চাকরিপ্রার্থী নয়, উদ্যোক্তা তৈরি করুন : প্রধান উপদেষ্টা

| বুধবার , ১৪ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৬:৪৯ পূর্বাহ্ণ

উচ্চশিক্ষার প্রচলিত কাঠামোকে চাকরিনির্ভর ও সৃজনশীলতাবিরোধী আখ্যা দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন ও সৃজনশীল; অথচ বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থা তরুণদের চাকরিপ্রার্থী বা আদেশ মানা দাসে পরিণত করছে। গত মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে উচ্চশিক্ষা বিষয়ক দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টা বক্তব্য রাখছিলেন।

বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত সমালোচনা করে অধ্যাক ইউনূস বলেন, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মূল দর্শনই ভুল। আমরা মনে করি, শিক্ষার্থী কোর্স শেষ করলে চাকরির উপযুক্ত হবে। চাকরি না পেলে দোষ দিই শিক্ষার্থীকে। কিন্তু কেন আমরা চাকরির জন্য মানুষ তৈরি করছি, এই প্রশ্ন আমরা করি না। তিনি বলেন, চাকরি দাসত্বের ঐতিহ্য থেকে এসেছে। আপনি আদেশ নেন, কাজটি পছন্দ না হলেও করেন, এটাই দাসত্ব। অথচ মানুষ জন্মায় সৃজনশীল সত্তা হিসেবে। তাই চাকরিপ্রার্থী নয়, উদ্যোক্তা তৈরির ওপর জোর দেন মুহাম্মদ ইউনূস। তরুণদের বলুন, তুমি চাকরিপ্রার্থী নও, তুমি চাকরি সৃষ্টিকারী। কল্পনাই মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি, বলেন তিনি। খবর বিডিনিউজের।

তিন দিনব্যাপী ‘উচ্চশিক্ষার বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা ২০২৬’ শীর্ষক এই দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সম্মেলনের আয়োজক বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। সম্মেলনে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের শিক্ষাবিদ, গবেষক ও নীতিনির্ধারকেরা অংশ নিচ্ছেন। বক্তব্যের শুরুতেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, এই সমাবেশে নিজেকে একজন অংশগ্রহণকারী নয়, বরং বহিরাগত মনে হওয়ায় তিনি হতাশ ও বঞ্চিত বোধ করছেন। আমি সব সময় নিজেকে এই কমিউনিটির অংশ মনে করি। এখানেই আমার জীবন কেটেছে, কাজ ও চিন্তা গড়ে উঠেছে। অথচ আজ আমি সেই আলোচনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি, বলেন তিনি।

সম্মেলন আয়োজনের জন্য বিশ্বব্যাংককে ধন্যবাদ জানিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, এটি আয়োজন করা ছিল এই অঞ্চলের নিজেদের দায়িত্ব। আমরা ব্যর্থ হয়েছি বলেই বিশ্বব্যাংককে এগিয়ে আসতে হয়েছে। সার্কের অংশ হিসেবে এই ধরনের আয়োজন করা আমাদের দায়িত্ব ছিল। আজ সার্ক শব্দটাই বিস্মৃত, এটা আমাদের জন্য লজ্জার। তিনি বলেন, সার্কের মূল দর্শন ছিল একসঙ্গে বসা, অভিজ্ঞতা বিনিময় করা ও একে অপরের কাছ থেকে শেখা। সরকারে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আমি বারবার বলে আসছি, আমাদের অবশ্যই সার্কে ফিরে যেতে হবে। ওটাই আমাদের পরিবার, বলেন মুহাম্মদ ইউনূস।

সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, গত কয়েক মাসে ঢাকায় যা ঘটেছে, তা না বুঝলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ও শিক্ষকের ভূমিকা নিয়ে কোনো অর্থবহ আলোচনা সম্ভব নয়। আমি এখানে আছি, কারণ ঢাকায় কিছু ঘটেছে। না হলে আমাদের এখানে থাকার কোনো কারণ ছিল না, বলেন তিনি।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, তরুণরা কোনো হঠাৎ আবেগে রাস্তায় নামেনি। তারা জানত বন্দুকের সামনে দাঁড়ালে জীবন দিতে হবে, তবু তারা দাঁড়িয়েছে। এক স্কুলশিক্ষার্থীর মাকে লেখা চিঠির উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, এটি সেই আন্দোলনের গভীরতা ও সচেতনতার প্রতীক। মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তরুণরা নিজেরাই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে। তারা জুলাই সনদ প্রণয়ন করেছে এবং সংবিধান পরিবর্তনের দাবিতে গণভোটের কথা বলছে। আমরা এসব ক্লাসরুমে পড়াইনি। তারা কোনো কোর্স করেনি। তবু তারা এসব সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে, বলেন তিনি।

মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, তরুণরা নিজেদের রাজনৈতিক দল গঠন করেছে এবং ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে অংশ নেবে। যারা অন্যদিন আমাদের ক্লাসরুমে ছিল, আজ তারা রাস্তায়, রাজনীতিতে। আগামী দিনে তাদের কেউ কেউ শিক্ষামন্ত্রীও হতে পারে, আর আমাদেরই বলবে শিক্ষা কী হওয়া উচিত, বলেন তিনি।

ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন শহরের দেয়ালে আঁকা গ্রাফিতির উদাহরণ দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, কোনো পরিকল্পনা বা নির্দেশ ছাড়াই তরুণরা নিজেদের কল্পনা প্রকাশ করেছে। এটাই প্রকৃত শিক্ষা, যা রাস্তায় হয়েছে। কিন্তু আমরা তা শিখতে অস্বীকার করছি। তিনি সতর্ক করে বলেন, শিক্ষা ও তরুণদের মধ্যে এই বিচ্ছিন্নতা থাকলে সংকট বারবার ফিরে আসবে। পুরনো পদ্ধতিতে কাজ করা আত্মবিনাশী। আমাদের দ্রুত বদলাতে হবে, যেভাবে তরুণরা বদলেছে, বলেন তিনি।

মুহাম্মদ ইউনূস শিক্ষাবিদদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, তরুণ নেতাদের কথা শোনার সুযোগ তৈরি করতে হবে। শিক্ষা একদিকে, তরুণরা আরেকদিকে, এটা ভালো নয়। তিন দিনব্যাপী এই সম্মেলনে দক্ষিণ এশিয়ায় উচ্চশিক্ষার বর্তমান চ্যালেঞ্জ, শিক্ষার গুণগত মান, গবেষণা, শিক্ষকের ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে একাধিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে বলে আয়োজকেরা জানিয়েছেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঢাকায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব
পরবর্তী নিবন্ধহুজাইফার মাথার খুলি খুলে রাখা হয়েছে, পাঠানো হলো ঢাকায়