‘এই ঈদ বিধাতার কি যে শুভ উদ্দেশ্য মহান,/ হয় সিদ্ধ, বুঝে না তা স্বার্থপর মানব সন্তান।/ এ ত নহে শুধু ভবে আনন্দ উৎসব ধুলা খেলা।/ এ শুধু জাতীয় পুণ্যমিলনের এক মহামেলা।’
সমাগত মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদ–উল ফিতর। আনন্দ ও খুশির পয়গাম নিয়ে এসেছে ঈদ। ঈদের আনন্দ কেবল নতুন জামা, খাওয়া–দাওয়া কিংবা উল্লাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং ঈদের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে ভেদাভেদ ভুলে ধনী–গরিব একত্রিত হওয়ার মধ্যে। তাই তো কবি কায়কোবাদ বলেছেন, ‘এ ত নহে শুধু … জাতীয় পুণ্যমিলনের এক মহামেলা।’
আজ বৃহস্পতিবার চাঁদ দেখা গেলে কাল শুক্রবার পালিত হবে পবিত্র ঈদুল ফিতর। অন্যথায় ঈদ আগামী পরশু শনিবার। তবে আজ হোক বা কাল। চাঁদ দেখার সুসংবাদে ঘরে ঘরে বেজে ওঠবে ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ, তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দিবি শোন আসমানি তাগিদ।’ তার আগে ছোট–বড় সকলে সন্ধ্যার আকাশে খুঁজে বেড়াবে চাঁদ। বাদ মাগরিব বায়তুল মোকাররমে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সভাকক্ষে বৈঠকে বসবে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি। কারণ এ চাঁদ মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয় আনন্দের বার্তা। এ আনন্দ ঈদের, পবিত্র ঈদুল ফিতরের।
জানা গেছে, ইসলাম ধর্মে ঈদের সূচনা হয়েছে দ্বিতীয় হিজরীতে। হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদিনায় আসেন, তখন দেখেন সেখানকার লোকেরা বছরে দুই দিন (নাইরোজ ও মিহরজান নামে দুটি দিনে) আনন্দ করে, খেলাধুলায় মগ্ন থাকে। এমন পরিস্থিতি দেখে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহতায়ালা তোমাদের এ দুই দিনের পরিবর্তে আরও বেশি উত্তম ও কল্যাণকর দুইটি দিন দিয়েছেন। এগুলো হল– ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতর।
শাওয়াল মাসের প্রথম তারিখকে বলা হয় ঈদুল ফিতরের দিন। ঈদ আরবি শব্দ, এর অর্থ বার বার ফিরে আসা। মুসলিম সমাজে প্রতি বছর দিনটি ফিরে আসে বলে এটাকে বলা হয় ঈদ। আবার ঈদ অর্থ খুশি ও আনন্দ। এদিকে ‘ফিতর’ শব্দের অর্থ ভেঙে দেওয়া। দীর্ঘ এক মাস রোজা রাখার পর যে উৎসব পালন করা হয় সেটাই ঈদুল ফিতরের উৎসব। ত্রিশ দিনের সিয়াম সাধনার পর খুশি ও আনন্দের বার্তা নিয়ে হাজির হয় এ ঈদ–উল ফিতর। ছোট–বড়, ধনী–গরীব সকলে ভেদাভেদ ভুলে আনন্দ উৎসবে মেতে উঠে এদিন। সম্প্রীতির অনন্য মেলবন্ধন তৈরি হয় ঈদের মাধ্যমে।
এদিকে ইসলামের সূচনালঘ্ন থেকেই ঈদকে ঘিরে মুসলমানদের ঘরে ঘরে থাকে নানা আয়োজন। প্রথম রমজান থেকে ঘরে ঘরে শুরু হয় ঈদ উদযাপনের প্রস্তুতি। যা গতি পায় ১৫ রমজানের পর। ঈদের দিন প্রত্যেকে নিজেকে উপস্থাপন করেন ভিন্নভাবে। সবাই নতুন পোশাক পরার চেষ্টা করেন। তাই তো প্রথম রমজান থেকে শপিংমলগুলোতে ছিল ভিড়। এছাড়া ঘরে ঘরে তৈরি হয় ঈদের বিশেষ খাবার। সেমাই, জর্দা, কোর্মা পোলাও ইত্যাদি। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিসহ নানা নাগরিক সমস্যা, দুঃখ–দুর্বিপাকের মধ্যেও এবারও সবাই চেষ্টা করবেন ইসলামী ঐতিহ্য আঁকড়ে ধরতে।
ঈদের আনন্দ কয়েকগুণ বেড়ে যায় প্রিয়জনের সাথে ভাগাভাগি করার মধ্য দিয়ে। স্বজনদের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে না পারলে সে আনন্দে পূর্ণতা আসে না। তাই ঈদের আনন্দ উদযাপনে সবাই ছুটছেন বাড়ি। আজও সরকারি অফিস খোলা। অনেকে অফিস শেষে, কেউ বা একটু আগেভাগে অফিস থেকে বের হয়ে ছুটবেন নিজ নিজ এলাকায়। এছাড়া ট্রেন–বাস কিংবা লঞ্চ স্টেশনে গত কয়েকদিন ধরে ছিল ঘরমুখো মানুষের অস্বাভাবিক ভিড়। প্রতিবছর ঈদকে ঘিরে প্রায় কয়েক লক্ষ মানুষ শহর ছেড়ে চলে যায়। এবারও ব্যতিক্রম হবে না।
ঈদ জামাত : চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধানে ঈদের প্রথম ও প্রধান জামাত সকাল ৮টা এবং দ্বিতীয় জামাত সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে জমিয়তুল ফালাহ জাতীয় মসজিদে অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম ও প্রধান জামাতে ইমামতি করবেন জমিয়তুল ফালাহ জাতীয় মসজিদের খতিব আল্লামা সৈয়দ আবু তালেব মোহাম্মদ আলাউদ্দীন আল কাদেরী, দ্বিতীয় জামাতে ইমামতি করবেন সিনিয়র পেশ ইমাম হাফেজ মাওলানা মোহাম্মদ আহমদুল হক আল কাদেরী।
এছাড়া সকাল ৮টায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধানে লালদীঘি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন শাহী জামে মসজিদ, হযরত শেখ ফরিদ (র.) চশমা ঈদগাহ মসজিদ, সুগন্ধা আবাসিক এলাকা জামে মসজিদ, চকবাজার সিটি কর্পোরেশন জামে মসজিদ, জহুর হকার্স মার্কেট জামে মসজিদ, দক্ষিণ খুলশী (ভিআইপি) আবাসিক এলাকা জামে মসজিদ, আরেফীন নগর কেন্দ্রীয় কবরস্থান জামে মসজিদ, সাগরিকা গরু বাজার জামে মসজিদ এবং মা আয়েশা সিদ্দিকী চসিক জামে মসজিদে (সাগরিকা জহুর আহমদ চৌধুরী স্টেডিয়াম সংলগ্ন) ঈদ জামাত আয়োজন করা হবে।
এদিকে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় সকাল সাড়ে ৮টায় জেলা স্টেডিয়ামের জিমনেসিয়াম মাঠে ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হবে। এতে ইমামতি করবেন বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদ্রাসার সাবেক প্রিন্সিপাল মাওলানা অধ্যক্ষ ড. সাইয়েদ মুহাম্মদ আবু নোমান।












