‘চিন্তার গতির’ চেয়েও দ্রুত এআই-নির্ভর বোমাবর্ষণ যুগের সূচনা

| বুধবার , ৪ মার্চ, ২০২৬ at ১০:৪৬ পূর্বাহ্ণ

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর যুদ্ধ পরিকল্পনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের গতি ও পরিসর নতুন এক যুগের সূচনা করেছে, যেখানে বোমাবর্ষণ হতে পারে ‘চিন্তার গতির’ চেয়েও দ্রুত। এতে মানব সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।

খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক অ্যানথ্রপিকের এআই মডেল ‘ক্লড’ ব্যবহার করা হয়েছে। এই প্রযুক্তি তথাকথিত ‘কিল চেইন’ বা লক্ষ্য শনাক্তকরণ থেকে আইনি অনুমোদন ও হামলা চালানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আগেও গাজায় লক্ষ্য নির্ধারণে এআই ব্যবহার করেছিল। এবারে ইরানের ওপর প্রথম ১২ ঘণ্টাতেই প্রায় ৯০০টি হামলা চালায়। এসব হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। খবর বাংলানিউজের।

এআই নিয়ে গবেষণাকারী একাডেমিকদের মতে, জটিল হামলার পরিকল্পনার সময় দ্রুত সংকুচিত হয়ে আসছে, যাকে বলা হচ্ছে ‘ডিসিশন কমপ্রেশন’। এতে আশঙ্কা রয়েছে, মানব সামরিক ও আইনি বিশেষজ্ঞরা কেবল স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি পরিকল্পনায় আনুষ্ঠানিক সিলমোহর দেওয়ার ভূমিকায় সীমিত হয়ে পড়তে পারেন।

২০২৪ সালে অ্যানথ্রপিক তাদের মডেল যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরসহ বিভিন্ন জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থায় ব্যবহার শুরু করে। ‘ক্লড’ যুক্ত হয় যুদ্ধপ্রযুক্তি কোম্পানি প্যালান্টির টেকনোলজি ও পেন্টাগনের যৌথভাবে তৈরি একটি সিস্টেমে, যার লক্ষ্য ছিল গোয়েন্দা বিশ্লেষণ উন্নত করা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা। নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক ভূগোলের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ক্রেইগ জোনস বলেন, এআই মেশিন লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে সুপারিশ দিচ্ছে, যা অনেক ক্ষেত্রে মানুষের চিন্তার গতির চেয়েও দ্রুত। এতে একদিকে গতি, অন্যদিকে ব্যাপকতাদুটোই রয়েছে। অতীতে যেসব কাজ করতে দিন বা সপ্তাহ লাগত, এখন সব একসঙ্গে করা সম্ভব।

আধুনিক এআই সিস্টেম ড্রোন ফুটেজ, টেলিযোগাযোগের তথ্য, মানব গোয়েন্দা তথ্যসহ বিপুল ডেটা দ্রুত বিশ্লেষণ করতে পারে। প্যালান্টিরের সিস্টেম মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে লক্ষ্য শনাক্ত ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে, উপযুক্ত অস্ত্রের সুপারিশ দেয় এবং এমনকি হামলার আইনি ভিত্তিও যাচাই করে।

লন্ডনের কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডেভিড লেসলি বলেন, এটি সামরিক কৌশল ও প্রযুক্তির নতুন যুগ। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এআইনির্ভরতায় ‘কগনিটিভ অবলোডিং’ ঘটতে পারে, অর্থাৎ মানুষ সিদ্ধান্ত নিলেও চিন্তার ভার যেহেতু যন্ত্র বহন করছে, ফলে ফলাফলের দায়বদ্ধতা থেকে মানসিক দূরত্ব তৈরি হতে পারে।

ইরান নিজস্ব সামরিক ব্যবস্থায় কী ধরনের এআই ব্যবহার করছে, তা স্পষ্ট নয়। তবে ২০২৫ সালে তারা দাবি করেছিল যে ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্য নির্ধারণে এআই ব্যবহার করছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের এআই কর্মসূচি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের তুলনায় অনেক সীমিত।

ইরান হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন ঘোষণা দিয়েছিল, পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র বা মার্কিন নাগরিকদের নজরদারিতে এআই ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ায় অ্যানথ্রপিককে তাদের সিস্টেম থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে। তবে তা পুরোপুরি বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত ব্যবহারে থাকছে। অন্যদিকে অ্যানথ্রপিকের প্রতিদ্বন্দ্বী ওপেনএআই পেন্টাগনের সঙ্গে সামরিক প্রয়োজনে নিজেদের মডেল ব্যবহারের চুক্তি করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই যুদ্ধক্ষেত্রে অভূতপূর্ব গতি ও সক্ষমতা এনে দিলেও, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নৈতিকতা, দায়বদ্ধতা ও মানবিক বিবেচনার গুরুতর প্রশ্ন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচকরিয়ায় চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ, কর্মচারী গুরুতর আহত
পরবর্তী নিবন্ধএরাবিয়ান স্পেশাল কুজিন প্যাকেজের পাশাপাশি রয়েছে দেশীয় ইফতারি