প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অনন্য সঙ্গমস্থল চট্টগ্রামকে বলা হয় বাংলাদেশের হৃদস্পন্দন। বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে অবস্থিত এই প্রাচীন বন্দরনগরী শুধু একটি ভৌগোলিক ভূখণ্ড নয়, এটি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ও প্রাণের স্পন্দন। দেশের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এই শহরটির গুরুত্ব অপরিসীম হলেও, দীর্ঘকাল ধরে এটি রাষ্ট্রীয় অবহেলা ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছে। গত সতের বছরের স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে চট্টগ্রাম তার প্রাপ্য মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। সমপ্রতি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন চট্টগ্রামকে ‘বাণিজ্যিক রাজধানী‘ হিসেবে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়ার যে সাহসী ও যৌক্তিক দাবি তুলেছেন, তা কেবল চট্টগ্রামের মানুষের আঞ্চলিক আবেগ নয়, বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার এক অনিবার্য জাতীয় আকাঙ্ক্ষা।
চট্টগ্রামের গুরুত্ব অনুধাবন করতে হলে এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও কৌশলগত অবস্থানের দিকে তাকাতে হবে। প্রাচীনকাল থেকেই এই শহরটি বিশ্ব বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত ছিল। পর্তুগিজ নাবিকরা একে ‘পর্তো গ্রান্দে‘ বা মহান বন্দর হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট আমদানি–রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই নিয়ন্ত্রিত হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। দেশের সিংহভাগ রাজস্ব আসে এই শহরের মাটি থেকেই। অথচ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, যে শহরটি পুরো দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখছে, সেই শহরের নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা এখনো অতি–কেন্দ্রীভূতভাবে রাজধানী ঢাকা–কেন্দ্রিক রয়ে গেছে। একজন সাধারণ ব্যবসায়ীকে সামান্য প্রশাসনিক ছাড়পত্র, এলসি সংক্রান্ত জটিলতা কিংবা ব্যাংকিং নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের জন্য বারবার ঢাকা ছুটতে হয়। এই কেন্দ্রিকতা কেবল সময় ও অর্থের অপচয় করে না, বরং চট্টগ্রামের স্বাভাবিক বাণিজ্যিক গতিশীলতাকে রুদ্ধ করে দেয়।
বিগত দেড় দশকে চট্টগ্রামের উন্নয়নের নামে যা হয়েছে, তাকে উন্নয়নের চেয়ে লুটপাটের মহোৎসব বলাই শ্রেয়। নির্বাচনের নামে প্রহসন করে জনগণের ম্যান্ডেটবিহীন প্রতিনিধিদের মেয়রের চেয়ারে বসানো হয়েছিল। এসব ‘দলীয় তস্কর‘ নগরবাসীকে সেবা দেওয়ার চেয়ে নিজেদের আখের গোছাতেই বেশি ব্যস্ত ছিলেন। উন্নয়নের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও সমন্বয়হীনতার কারণে নগরবাসী এর সুফল পায়নি। বরং মেগা প্রজেক্টের আড়ালে অর্থ পাচার ও দুর্নীতির পাহাড় গড়া হয়েছে। মেয়রের পদমর্যাদাকে প্রতিমন্ত্রীর স্তরে নামিয়ে রাখা ছিল এই শহরকে রাজনৈতিকভাবে অবমূল্যায়ন করার একটি প্রচেষ্টা। চট্টগ্রামের মেয়র হওয়া উচিত অন্তত পূর্ণ মন্ত্রীর সমতুল্য, যাতে তিনি সরাসরি সরকারের নীতিনির্ধারণী ফোরামে চট্টগ্রামের দাবিগুলো জোরালোভাবে উপস্থাপন করতে পারেন। এছাড়াও, এক সময় চট্টগ্রামে অনেক ব্যাংক ও বিমা প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় ছিল, যা সুকৌশলে ঢাকায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এটি চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার একটি দীর্ঘমেয়াদী অপকৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়।
চট্টগ্রামকে সত্যিকার অর্থে বাণিজ্যিক রাজধানী করতে হলে রাষ্ট্রকে প্রথমে একে তার হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। মেয়র শাহাদাত হোসেন যথার্থই বলেছেন, যতক্ষণ রাষ্ট্র চট্টগ্রামকে ধারণ করবে না, ততক্ষণ চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক রাজধানী হবে না। এটি বাস্তবায়নে সর্বপ্রথম প্রয়োজন একটি ‘নগর সরকার‘ ব্যবস্থা। বর্তমানে চট্টগ্রামের সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। সিডিএ, ওয়াসা, বিদ্যুৎ বিভাগ, বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং সিটি করপোরেশন–সবাই নিজ নিজ পদ্ধতিতে কাজ করে, যার ফলে একটি প্রকল্পের কাজ শেষ হতে না হতেই অন্য সংস্থা রাস্তা খুঁড়ে ফেলে। এই বিশৃঙ্খলা বন্ধ করতে সব সংস্থাকে সিটি করপোরেশনের অধীনে এনে মেয়রের নেতৃত্বে পরিচালনা করতে হবে। এটিই হবে সুপরিকল্পিত নগরায়নের প্রথম ধাপ।
প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এই দাবির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাণিজ্যিক রাজধানীর পূর্ণ মর্যাদা দিতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিতীয় প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামে স্থাপন করতে হবে। এছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণী উইংগুলো স্থায়ীভাবে চট্টগ্রামে স্থানান্তর করা এখন সময়ের দাবি। এর পাশাপাশি অবকাঠামোগত আমূল পরিবর্তন আবশ্যক। চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরকে শুধু নামেই নয়, বরং বাস্তবেও একটি আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দরে রূপান্তর করতে হবে। পর্যাপ্ত কার্গো ভিলেজ স্থাপন এবং বিশ্বের প্রধান বাণিজ্যিক শহরগুলোর সাথে সরাসরি ফ্লাইট চালু করা এখন অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ককে কমপক্ষে ৮ লেনে উন্নীত করা এবং চট্টগ্রামে একটি আধুনিক রেল নেটওয়ার্ক ও সার্কুলার রোড নির্মাণ করা ছাড়া বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা অসম্ভব।
চট্টগ্রামের সম্ভাবনা শুধু বন্দরকেন্দ্রিক নয়, এর রয়েছে বিশাল পর্যটন ও নীল অর্থনীতির হাতছানি। পতেঙ্গা থেকে শুরু করে মিরসরাই পর্যন্ত বিস্তৃত সমুদ্র উপকূল এবং পার্বত্য জেলাগুলোর সাথে চট্টগ্রামের সংযোগকে কাজে লাগিয়ে এই অঞ্চলকে একটি বিশাল পর্যটন হাবে রূপান্তর করা সম্ভব। বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশি ও এর তলদেশের সম্পদকে ব্যবহার করে ‘ব্লু –ইকোনমি‘ বা নীল অর্থনীতির যে সম্ভাবনা রয়েছে, তাকে কাজে লাগাতে হলে চট্টগ্রামের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক বিশেষত্ব ও গবেষণাগার নিশ্চিত করতে হবে। সীতাকুণ্ড থেকে মিরসরাই পর্যন্ত যে শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠছে, তাকে পূর্ণ গতিশীল করতে হলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় কর্তব্য।
চট্টগ্রাম সমৃদ্ধ হলে সমগ্র বাংলাদেশ সমৃদ্ধ হবে, এই চিরন্তন সত্যটি নীতিনির্ধারকদের অনুধাবন করতে হবে। ঢাকাকে কেন্দ্র করে যে অতি–কেন্দ্রীভূত উন্নয়নের সংস্কৃতি গত কয়েক দশকে গড়ে উঠেছে, তা দেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ। একটি দেশের উন্নতি কেবল একটি শহরের ওপর নির্ভর করতে পারে না। বৈষম্যমুক্ত নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন এখন দেশের মানুষ দেখছে, তার সফল বাস্তবায়ন শুরু হতে পারে চট্টগ্রামকে তার হৃতগৌরব ফিরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে। চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী ঘোষণা করা মানে কেবল একটি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া নয়, বরং বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা চট্টগ্রামের মাটিতে ফিরিয়ে দেওয়া।
পরিশেষে বলা যায়, চট্টগ্রামের মানুষ আর প্রতিশ্রুতিতে ভুলতে চায় না। তারা চায় কর্মের প্রতিফলন। মেয়র শাহাদাত হোসেনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী সমাজ, ছাত্র–জনতা এবং সাধারণ মানুষকে এই দাবিতে ঐক্যবদ্ধ ও সোচ্চার হতে হবে। এটি কোনো দলীয় বা গোষ্ঠীগত দাবি নয়, এটি চট্টগ্রামের অস্তিত্বের লড়াই। চট্টগ্রামের নালা–নর্দমা থেকে শুরু করে এর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্র যদি আজ চট্টগ্রামের এই দাবি উপেক্ষা করে, তবে জাতীয় অর্থনীতির চাকা ভবিষ্যতে স্থবির হয়ে পড়ার ঝুঁকি থেকে যাবে। তাই আর কালক্ষেপণ না করে, চট্টগ্রামের হারানো মর্যাদা পুনরুদ্ধার এবং একে দক্ষিণ এশিয়ার একটি প্রধান বাণিজ্যিক ও শিল্প কেন্দ্রে রূপান্তর করতে রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে এখনই দৃঢ় ও সাহসী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। চট্টগ্রামের উন্নয়নই হবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তির প্রকৃত চাবিকাঠি।
লেখক : বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক।










