ক্যালেন্ডারের পাতায় তখনো শীতকাল। তবুও আমাদের দেশের প্রকৃতিতে ছিলো বসন্তের আনাগোনা। কোকিলের সুমধুর কুহু কুহু ডাক শোনা যাচ্ছিলো কয়েকদিন ধরে। ফুলে ফুলে সুশোভিত হয়েছিলো প্রকৃতি। আর এই প্রকৃতিকে আরো মনোরম আরো আকর্ষণীয়, সৌন্দর্যমন্ডিত করে সবার সামনে তুলে ধরেছে ‘চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন’।
“পুষ্প কাননে
জুড়িয়ে তব প্রাণ
ছড়াও সাম্যের গান”–এই স্লোগানকে সামনে রেখে জেলা প্রশাসন চট্টগ্রামের উদ্যোগে ফৌজদারহাট–বন্দর সংযোগ সড়কের পাশে সীতাকুন্ডের সলিমপুর এলাকার ডি.সি পার্কে ০৯ জানুয়ারি শুরু হয়েছিলো মাসব্যাপী ‘চট্টগ্রাম ফুল উৎসব ২০২৬’ । চতুর্থবারের মতো আয়োজিত এই মেলা শুরু হওয়ার পর তিন সপ্তাহ গত হয়ে গেলেও আমাদের যাওয়ার সুযোগটুকু হয়নি। আমি ভিড় এড়িয়ে চলা মানুষ। তাই বলা যায় ইচ্ছে করেই যাইনি। যেহেতু ফুলের মেলা স্বাভাবিকভাবেই ফুলপ্রেমীদের আনাগোনা বেশি হবেই। তাই বন্ধের দিনগুলোতে উপচেপড়া ভিড় হয় মেলা প্রাঙ্গণে। গত তিন বছর অনেক বেশি যানজট হয়েছে ওদিকটায়, এক্সিডেন্ট হয়েছিলো কয়েকবার। যেহেতু এটা বন্দর সংযোগ সড়ক তাই ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, লরি এ ধরনের বড় গাড়িগুলোর অবাধ বিচরণ ওই রাস্তায়। এবার তুলনামূলকভাবে যানজটের পরিমাণ কম বলেই শুনেছি। আমার মনে হয় যানজট কম হওয়ার বিশেষ কারণ হলো এবার কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে প্রশস্ত রাস্তা রাখা হয়েছে পার্ক এরিয়ার সামনে এবং গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য পর্যাপ্ত এরিয়া নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে মেলায় প্রবেশপথের উত্তর এবং দক্ষিণ পাশে।
২৭ জানুয়ারি সকাল দশটার পরপরই আম্মু আর আমি বের হলাম ডিসি পার্ক ফুলের মেলা দর্শনের উদ্দেশ্যে। সমুদ্রের বালুচরে গড়ে ওঠা এ পার্কে পৌঁছুতেই দু’পাশে ঘন ঝাউবন আর জলাশয় দেখে যে কারোরই ভালো লাগবে। আমরা একটু অসময়েই চলে গেলাম মেলায়। মানুষ সাধারণত বিকেল বেলায় মেলায় যায়। আর আমি বাচ্চাদেরকে স্কুলে পাঠিয়ে দিয়ে মেলায় পৌঁছেছি সকাল সাড়ে দশটার দিকে। তাই বললাম অসময়। ফুলে ফুলে ভরা সুপ্রশস্ত মেলা প্রাঙ্গণে পৌঁছেই আনন্দে অভিভূত হলাম। সূর্যকিরণ তখন অনেকটাই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। সূর্য কিরণ উত্তপ্ত হলেও মিষ্টি বাতাস এবং সকালের কোমলতা তখনও পর্যন্ত ভালোই ছিলো। মানুষের আনাগোনা ছিলো একেবারেই কম। যার কারণে আমরা অনেক বেশি ভালো ফিল করেছি। প্রশস্ত মেলাপ্রাঙ্গনে প্রবেশ করে চোখে পড়লো বিশাল জলাধার। পর্যটকদের জন্য সাজিয়ে রাখা হয়েছে অনেকগুলো স্পিডবোট। কাঁঠালচাপার মিষ্টি সুগন্ধ এসে লাগে নাকে। আমরা প্রথমে ডান দিক থেকে হাঁটা শুরু করেছি। কিছুদূর যেতেই দু’পাশে জলাধারের মাঝখানের রাস্তা অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুল দিয়ে সাজিয়ে গেটের মতো করে রাখা হয়েছে। আরো কিছুদূর উত্তরে গেলে আছে গ্রমীণ মেলার আয়োজন। সাজিয়ে রাখা হয়েছে অনেকগুলো ফটো তোলার স্পেস। পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে জলাধারের পাড়ে গেটের মতো সাজানো ফুলে ফুলে সুশোভিত রঙিন রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করছিলো। খেজুর গাছের সারি দেখে মনে হচ্ছিলো যেনো অন্য কোনো জগতে এসে পড়েছি। খেজুরের রসের হাঁড়িগুলো হয়তো কিছুক্ষণ আগে নামানো হয়েছে গাছ থেকে। তখনো টুপটাপ করে ফোঁটা ফোঁটা রস গড়িয়ে পড়েছে। পাখি এসে বসেছে, মৌমাছিরা উড়ছে। দূর থেকে ভেসে আসছে কোরআন তেলাওয়াতের মিষ্টি সুরেলা আওয়াজ। ছবি তুলতে তুলতে ভিডিও করতে করতে পৌঁছে গেলাম জেলা প্রশাসনের মঞ্চের দিকে। এখানে প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন স্কুলের অনুষ্ঠান থাকে। আমরা যখন পৌঁছেছি তখনও পর্যন্ত সেদিন কোন অনুষ্ঠান হচ্ছিলো না। আমরা দক্ষিণ দিকে ফিরলাম। আসল ফুলের মেলা তো এখানেই। ১৪০ রকমের ফুলের সমারোহ থাকলেও এখানে আছে লক্ষ লক্ষ ফুলের অপরূপ সৌন্দর্যেও আধার। বিশাল প্রশস্ত এই এলাকায় ফুলের বাগানের মাঝখানে হাঁটার সময় ফুলের মিষ্টি সুবাস বিমোহিত করবে সবাইকে। অন্যরকম একটা ভালো লাগায় আচ্ছন্ন থাকবে মন। অন্ততপক্ষে কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে যাওয়া যায় পৃথিবীর সমস্ত ঝামেলা থেকে। দুশ্চিন্তা মুক্ত থাকা যায় অনেকক্ষণ। এমন এক অপূর্ব জায়গায় ঘুরতে গিয়ে ফিরে আসতে মন চাইবে না। অনেকগুলো ফুলের নাম প্ল্যাকার্ড দিয়ে টাঙিয়ে রাখা হয়েছে। আমরা কিছুক্ষণ বিভিন্ন ফুলের নামগুলো দেখছিলাম। ছবি তুলছিলাম, ভিডিও করছিলাম। তরতাজা মিষ্টি সুঘ্রানের ফুলগুলোর মাঝখানে হাঁটতে হাঁটতে আম্মু স্মরণ করলেন অস্ট্রেলিয়ার টিউলিপ ফেস্টিভ্যালের কথা। আমার আম্মু অনেকবার ঘুরে এসেছেন অস্ট্রেলিয়া থেকে। তাঁর স্মৃতিতে দারুণ সব অভিজ্ঞতা। সিডনি, মেলবোর্ন, কুইন্সল্যান্ডসহ আরো অনেক অনেক নামকরা জায়গা ঘুরেছেন তিনি। অনেক কিছু শেয়ার করলেন। নিশ্চয়ই একদিন আমরাও ঘুরতে যাবো, এই আশা পোষণ করি মনে।
এদিকে ছবি তোলার জন্য হার্ট শেপ, ফ্লাওয়ার টি সেট তৈরি করে রাখা হয়েছে। আছে বাচ্চাদের জন্য নাগরদোলা এবং অর্ধকাটা তরমুজের ডিজাইন সমেত দোলনা, আছে খাবারের স্টল ইত্যাদি। রোদের তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করায় আমরা দ্রুত জলাশয়ের পাড় ধরে দক্ষিণ দিকে এগিয়ে গিয়ে আবার পূর্বদিকে ফিরে আরও কিছুক্ষণ নতুন এই রাস্তা ধরে হেঁটে চলে এলাম রাস্তার ধারে। নতুন এ রাস্তায় বিশাল আকারের প্ল্যাকার্ডে লেখা আছে ” Chattagram Flowerfest 2026″। অবশ্য মেলা প্রাঙ্গণের একেবারে উত্তর প্রান্তে এবং পশ্চিম প্রান্তেও বড় আকারের প্ল্যাকার্ড দিয়ে সাজানো আছে উৎসবের নাম। দিনের তাপমাত্রা বাড়লেও আমাদেরকে তা একটুও কাবু করতে পারেনি। দূর থেকে হালকা সুরে ভেসে আসা মিষ্টি মধুর সুরেলা সঙ্গীত এবং পাখিদের আওয়াজ আমাদেরকে আনন্দ দিচ্ছিলো। এদিকে তাজা ফুলের ছোট ছোট টব দিয়ে সাজিয়ে রাখা হয়েছে বিশাল আকারের ময়ূর পাখি, প্রজাপতি ইত্যাদি। জলাশয়ের মাঝখানে তৈরি করা হয়েছে খাবারের রেস্তোরাঁ। স্পিডবোটে ঘুরে বেড়াচ্ছে পর্যটক। পার্কের মাইকে বাজছে সুমিষ্ট গান। অন্যরকম একটা শান্তিপূর্ণ আনন্দের আবহ ছড়িয়ে ছিলো মেলায়। পুরো পার্ক জুড়ে রঙিন ফুলে সাজানো হয়েছে বিভিন্ন ফুলের ভাস্কর্য, থিম ও ল্যান্ডস্কেপ। পার্কের প্রতিটি কর্নার সাজানো হয়েছে বিভিন্ন রকমের দেশি–বিদেশি ফুল দিয়ে। হাঁটার পথের পাশে আছে ফুটে থাকা হাজারো ফুলের সমাহার। পসরা সাজিয়ে বসে আছে দোকানি। ফুটে থাকা ফুলের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমরা যেদিকে প্রবেশ করেছিলাম সেই গেটের কাছে এসে পৌঁছেছি। এরপর কোণ আইসক্রিম খেতে খেতে বেরিয়ে এলাম মেলা থেকে। এক কথায় অসাধারন কিছুটা সময় সুন্দরভাবে পার করে এলাম।
৯ জানুয়ারি শুরু হওয়া মাসব্যাপী এই ফুল উৎসবের আয়োজনে ছিলো দেশি–বিদেশি প্রায় ১৪০ প্রজাতির লক্ষাধিক ফুলের সমাহার। দর্শনার্থীদের জন্য নতুন আকর্ষণ হিসেবে যুক্ত হয়েছিল জিপ লাইন, ক্লাইম্বিং ট্রি, ট্রি হার্ট, বিগ ফ্লাওয়ার ট্রি, আমব্রেলা ট্রি, ফ্লাওয়ার টি সেট ইত্যাদি। উৎসবে মাসব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মাল্টিকালচারাল ফেস্টিভ্যাল, গ্রামীণমেলা, বই উৎসব, ঘুড়ি উৎসব, ফুলের সাজে একদিন, পিঠা উৎসব, লেজার লাইট শো, ভায়োলিন শো, মুভি শো, পুতুলনাচসহ নানারকমের আয়োজন। ফুলের সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি দর্শনার্থীরা বিকেল ৪ টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত উপভোগ করেন মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শনার্থীর জন্য খোলা ছিলো পার্ক। ফেব্রুয়ারির ৮ তারিখে মেলা শেষ হবার কথা থাকলেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে কয়েক দিন বাড়িয়ে মেলা শেষ হয়েছে ১৪ ফেব্রুয়ারি। প্রতিবছরের মতো বাংলাদেশে বসবাসরত ১৬ টি দেশের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা বিভিন্ন কারণে অনুষ্ঠিত হয়নি। তবে উৎসবে চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমি ও বিভিন্ন উপজেলার শিল্পকলা একাডেমির শিল্পীরা অংশ নেন। টানা ৩৫ দিন ধরে জলাধারের চারপাশে মৃদু হাওয়ায় লাল, সাদা, হলুদসহ হরেক রকমের ফুল দোল খেয়ে মুগ্ধ করেছে দর্শনার্থীদের।
ভবিষ্যতেও এমন ফ্লাওয়ার ফেস্টিভ্যালের অপেক্ষায় রইলাম আমরা আমরা চট্টগ্রামবাসী।












