মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে শায়িত হলেন দেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ এর গায়িকা মাহবুবা রহমান। গতকাল শুক্রবার বিকেলে তার দাফন সম্পন্ন হয় বলে গ্লিটজকে জানিয়েছেন মেয়ে সংগীতশিল্পী রুমানা ইসলাম। বার্ধক্যজনিত কারণে ঢাকার ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মারা যান একুশে পদকপ্রাপ্ত এ কণ্ঠশিল্পী। খবর বিডিনিউজের।
শুক্রবার দুপুরে মগবাজারের ওয়্যারলেস জামে মসজিদে তাঁর জানাজা হয়। ‘ফিডব্যাক’ ব্যান্ডের ফোয়াদ নাসেরও অংশ নেন জানাজায়। এই প্রবীণ সংগীতশিল্পীর মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে শোক প্রকাশ না করায় দুঃখ ও হতাশা প্রকাশ করেছে ফোয়াদ নাসের।
গ্লিটজকে তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় সম্মানপ্রাপ্ত শিল্পীদের মৃত্যুতে সাধারণত সরকারের পক্ষ থেকে শোক জানানো হয় এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকেও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া আসে। কিন্তু মাহবুবা রহমানের ক্ষেত্রে তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। উনি আমাদের সংগীত জগতের বায়োজ্যেষ্ঠ শিল্পী। তার বয়সের কোনো সংগীত শিল্পী আমার মনে হয় না এখন জীবিত আছেন। তার ব্যাপারে আমাদেরও প্রত্যাশা ছিল মৃত্যুর খবরটা সর্বজন জানতে পারবে, রাষ্ট্রীয়ভাবে জানানো হবে, যাতে দেশবাসী জানতে পারে। উনি তো চলে গেছেন, এখন তাকে আর কিছু দেওয়ার নেই সম্মান ও দোয়া ছাড়া। এতটুকু কেন হল না আমার জানা নেই। মাহবুবা রহমানের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন চলচ্চিত্র অভিনেত্রী শবনম, সুরকার ও সংগীত পরিচালক শেখ সাদী খান, পরিচালক মতিন রহমানসহ অনেকে।
১৯৩৫ সালে চট্টগ্রামে জন্ম নেওয়া মাহবুবা সংগীতজগতে পা রাখেন অল্প বয়সেই। মাত্র ১২ বছর বয়সে ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’র ঢাকা কেন্দ্র থেকে তার গান প্রথম প্রচারিত হয়। তখন তিনি নিভা রানী রায় নামে বেতারে গান করতেন। ১৯৪৮ সালে ঢাকার কামরুননেসা গার্লস স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করার পর আর পড়াশোনা করেননি। এরপর কেবলই সংগীতে তার পথচলা। পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে মাহবুবা বিয়ে করেন চলচ্চিত্র নির্মাতা খান আতাউর রহমানকে।
পঞ্চাশ ও সত্তরের দশকে রেডিও ও চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পীদের মধ্যে মাহবুবা রহমান ছিলেন অন্যতম। পল্লীগীতি ও আধুনিক গানে তার বিশেষ দক্ষতা ছিল। দেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’–এ সমর দাসের সুরে তিনি গেয়েছিলেন ‘মনের বনে দোলা লাগে’, যা তাকে এনে দেয় ব্যাপক পরিচিতি। তার গাওয়া গানের মধ্যে আরও রয়েছে খান আতাউর রহমানের সুরে জহির রায়হানের ‘কখনো আসেনি’ সিনেমার ‘নিরালা রাতের প্রথম প্রহরে’, ‘তোমাকে ভালোবেসে অবশেষে কী পেলাম’। ‘আসিয়া’ সিনেমায় গেয়েছিলেন ‘আমার গলার হার খুলে নে ওগো ললিতে/আমার হার পরে আর কি লাভ হবে সখি…’ এবং ‘সাত ভাই চম্পা’ সিনেমার ‘আগুন জ্বালাইস না আমার গায়’।
এছাড়া তিনি ‘জাগো হুয়া সাভেরা’, ‘এ দেশ তোমার আমার’, ‘যে নদী মরুপথে’, ‘কখনো আসেনি’, ‘সূর্যস্নান’, ‘সোনার কাজল’, ‘রাজা সন্ত্রাসী’, ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’সহ বহু চলচ্চিত্রে নেপথ্য কণ্ঠ দিয়েছেন। রেকর্ডের যুগে মাহাবুবা গেয়েছিলেন শতাধিক গান। মমতাজ আলী খানের সঙ্গে তার গাওয়া্ত‘যাইয়ো না যাইয়ো না বন্ধুরে’ এবং ‘ও বৈদেশী নাগর’ গান দুটি এক সময় ছিল মানুষের মুখে মুখে। সংগীতে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৯৮ সালে একুশে পদক পান মাহবুবা।












