ছড়াসম্রাট খ্যাতি অর্জন করা একুশে পদকপ্রাপ্ত পাওয়া কবি, ছড়াকার ও লেখক সুকুমার বড়ুয়া আর নেই। গতকাল শুক্রবার সকাল ৬টা ৫৫ মিনিটে রাউজানের গহিরায় একটি বেসরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তিনি পরলোকগমন করেন। তিনি স্ত্রী (ননী বালা বড়ুয়া), এক ছেলে (অরূপ রতন বড়ুয়া) ও তিন মেয়ে (চন্দনা বড়ুয়া, রঞ্জনা বড়ুয়া, অঞ্জনা বড়ুয়া) সহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর। ৫ জানুয়ারি সুকুমার বড়ুয়ার জন্মদিন। দিনটিকে জাতীয় ছড়া দিবস হিসেবে উদযাপন করা হয়। ঐদিন গ্রামের বাড়িতে তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠিত হবে। আজ শনিবার সকাল ১১ টায় সুকুমার বড়ুয়ার মরদেহ সর্বস্তরের মানুষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য দৈনিক আজাদীর সামনে রাখা হবে।
সুকুমার বড়ুয়ার জন্ম ১৯৩৮ সালের ৫ জানুয়ারি রাউজানের বিনাজুরি গ্রামে। তাঁর বাবার নাম সর্বানন্দ বড়ুয়া এবং মা কিরণবালা বড়ুয়া। বর্ণজ্ঞান থেকে প্রথম শ্রেণি পর্যন্ত তিনি মামার বাড়ির স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। এরপর ডাবুয়া স্কুলে ভর্তি হন। কিন্তু সেই স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর তাঁর পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। অল্প বয়স থেকেই তিনি বিভিন্ন সময় মেসে কাজ করেছেন। জীবিকা নির্বাহের জন্য তিনি এক সময় তিনি ফেরি করে নানা পণ্য বিক্রি করতেন। মা বাবা মারা যাওয়ার পর ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬৪ টাকা বেতনে একটি চাকরি জোটে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্নপদস্থ কর্মচারী হয়েও লেখালেখির কারণে তিনি সবার নজরে চলে আসেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিভবনের ‘সহকারী স্টোর কিপার’ পদ থেকে তিনি অবসর গ্রহণ করেন।
সুকুমার বড়ুয়ার প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় ৩ জুলাই ১৯৫৮ সালে দৈনিক সংবাদের ‘খেলাঘর’ পাতায়। ‘অসময়ে মেহমান/ ঘরে ঢুকে বসে যান/ বোঝালাম ঝামেলার/ যতগুলো দিক আছে/ তিনি হেসে বললেন/ ঠিক আছে, ঠিক আছে/ মেঘ দেখে মেহমান/ চাইলেন ছাতাখান/ দেখালাম ছাতাটার/ শুধু কটা শিক আছে/ তবু তিনি বললেন/ ঠিক আছে, ঠিক আছে’–এরকম অনেক ছড়ার জনক সুকুমার বড়ুয়া।
তাঁকে চারণ ছড়াশিল্পী বলা যায় নিঃসন্দেহে। ছড়া শিশুতোষ রচনা হিসেবে পরিচিত। শিশুর মনোরঞ্জন, অবসরযাপন, জ্ঞান ও নীতিশিক্ষা ইত্যাদি কারণে ছড়ার চর্চা হয়ে থাকে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে লৌকিক ছড়া কেবল শিশুর জন্য রচিত হয়নি, শিশু–কিশোর, তরুণ–যুবক, বয়স্ক সকল শ্রেণির জন্য সুকুমার বড়ুয়া ছড়া লিখেছেন। তিনি অনেক আঞ্চলিক ছড়া রচনা করেছেন। ‘চম্পাবতীর জামাইয়ে/ পয়সা দু’য়া কামাইয়ে/ গরম গরম টেঁয়া ঢালি/ টেম্পু দুইয়ান নামাইয়ে’। এরকম অসংখ্য ছড়ার জন্মদাতা তিনি। সুকুমার বড়ুয়ার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে – পাগলা ঘোড়া, ভিজে বেড়াল, চন্দনা রঞ্জনার ছড়া, এলোপাতাড়ি, নানা রঙের দিন, সুকুমার বড়ুয়ার ১০১টি ছড়া, চিচিং ফাঁক, কিছু না কিছু, প্রিয় ছড়া শতক, বুদ্ধ চর্চা বিষয়ক ছড়া, ঠুস্ঠাস্, নদীর খেলা, আরো আছে, ছড়া সমগ্র, ঠিক আছে ঠিক আছে, কোয়াল খাইয়ে, ছোটদের হাট, লেজ আবিষ্কার অন্যতম। সুকুমার বড়ুয়া বহু পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন। এরমধ্যে রয়েছে – ২০১৭ সালে একুশে পদক, ১৯৭৭ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ শিশু একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৯৭ সালে অগ্রণী ব্যাংক শিশু সাহিত্য সম্মাননা, ২০০৬ সালে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব সম্মাননাসহ ঢালী মনোয়ার স্মৃতি পুরস্কার, বৌদ্ধ একাডেমী পুরস্কার, ঢাবি বৌদ্ধ ছাত্র সংসদ সম্মাননা, জনকণ্ঠ প্রতিভা সম্মাননা, আলাওল শিশু সাহিত্য পুরস্কার, চোখ সাহিত্য পুরস্কার, নন্দিনী শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব, আইরিন আফসানা ছড়া পদক, স্বরকল্পন কবি সম্মাননা পদক, শিরি অ্যাওয়ার্ড, শব্দপাঠ পদক, বৌদ্ধ সমিতি যুব সম্মাননা, অবসর সাহিত্য পুরস্কার, মোহাম্মদ মোদাব্বের হোসেন আরা স্মৃতি পুরস্কার, লেখিকা সংঘ সাহিত্য পদক, রকিবুল ইসলাম ছড়া পদক, লিমেরিক সোসাইটি পুরস্কার, রাউজান ক্লাব সম্মাননা, কবীর চৌধুরী শিশু সাহিত্য পুরস্কার, মযহারুল ইসলাম কবিতা পুরস্কার অন্যতম।












