নগরীর কোর্ট হিলের অদূরে মেথরপট্টিতে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফকে হত্যার মামলায় সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় দাশসহ ৩৯ আসামির বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছে আদালত। গতকাল সোমবার সকালে চট্টগ্রামের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. জাহিদুল হক চার্জ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর এ আদেশ দেন। এ সময় চিন্ময়সহ ২৩ জন আসামি কাঠগড়ায় হাজির ছিলেন। বাকিরা ঘটনার পর থেকে পলাতক।
আলোচিত এ হত্যা মামলার চার্জ গঠনের শুনানিকে কেন্দ্র করে গতকাল আদালতপাড়ায় কড়া নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়। ভোর থেকে আইন–শৃঙ্খলা বাহিনী আদালতের মূল ফটক থেকে শুরু করে আদালত ভবন পর্যন্ত নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলে। বসানো হয় তল্লাশি চৌকি। বাড়তি নিরাপত্তার কারণে লালদিঘি থেকে কোতোয়ালীর মোড় পর্যন্ত সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ। গতকাল সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে চিন্ময়সহ ২৩ আসামিকে বহনকারী প্রিজন ভ্যান কারাগার থেকে আদালত চত্বরে পৌঁছায়। এরপর তাদেরকে আদালতে নিয়ে গিয়ে কাঠগড়ায় ওঠানো হয়। প্রিজন ভ্যান থেকে নামিয়ে আদালতে নিয়ে যাওয়ার সময় চিন্ময়ের মাথায় ছিল হেলমেট। এছাড়া ছাতা দিয়ে তাকে ঢেকে নেওয়া হয়।
শুনানিতে চিন্ময়সহ কয়েকজন আসামি নিজেদের নির্দোষ বলে দাবি করেন। চিন্ময়ের আইনজীবী অপূর্ব কুমার ভট্টাচার্য তাকে নির্দোষ দাবি করে মামলা থেকে অব্যাহতি চেয়ে আবেদন করেন। এ সময় রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয়। এক পর্যায়ে উভয় পক্ষের শুনানি শেষে বিচারক ৩৯ আসামির বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করেন। এর আগে বিচারক আসামিদের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ পড়ে শোনান।
ট্রাইব্যুনালের পিপি এস ইউ এম নুরুল ইসলাম দৈনিক আজাদীকে বলেন, চিন্ময় দাশের বিরুদ্ধে ৩০২/১০৯ ধারায় এবং অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে ১৪৭/১৪৮/১৪৯/৩০২/৩৪ ধারায় চার্জ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছেন বিচারক। আগামী ২ ফেব্রুয়ারি থেকে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হবে।
আদালতের কার্যক্রম শেষে আদালত চত্বরে আইনজীবী আলিফের বাবা জামাল উদ্দিন বলেন, আসামিদের বিচার শুরু হওয়ায় আমি আনন্দিত। আমি চাই সাক্ষীরা যাতে নিরাপদে সাক্ষ্য দিতে আসতে পারে। পাশাপাশি দ্রুত যাতে বিচার কার্যক্রম শেষ হয় তারও প্রত্যাশা রইল। মরার আগে ছেলে হত্যার বিচার দেখে যেতে চাই। নগরীর নিউ মার্কেট মোড়ে জাতীয় পতাকা অবমাননার অভিযোগে ২০২৪ সালের ৩১ অক্টোবর চিন্ময় দাশের বিরুদ্ধে কোতোয়ালী থানায় একটি রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দায়ের হয়। উক্ত মামলায় একই বছরের ২৫ নভেম্বর ঢাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন ২৬ নভেম্বর তাকে চট্টগ্রামের আদালতে হাজির করা হয়। তার পক্ষের আইনজীবীরা তার জামিন চেয়ে সেদিন একটি আবেদন করেন। শুনানি শেষে চট্টগ্রামের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কাজী শরীফুল ইসলাম জামিন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এ নিয়ে আদালত পাড়াসহ সংশ্লিষ্ট এলাকায় ব্যাপক সংঘাত হয় এবং আইনজীবী আলিফকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে খুন করা হয়।
ওইদিনের সংঘাত ও খুনের ঘটনায় সাতটি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে কোতোয়ালী থানায় ৬টি ও আদালতে একটি মামলা দায়ের হয়। কোতোয়ালী থানায় দায়ের হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে পুলিশ বাদী হয়ে ৭৯ জনের নামে তিনটি, আলিফের বাবা জামাল উদ্দিন বাদী হয়ে ৩১ জনের নামে একটি (হত্যা মামলা) ও তার ভাই বাদী হয়ে ১১৬ জনের নামে একটি ও মোহাম্মদ উল্লাহ নামে এক ব্যবসায়ী ২৯ জনের নামে একটি মামলা দায়ের করেন। এছাড়া মো. এনামুল হক নামে একজন বাদী হয়ে ১৬৪ জনের নামে আদালতে আরো একটি মামলা দায়ের করেন।
আদালত সূত্র জানায়, আলিফের বাবার করা হত্যা মামলায় গত বছরের ১ জুলাই চিন্ময়সহ ৩৮ জনের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের প্রসিকিউশন শাখায় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও নগর পুলিশের তৎকালীন সহকারী কমিশনার (কোতোয়ালী জোন) মো. মাহফুজুর রহমান চার্জশিট দাখিল করেন। পরে বাদীপক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে সুকান্ত নামের একজনকে অন্তর্ভুক্ত করলে চার্জশিটভুক্ত আসামির সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৯ জন। এদের মধ্যে চিন্ময় দাশসহ ২৩ জন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। বাকি ১৬ জন পলাতক।












