প্রতিবছরের মত এবারও কক্সবাজারের চকরিয়ায় তামাকের আগ্রাসন চলছে। কাকারা ইউনিয়নের অনেক জায়গায় তাকালে দেখা যায় দিগন্তজোড়া তামাক পাতার আবাদ। তবে ব্যতিক্রম মো. কাইছার আলম (৪৩)। এই প্রান্তিক কৃষক জীবনবিনাশী তামাকের আবাদ ছেড়ে নিজের জায়গাতে সুস্বাদু ফল স্ট্রবেরি আবাদের মাধ্যমে বাজিমাত করেছেন। উপজেলার কাকারা ইউনিয়নের মেনিবাজার এলাকায় মাতামুহুরী নদীর তীর সংলগ্ন জমিতে চারিদিকে তামাকের মাঝে এই স্ট্রবেরির আবাদ করা হয়েছে। সরজমিন দেখা গেছে, তামাক চাষে অভ্যস্ত চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ মাঠে এবার দেখা যাচ্ছে ভিন্ন দৃশ্য। সবুজ পাতার ফাঁকে টকটকে লাল ফল স্ট্রবেরির সমারোহ। এই স্ট্রবেরির বাগান পরিচর্যায় ব্যস্ত কৃষক মো. কাইছার আলম। তামাকের ভয়াবহ আগ্রাসনের মাঝখানে স্ট্রবেরির চাষ করে অন্য কৃষকদের দেখিয়ে দিচ্ছেন অর্থ উপার্জনে বিকল্প কৃষির সম্ভাবনা, দেখাচ্ছেন লাভের নতুন হিসাবও।
স্থানীয়রা জানালেন, বাড়ির কাছে মাতামুহুরী নদীর তীরে ২৫ শতক জমিতে গড়ে তোলা তার স্ট্রবেরি ক্ষেত এখন পুরো এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। যেখানে প্রতিবছর জমির সিংহভাগই তামাকের আবাদে ভরে যায় সেখানে আধুনিক পদ্ধতিতে ফ্যাস্টিভ্যাল জাতের স্ট্রবেরি চাষ সত্যিই ব্যতিক্রম।
স্ট্রবেরি চাষি কাইছার আলম জানালেন, চলতি মৌসুমে রাজশাহীর একটি নার্সারি থেকে উন্নত জাতের ৩ হাজার ফ্যাস্টিভ্যাল স্ট্রবেরির চারা সংগ্রহ করেন তিনি। ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর রোপণ করা সেই চারা অল্প সময়ের মধ্যেই সাদা ফুলে ছেয়ে যায়। আর চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি থেকে শুরু হয় ফল সংগ্রহ। তিনি বলেন, মাঠ প্রস্তুত, চারা ক্রয়, সার, গোবর ও পরিচর্যাসহ মোট খরচ হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা। কিন্তু খরচের টাকা ইতোমধ্যেই উঠে এসেছে। এখন পর্যন্ত তিনি সাড়ে ৪ লাখ টাকার স্ট্রবেরি বিক্রি করেছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আরও অন্তত ১ থেকে দেড় লাখ টাকার ফল বিক্রির আশা করছি।
কৃষক কাইছার জানান, বর্তমানে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ কেজি স্ট্রবেরি সংগ্রহ করা হচ্ছে বাগান থেকে। এসব ফল চকরিয়া ও কক্সবাজার শহরের সুপার শপ, ফলের দোকান ও পাইকারদের কাছে সরবরাহ করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, ২০০৭ সালে প্রথম স্ট্রবেরি চাষ শুরু করেন তিনি। কিন্তু সে সময় স্থানীয় বাজারে ফলটির পরিচিতি না থাকায় এবং ক্রেতা সংকটের কারণে দুই বছর পর চাষ বন্ধ করতে বাধ্য হন। দীর্ঘ বিরতির পর ২০২২ সালে আবার নতুনভাবে শুরু করেন। এবারের মৌসুমে নতুন জাতের ফ্যাস্টিভ্যাল স্ট্রবেরি এনে চাষে নামেন। তিনি বলেন, প্রথমে পাওয়ার টিলার দিয়ে মাটি ঝরঝরে করতে হয়। এরপর মালচিং পদ্ধতিতে চাষাবাদ করতে হয়, যাতে আগাছা কম হয় ও ফল পরিষ্কার থাকে। নিয়মিত সেচ ও পরিচর্যা করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে– মাতামুহুরী নদীর উজান থেকে বর্ষায় নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানির সাথে চরে পলি পড়ে জমিকে উর্বর করে তোলে। এই পলিমাটিই ভালো ফলনের অন্যতম কারণ।
উপজেলা কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, কাইছারের ক্ষেতে ফলন ভালো হওয়ায় অন্য কৃষকেরাও আগ্রহী হচ্ছেন। তামাকের বিকল্প হিসেবে স্ট্রবেরি লাভজনক ফসল হতে পারে। ইতোমধ্যে অনেক কৃষক তার ক্ষেত পরিদর্শন করেছেন এবং পরামর্শ নিচ্ছেন।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তামাক চাষে যেমন স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি রয়েছে, তেমনি বাজার নির্ভরতার কারণে লাভ–লোকসানও অনিশ্চিত। সেখানে স্ট্রবেরির মতো উচ্চমূল্যের ফল চাষ কৃষকের আয় বাড়াতে পারে। আমার চোখে এখন নতুন স্বপ্ন এই কথা জানিয়ে কৃষক কাইছার আলম বলেন, এবার যদি আবহাওয়া ভালো থাকে, তাহলে খরচ বাদ দিয়েও উল্লেখযোগ্য লাভ হবে। ভবিষ্যতে আরও বেশি জমিতে স্ট্রবেরি চাষ করতে চাই।
স্থানীয় পরিবেশসচেতন ব্যক্তি আতিকুল ইসলাম সোহাগ বলেন, তামাকের আবাদ পরবর্তী তামাক পোড়ানোর ধোঁয়ায় ও নিকোটিনের গন্ধে যেখানে আচ্ছন্ন পুরো এলাকা, সেখানে টকটকে ও সুমিষ্ট ফল স্ট্রবেরির চাষে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। বহুমুখী ক্ষতিকর তামাকের আবাদ ছেড়ে যাতে স্ট্রবেরিসহ নতুন নতুন ফলের চাষাবাদে নামে সেজন্য সরকারের কৃষি বিভাগ এগিয়ে আসতে পারে।












