গোলাইম্যা ঘোনা এলাকায় ছড়ায় বাঁধ নির্মাণ করেছে। এতে বাঁধের উজানে মুষ্টিমেয় কিছু কৃষক উপকৃত হলেও ভাটির দিকে পানির প্রবাহ কমে দিয়ে শত শত কৃষক মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বেন। এই বাঁধ শুধু কৃষিকে নয়, অভয়ারণ্যের প্রাকৃতিক পরিবেশ, বন ও বন্যপ্রাণীর উপরও ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ ব্যাহত হলে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল, খাদ্য ও প্রজনন চক্রও বিঘ্নিত হবে।
গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা যায়, পাগলী ছড়ায় বাঁধ দেওয়ার ফলে উজানে পানি জমে থাকলেও ভাটির দিকে পানির অভাবে ছড়াটি প্রায় শুকিয়ে গেছে। ছড়ার পাশে টিলা কেটে এই বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। যার মাটি কাটার ক্ষত এখনো স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। বাঁধের উজানে পানি আটকে যাওয়ায় পাহাড়ের একাধিক স্থানে ভাঙন শুরু হয়েছে। যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের পরিবেশগত ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে। বনাঞ্চলের প্রাকৃতিক ছড়ায় পানি প্রবাহে কোনো ধরনের বাঁধা সৃষ্টি করার নিয়ম না থাকলেও একটি কুচিক্র মহল ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে প্রকাশ্যে এই অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে একদিকে যেমন শত শত কৃষক পানির সংকটে পড়বেন, অন্যদিকে বন, ছড়া ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে আশংকা করছেন স্থানীয়রা। সংরক্ষিত বনাঞ্চলের প্রাকৃতিক ছড়ার পানি কোনো ব্যক্তির মালিকানাধীন হতে পারে না। অবৈধ বাঁধ নির্মাণ করে সেই পানিকেই অর্থের বিনিময়ে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন আইন লঙ্ঘন হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশ ও কৃষির উপর তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ মেয়াদি বিপর্যয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কৃষক জানান, ছড়ায় বাঁধ দেওয়ার ফলে উজানে প্রায় শতাধিক কানি জমিতে চাষাবাদের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এই পানির সুবিধা নিতে হলে বাঁধ নির্মাণকারীদের কানি প্রতি ১২শ থেকে ১৩শ টাকা করে দিতে হচ্ছে। টাকা না দিলে পানি নিতে দেওয়া হয় না। আগে ছড়ায় কোনো বাঁধ ছিল না। ছড়ার প্রাকৃতিক প্রবাহ থেকে পানি নিয়ে চাষাবাদ করেছি, কাউকে অর্থও দিতে হয়নি। তিনি প্রায় ৩ কানি জমিতে চাষাবাদ করবেন। প্রাকৃতিক ছড়ার পানি এখন কার্যত একটি প্রভাবশালী চক্রের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।
বাঁধের ভাটির দিকে ক্ষতিগ্রস্ত একাধিক কৃষক জানান, আগে পাগলী ছড়ার স্বাভাবিক প্রবাহে তাদের জমিতে নিয়মিত পানি পৌঁছাত। কিন্তু বাঁধ দেওয়ার পর থেকে ছড়াটি প্রায় শুকিয়ে গেছে। ফলে পানির অভাবে ক্ষেত নষ্ট হচ্ছে এবং চাষাবাদ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। উজানে কৃত্রিমভাবে পানি আটকে রেখে একদিকে পানির বাণিজ্য করা হচ্ছে। অন্যদিকে ভাটির শত শত কৃষকের ন্যায্য পানির অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। ছড়ার পানি কখনো কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল না। অথচ একটি মহল আধিপত্য বিস্তারের উদ্দেশ্যে বেআইনিভাবে ছড়ায় এই বাঁধ নির্মাণ করেছে। দ্রুত বাঁধ অপসারণ করা না হলে চাষাবাদ বন্ধ করা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।
চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য বিটের বিট কর্মকর্তা চঞ্চল কুমার তরফদার জানান, প্রাকৃতিক ছড়া বাঁধ দেয়ার কোনো নিয়ম নেই। খবর পেয়ে শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) সকালে বাঁধের কিছু অংশ কেটে দেয়া হয়েছে। কিন্তু সার্বিক নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় বাঁধের পুরো অংশ কেটে দেয়া সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে অভিযান চালিয়ে ছড়ার বাঁধ সম্পূর্ণভাবে অপসারণ করা হবে।
লোহাগাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কাজী শফিউল ইসলাম জানান, পাগলী ছড়ায় বাঁধ দিয়ে চাষাবাদ করার জন্য এক ব্যক্তি লিখিত আবেদন করেছিলেন। পরবর্তীতে সরেজমিনে দেখা যায়, ছড়ায় বাঁধ দিলে যত জন কৃষক উপকৃত হবেন, তার চেয়ে ৪ গুণের বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাই কাউকে বাঁধ নির্মাণের কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। বাঁধের ভাটির দিকে বহু কৃষক উচ্চ ফলনশীল ফসলের চাষ করেছেন। প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে পানির অভাবে এসব ক্ষেত নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যা কৃষি উৎপাদনের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হবে।












