চিঠিতে যা বলা হয়েছে

আজাদী প্রতিবেদন | বুধবার , ১৭ আগস্ট, ২০২২ at ৫:১২ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রামের ফুসফুসখ্যাত সিআরবিতে বেসরকারি হাসপাতাল নির্মাণের বিরোধিতা করে চট্টগ্রামের মন্ত্রী ও এমপিদের পক্ষ থেকে রেলমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজনকে গতকাল চিঠি দেয়া হয়েছে। চিঠিতে তারা সিআরবির পরিবর্তে এক কিলোমিটার দূরে আমবাগান বা পাহাড়তলীতে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়ার জন্য আহ্বান জানান। দৈনিক আজাদীর পাঠকদের জন্য চিঠিটি হুবহু প্রকাশ করা হলো :
‘মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়, আস্‌সালামু আলাইকুম।
আন্তরিক শুভেচ্ছা নিবেন। চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ঐতিহাসিক সিআরবি এলাকায় পিপিপির আওতায় হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পটি রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি কর্তৃক সীতাকুণ্ডের কুমিরায় স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয়ায় আপনাকে এবং রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সকলকে অভিনন্দন জানাচ্ছি।
সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এমপি, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এমপি, ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী এমপি, ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এমপি, হুইপ সামশুল হক চৌধুরী এমপি, মাহফুজুর রহমান মিতা এমপি, মোস্তাফিজুর রহমান এমপি, মোছলেম উদ্দীন আহমদ এমপি ও খদিজাতুল আনোয়ার সনি এমপি স্বাক্ষরিত চিঠিতে মন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়, আপনি জানেন প্রাচ্যের রাণী হিসেবে খ্যাত সাগর, পাহাড়, নদী বেষ্টিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার লীলাভূমি আমাদের চট্টগ্রাম। নান্দনিক সৌন্দর্যে ঘেরা এ নগরীর রূপ মাধুর্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে চট্টগ্রামের ফুসফুস খ্যাত কেন্দ্রীয় রেলভবন তথা সিআরবি। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত সিআরবি ভবনটি শুধু চট্টগ্রামেই নয়, পুরো দেশের মধ্যে স্থাপত্য শিল্পের এক অনন্য নিদর্শন। এখানে রয়েছে অসংখ্য রেইনট্রি। যেগুলোর মধ্যে কোন কোনটির বয়স পেরিয়ে গেছে শত বছরেরও বেশি। এটি ব্যস্ততম নগরী চট্টগ্রামের অঙিজেন সরবরাহের উৎস হিসেবেও পরিচিত।
উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক এক গবেষণায় সিআরবিতে প্রায় ২২৫টি দুর্লভ প্রজাতির উদ্ভিদের সন্ধান পাওয়া গেছে। শতবর্ষী বৃক্ষরাজি, পাহাড়, টিলা ও উপত্যকায় ঘেরা বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যমণ্ডিত স্থান হিসেবে সিআরবি চট্টগ্রামের মানুষের মনে আলাদা স্থান করে নিয়েছে। এখানে বৃক্ষরাজির শীতল ছায়াতলে বিশেষ করে অনিন্দ্য সুন্দর শিরীষতলায় আয়োজিত হয় বাংলা নববর্ষ, বসন্ত উৎসব, রবীন্দ্র ও নজরুল জন্মজয়ন্তীসহ বাঙালির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অন্যান্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসমূহ।
১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে বীর শহীদ হিসেবে আত্মোৎসর্গ করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক আবদুর রব। আবদুর রবসহ মোট এগারজনের সমাধি রয়েছে এ সিআরবিতে। অপূর্ব নিসর্গ, শহীদদের সমাধিস্থল, মুক্ত বায়ুতে নিরিবিলি পরিবেশে সকাল-বিকাল পরিবার-পরিজন নিয়ে হাঁটাচলার এবং শারীরিক কসরতের অন্যতম নিরাপদ স্থান হিসেবে চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের মাঝে সিআরবি এখন অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ। সভ্যতার অগ্রগতি ও মানুষের লোভের আঘাতে প্রকৃতি আজ তার রূপ ও ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রণীত ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ)-এ এটিকে কালচারাল হেরিটেজ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ৮টি নির্দেশনার উল্লেখ রয়েছে। ২০০৯-এর ২৫ জানুয়ারি এটি গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। উল্লেখযোগ্য নির্দেশনাগুলোর মধ্যে রয়েছে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে সিআরবির কোন অংশ ব্যবহার করা যাবে না এবং এখানে কোন বহুতল ভবন নির্মাণ করা যাবে না। শুধুমাত্র পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পাখির অভয়ারণ্য, যাদুঘর, প্রজাপতি উদ্যান প্রতিষ্ঠা করা যাবে। সবকিছু মিলিয়ে সিআরবি এখন চট্টগ্রামের সকল মানুষের আবেগ ও ভালবাসার জায়গায় পরিণত হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, এখানে হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগটি সংশ্লিষ্ট গেজেটের সম্পূর্ণ লঙ্ঘন। বিষয়টিতে চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষ ভীষণভাবে কষ্ট পেয়েছেন। বর্তমানে হাসপাতাল স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয়ায় চট্টগ্রামবাসী আশান্বিত হয়েছেন, স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছেন।
চট্টগ্রাম শহরে এক সময়ে অনেক পাহাড়, দীঘি, পুকুর ছিল। ছিল শাল, রেইনট্রি ইত্যাদি বৃক্ষ আচ্ছাদিত রাস্তা বা মহাবর্ত। ছিল বাটালী হিল, কাচারি পাহাড়। পাকিস্তান আমলে বাটালী হিল ধ্বংস করা হয়েছে। কাচারি পাহাড়ের উপরও আঘাত হেনেছিল তৎকালীন পাকিস্তান সরকার। এ কাচারি পাহাড়ের বিশাল অংশ কেটে তৈরি করা হয় নিউ মার্কেট, জেনারেল পোস্ট অফিস ও স্টেট ব্যাংক। এভাবেই চট্টগ্রামের নিসর্গ, সৌন্দর্য নষ্ট হয়েছে কালক্রমে। এখন অবশিষ্ট রয়েছে শুধুমাত্র সিআরবি।
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম এখানে হাসপাতাল নির্মাণ না করা ও পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ে মতামত প্রদান করেছে। প্রদত্ত মতামতে তারা উল্লেখ করেছে ‘মহান মুক্তিযুদ্ধসহ বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট অনেক ঘটনার সাথে সিআরবি এলাকাটি জড়িয়ে রয়েছে। মহানগরীর সাংস্কৃতিক চর্চার প্রাণকেন্দ্র এটি। পরিবেশগত দিক ছাড়াও ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক দিক বিবেচনায় সিআরবি এলাকাটি প্রস্তাবিত হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ ও নার্সিং ইনস্টিটিউটের জন্য উপযুক্ত নয় মর্মে প্রতীয়মান।
এছাড়া এলাকাটিতে এসব প্রতিষ্ঠান নির্মিত হলে এসব প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে আরও বাণিজ্যিক স্থাপনা তৈরি হবে, যা সংশ্লিষ্ট এলাকাটির পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থাপনার জন্য অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হবে বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে (প্রতিবেদনের কপি সংযুক্ত)’।
ইতোমধ্যে চট্টগ্রামের নাগরিক সমাজের ব্যানারে হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্প অন্যত্র স্থানান্তরের দাবিতে বিভিন্ন সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠানের পাশাপাশি গত ২৬ আগস্ট ২০২১ খ্রি. তারিখে তাঁরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবরে একটি আবেদন প্রেরণ করেন (কপি সংযুক্ত)। এছাড়াও গত ০৬/০৮/২০২১ খ্রি. তারিখে তারা আপনার বরাবরেও একটি আবেদন করেছেন (কপি সংযুক্ত)। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় বেশ কিছু নিবন্ধ ও মতামতও প্রকাশিত হয়েছে (সংযুক্ত)।
এমতাবস্থায় পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিবেদন এবং চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে চট্টগ্রামের ফুসফুস কালচারাল হেরিটেজ সিআরবিতে ইউনাইটেড হাসপাতাল কর্তৃক হাসপাতাল নির্মাণের বিষয়টি স্থগিত করে অন্যত্র রেলওয়ের জায়গায় নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়টি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য চট্টগ্রামের সকল জনসাধারণের পক্ষ হতে আমরা আপনাকে অনুরোধ জানাচ্ছি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধরাউজানে বিয়ের ছয় মাসের মাথায় প্রবাসীর স্ত্রীর আত্মহত্যা
পরবর্তী নিবন্ধহাসপাতাল হবে অন্য জায়গায়, রেলমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন