যাত্রীদের নিরাপত্তায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। তবে চালকদের নিরাপত্তায় এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পরিবহন শ্রমিক নেতারা। সিএমপির সাবেক কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীরের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম নগরে চলাচলরত সিএনজি টেক্সি যাত্রীদের নিরাপত্তায় ‘আমার গাড়ি নিরাপদ’ নামের কার্যক্রম শুরু হয়। যার সুফল পাচ্ছে যাত্রীরা।
এই কার্যক্রমের আওতায় নগরে চলাচলরত সব সিএনজি টেক্সি মালিক ও চালকদের নির্দিষ্ট আবেদনপত্র পূরণ করে ভেরিফাই করা হয়েছে। ভেরিফায়েড কিউআর কোড স্মার্টফোনের অ্যাপস দিয়ে স্ক্যান করে সিএনজি টেক্সি মালিক ও চালকদের যাবতীয় তথ্য জানতে পারছে যাত্রীরা।
বিষয়টিকে সাধুবাদ জানিয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক অলি আহম্মদ আজাদীকে বলেন, যাত্রীদের নিরাপত্তায় ব্যবস্থা আছে, কিন্তু চালকদের নিরাপত্তা দেবে কে? তিনি বলেন, একের পর এক চালক খুন হচ্ছে, আপোষে না দিলে চালককে খুন করে গাড়ি বিশেষ করে সিএনজি টেক্সি, ইজি বাইক ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
পরে কয়েক দিন পর চালকের লাশ গলিত বা অর্ধগলিত অবস্থায় ‘অজ্ঞাত’ হিসেবে উদ্ধার করছে পুলিশ। এভাবে আর কতদিন? চালকদের নিরাপত্তায় ‘অ্যাপস’ টাইপের কিছু করা যায় কিনা তা ভেবে দেখার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
যাত্রীবেশে উঠে সিএনজি টেক্সি, ইজি বাইক এমনকি রিকশাও ছিনতাই করে তারা। চালককে প্রথমে ভয় দেখায়, কাজ না হলে আঘাত করে, তাতে কখনো চালকের মৃত্যু হয়, কখনো গুরুতর আহত হয় কাতরাতে কাতরাতে আজীবন মৃত্যু যন্ত্রণা ভোগ করতে থাকে। নগরী কিংবা উপজেলা সর্বত্রই এ ধরনের চক্র ছড়িয়ে পড়েছে। সিএনজি টেক্সি ও ইজিবাইকের প্রতিটি যন্ত্রাংশ আলাদাভাবে খুব সহজেই বিক্রি করা যায় বলেই এসব যানবাহন ছিনতাইয়ে আগ্রহ বেশি ছিনতাইকারীদের।
ছিনতাইয়ের পর গাড়িটি বিক্রি করে দেয় নির্দিষ্ট ক্রেতার কাছে। অবশ্য কখনো গাড়ির মালিক যোগাযোগ করলে নির্দিষ্ট টাকার বিনিময়ে গাড়ি ফেরতও দেওয়া হয়। এ অবস্থায় সড়কে পর্যাপ্ত সংখ্যক সিসি ক্যামেরা স্থাপন ও আইনশৃক্সখলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।
পিবিআইয়ের এক রিপোর্ট থেকে জানা যায়, গত এক বছরে সারা দেশে ছিনতাইকারীদের হাতে শুধু ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক চালক খুন হয়েছেন তিন শতাধিক। যাদের অধিকাংশ ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। খুনের শিকার অনেকেই আবার ঋণ নিয়ে কিনেছিলেন ব্যাটারি রিকশা ও ইজিবাইক। ফলে পরিবারগুলোকে স্বজন হারানোর শোকের সঙ্গে বয়ে বেড়াতে হয়েছে ঋণের বোঝাও। মূলত অর্থনৈতিক কারণে ঘটছে এসব হত্যাকাণ্ড।
চালকের বেশে থাকা ছিনতাইকারীদের ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে বলে জানান, নগর পুলিশের উপকমিশনার (সদর) মো. আবদুল ওয়ারীশ। তিনি বলেন, সম্প্রতি জামিনে বেরিয়ে আসা কিছু ছিনতাইকারী অভিনব কৌশলে ছিনতাই করছে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, নতুন করে সিএনজি টেক্সি চালকদের তথ্যভান্ডার তৈরি করবে পুলিশ। পাশাপাশি গাড়ি চালক নির্ধারণে সতর্ক থাকার জন্য মালিকদের জানাবেন বলেও জানান তিনি।
গত ২৫ ডিসেম্বর কক্সবাজারের রামুতে যাত্রীবেশী তিন ছিনতাইকারী চালককে মারধর করে সিএনজি টেক্সি ছিনিয়ে নেয়। ছিনতাইয়ে জড়িত রোহিঙ্গা যুবককে হাতেনাতে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেছে গ্রামবাসী। ২৫ ডিসেম্বর রাত সাড়ে নয়টায় রামু উপজেলার দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নের পানেরছড়া ঢালায় কক্সবাজার–টেকনাফ সড়কে এ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে।
ছিনতাই হওয়া গাড়িটির চালক বেলাল উদ্দিন জানান, কক্সবাজার সদর হাসপাতাল মোড় থেকে ৩ জন যুবক উখিয়ার কুতুপালং যাওয়ার কথা বলে গাড়িটি ভাড়া করেন। পথিমধ্যে রামুর দক্ষিণ মিঠাছড়ি পানেরছড়া ঢালায় পৌঁছলে তারা জোরপূর্বক গাড়িটি থামিয়ে তাকে মারধর শুরু করে। এ সময় তারা তাকে জবাই করার জন্য উদ্যত হলে বিপরীতমুখি একটি টেক্সি ঘটনাস্থলে পৌঁছে। গাড়িটির আলো দেখে ছিনতাইকারি চক্রের ২ জন তার গাড়িটি নিয়ে সটকে পড়ে এবং একজন ধরা পড়ে।
৬ ডিসেম্বর বোয়ালখালীতে সিএনজি চালক হেলাল উদ্দিনকে নৃশংসভাবে হত্যার রহস্য উদঘাটন এবং হত্যার সাথে সরাসরি জড়িত তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করে র্যাব–৭। নিহত হেলাল উদ্দিন সিএনজি টেক্সি চালানোর সুবাদে ইলিয়াস নামে এক ব্যক্তির সাথে পরিচয় হয়। ইলিয়াস পেশায় একজন সিএনজি গ্যারেজের মিস্ত্রি।
সিএনজি টেক্সি বিক্রির বখশিসের টাকা কম হওয়ায় ইলিয়াস তার পরিচিত এক সিএনজি ড্রাইভার মো. বখতিয়ার ও মনির আহম্মদ মেহেরাজের মাধ্যমে হেলালকে খুন করে গত ২৯ নভেম্বর। এসময় তারা হেলালের সিএনজি টেক্সিটিও নিয়ে যায়।
১৩ নভেম্বর ব্যাটারিচালিত রিকশা ছিনতাইয়ের জন্য ‘শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী’ চালককে খুন করে। ওই ঘটনা নিয়ে ছায়া তদন্তে নেমে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) খুন হওয়া চালকের পরিচয় এবং খুনের সঙ্গে জড়িত দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করেছে, যারা পেশায় পরিবহন শ্রমিক। ব্যাটারিচালিত রিকশা ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিটিকে তারা নৃশংসভাবে খুন করে।
৪ সেপ্টেম্বর সীতাকুণ্ডে ছুরিকাঘাত করে একরাম হোসেন (২০) নামে এক সিএনজি টেক্সি চালককে হত্যা করে। তার সিএনজি টেক্সিটি পাশেই পড়ে ছিল। সিএনজি টেক্সিটি ছিনতাই করতে না পেরে চালককে ছুরিকাঘাত করে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যেতে পারে বলে স্থানীয়রা জানান। ৩ আগস্ট চেতনানাশক খাইয়ে সিএনজি টেক্সি ছিনতাই চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশ বলছে, গ্রেপ্তার দুজন বহুদিন ধরে সিএনজি চালকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করে। পরে সুযোগ বুঝে চেতনানাশক খাইয়ে সিএনজি ছিনতাই করে সটকে পড়ে।
কোতোয়ালী থানার ওসি জাহিদুল কবির বলেন, এই চক্রের সদস্যরা প্রথমে টার্গেট ঠিক করে। তারপর যাত্রীবেশে সিএনজি টেক্সিতে উঠে সুবিধামতো জায়গায় গিয়ে ছিনতাই করে। এই চক্রে সদস্যরা অজ্ঞান করার জন্য চেতনানাশক দ্রব্য ছাড়াও নেশাজাতীয় দ্রব্য ও স্প্রে ব্যবহারে সিদ্ধহস্ত। ২৭ জুন নগরীর বহদ্দারহাট এলাকা থেকে চোরাই গাড়ি ছিনতাই চক্রের ‘রাসেল সিন্ডিকেট’ প্রধান রাসেলসহ ২ জন ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব–৭, চট্টগ্রামের অভিযানিক দল। এ সময় একটি চোরাই সিএনজি জব্দ করা হয়েছে।
গত ২৮ এপ্রিল বোয়ালখালীতে জাবেদ হোসেন (৩০) নামে এক টেক্সি চালককে হত্যা করা হয়েছে। ১১ ফেব্রুয়ারি, পটিয়ায় এক সিএনজি টেক্সি চালককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে সিএনজি টেক্সি ছিনতাই করে। খুন হওয়া সিএনজি চালকের নাম নুরুল আলম (৩৪)। ৯ ফেব্রুয়ারি নগরীতে সিএনজি টেক্সি ছিনতাই চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
বায়েজিদ বোস্তামী থানার আনন্দবাজার থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের দাবি, রোগী সেজে সিএনজি টেক্সিতে উঠে নির্জনস্থানে গিয়ে চালকের কাছ থেকে টেক্সিটি ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায় চক্রটি। তাদের কৌশল হলো ছিনতাইয়ের জন্য গভীর রাতে রাস্তায় অবস্থান নেয় তারা। একজন রোগী সেজে দাঁড়ান, অন্যজন স্বজন হিসেবে পাশে থাকেন।
খালি সিএনজি টেক্সি এলে রোগী সেজে থাকা ছিনতাইকারী মাথা ঘুরে রাস্তায় পড়ে যাওয়ার ভান করে। সিএনজি টেক্সি থামিয়ে উঠে পড়েন। চালককে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন। একপর্যায়ে নির্জন স্থানে গিয়ে পৌঁছালে গাড়ি থামিয়ে চালককে মারধর করে নামিয়ে দিয়ে তারা সিএনজি নিয়ে পালিয়ে যায়।












