দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন খাতে নৈরাজ্য ও বৈষম্য ঠেকিয়ে লাইটারেজ জাহাজ চলাচলে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে একটি সমন্বিত অ্যাকশন প্ল্যান তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে চট্টগ্রাম বন্দর ভবনের সম্মেলন কক্ষে উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কোঅর্ডিনেশন সেল (বিডব্লিউটিসিসি) থেকে ছাড়পত্র ছাড়া কোনো লাইটারেজ জাহাজকে পণ্য না দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে সিরিয়াল প্রথার বাইরে চলাচলকারী চার শতাধিক লাইটারেজ জাহাজকে দ্রুত সিরিয়াল ব্যবস্থার আওতায় আসার নির্দেশ দেওয়া হয়। অন্যথায় সংশ্লিষ্ট জাহাজের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে জাহাজ মালিকদের দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা পাওনা টাকা দ্রুত পরিশোধের ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর শফিউল বারীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা, বন্দর কর্তৃপক্ষ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং লাইটারেজ জাহাজ মালিকদের সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে লাইটারেজ জাহাজ ব্যবস্থাপনাকে আরও গতিশীল, স্বচ্ছ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ করার বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের আমদানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা কয়লা, সিমেন্ট ক্লিংকার, গম, ডাল, সার, লবণ, পাথর, স্ল্যাগ, স্টিল, এইচআর কয়েল, সয়াবিন ভূষি, কোপ্রা, উডপাল্পসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্যবাহী বড় জাহাজ প্রতিদিন বন্দরের বহির্নোঙরে অবস্থান করে। ড্রাফটজনিত সীমাবদ্ধতার কারণে এসব মাদার ভ্যাসেলের অধিকাংশ সরাসরি জেটিতে ভিড়তে পারে না। ফলে বহির্নোঙরেই গ্র্যাব ও ক্রেনের মাধ্যমে পণ্য খালাস করে লাইটারেজ জাহাজে তোলা হয়। পরে অভ্যন্তরীণ নৌপথে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে এসব পণ্য পরিবহন করা হয়।
চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিপুল পরিমাণ আমদানি পণ্য পরিবহনের এই বিশাল কর্মযজ্ঞে প্রায় ১ হাজার ৮০০ লাইটারেজ জাহাজ নিয়োজিত রয়েছে। একটি মাদার ভ্যাসেল থেকে একযোগে দুই–তিনটি লাইটারেজ জাহাজে পণ্য খালাসের ব্যবস্থা থাকে। পরে কর্ণফুলী নদীর ১৬টি ঘাটসহ দেশের ৩০টিরও বেশি গন্তব্যে এসব পণ্য পৌঁছে দেওয়া হয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ এই পরিবহন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ, বৈষম্য ও অনিয়মের কথা বলে আসছেন সাধারণ জাহাজ মালিক ও আমদানিকারকেরা। তাদের অভিযোগ, লাইটারেজ জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে বিডব্লিউটিসিসির চালু করা সিরিয়াল ব্যবস্থা সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হচ্ছে না। কয়েকশ’ জাহাজ সিরিয়াল অনুসরণ না করেই ইচ্ছেমতো পণ্য পরিবহন করছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বর্তমানে ৪০০টিরও বেশি লাইটারেজ জাহাজ সিরিয়াল প্রথার বাইরে থেকে পণ্য পরিবহন করছে। অন্যদিকে সিরিয়াল মেনে চলা অনেক জাহাজ দীর্ঘ সময় পণ্য পাওয়ার অপেক্ষায় অলস বসে থাকছে। ফলে একই খাতে দুই ধরনের ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে।
জাহাজ মালিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সিরিয়াল মেনে জাহাজ নিতে গিয়ে সাধারণ আমদানিকারকদের প্রতি টন পণ্য পরিবহনে ৬০০ টাকারও বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে। বিপরীতে সিরিয়ালবিহীন জাহাজ ব্যবহার করে একই পণ্য প্রায় ৪০০ টাকা টন ভাড়ায় পরিবহন করা সম্ভব হচ্ছে। আবার বড় শিল্পগ্রুপ ও বড় আমদানিকারকদের অনেকে নিজেদের মালিকানাধীন জাহাজ ব্যবহার করে আরও কম খরচে পণ্য পরিবহন করছেন। এতে তীব্র অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
সিরিয়ালের বাইরে জাহাজ চলাচল বৃদ্ধি পাওয়ায় লাইটারেজ জাহাজ ব্যবস্থাপনায় বিডব্লিউটিসিসির কার্যকর নিয়ন্ত্রণও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতিদিনের বার্থিং মিটিং আয়োজন এবং আমদানিকারকদের চাহিদা অনুযায়ী জাহাজ সরবরাহের ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে গতকাল সকালে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অংশীজনদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করে লাইটারেজ জাহাজ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বিডব্লিউটিসিসির যথাযথ ছাড়পত্র ছাড়া কোনো লাইটারেজ জাহাজকে মাদার ভ্যাসেল থেকে পণ্য না দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা। এ বিষয়ে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে সিরিয়ালের বাইরে চলাচলকারী চার শতাধিক জাহাজকে দ্রুত সিরিয়াল প্রথা অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত ব্যবস্থার বাইরে থেকে পণ্য পরিবহন অব্যাহত রাখলে সংশ্লিষ্ট জাহাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে বৈঠকে সতর্ক করা হয়েছে। বৈঠকে জাহাজ মালিকদের আর্থিক সংকটের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়। দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা জাহাজ মালিকদের পাওনা টাকা দ্রুত পরিশোধের ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার ও মেরিন), হারবার মাস্টার, বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের প্রতিনিধি, নৌ পুলিশের প্রতিনিধি, নৌবাণিজ্য অধিদপ্তরের প্রিন্সিপ্যাল অফিসার, জাহাজ মালিকদের তিনটি সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।










