চট্টগ্রামে স্কুলের নিজস্ব বাস সার্ভিস কবে

ঢাকায় চালু হচ্ছে, চসিককেও উদ্যোগ গ্রহণের দাবি ।। বাস্তবায়িত হলে কমবে যানজট, শব্দ ও বায়ুদূষণ

আজাদী প্রতিবেদন | রবিবার , ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২২ at ৫:২২ পূর্বাহ্ণ

নগরের লালখান বাজার এলাকার বাসিন্দা মাহমুদুল হক এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক। তার মেয়ে কাপাসগোলা সিটি কর্পোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী। ছেলে পড়েন জামালখানের সেন্ট মেরিস স্কুলে। সকাল সাতটায় ছেলেকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আগ্রাবাদে নিজের কর্মস্থলে যান তিনি। মেয়ের ক্লাস শুরু হয় ১২টা ২০ মিনিটে। আবার ছেলের স্কুল ছুটি হয় সাড়ে ১১টায়। মাহমুদুল হকের স্ত্রী সালমা ছেলেকে স্কুল থেকে নিতে আসেন। এসময় তার সাথে থাকে মেয়েও। ছেলেকে নিয়ে মেয়েকে তার স্কুলে পৌঁছে দেন তিনি। এরপর বাসায় ফিরেন মা-ছেলে। অবশ্য বিকেল ৫টায় আবার মেয়েকে নেয়ার জন্য সালমাকে যেতে হয় কাপসাগোলা স্কুলে।
মাহমুদুল হক দৈনিক আজাদীকে বলেন, বয়স কম হওয়ায় ছেলে-মেয়েকে একা স্কুলে যেতে দিই না। মেয়ে অবশ্য চাইলে একা আসা-যাওয়া করতে পারবে। কিন্তু নিরাপত্তাজনিত কারণে সাহস হয় না। তাই কষ্ট হলেও আমরা স্বামী-স্ত্রী স্কুল থেকে আনা-নেয়া করি দিই। আফসোস করে তিনি বলেন, যদি স্কুলের নিজস্ব বাস থাকত তাহলে আমাদের কষ্ট কমে যেত। নিরাপত্তা নিয়েও ভাবতে হত না। মাহমুদুল হকের বাইরে আরো অন্তত ২০ জন অভিভাবকের সঙ্গে কথা হয় দৈনিক আজাদীর। সবার কণ্ঠেই অভিন্ন সুর; স্কুলবাস চালু করা হোক। এক্ষেত্রে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) যেন এ উদ্যোগ নেন সে দাবি করেন তারা। অভিভাবকের বাইরে শিক্ষাবিদ এবং একাধিক নগর পরিকল্পনাবিদের সঙ্গেও কথা হয় আজাদীর। তারাও চসিককে স্কুলবাস চালুকরণে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। অন্তত নিজেদের পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর যেন চসিক স্কুলবাস চালু করে সে দাবি করেন তারা। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন পাইলট প্রকল্প হিসেবে স্কুলবাস চালু করতে যাচ্ছে জানিয়ে তারা প্রশ্ন করেন, ঢাকায় হলে চট্টগ্রামে নয় কেন?
প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় চট্টগ্রামের শিক্ষার্থীরা স্কুলবাস চালুসহ ৯ দফা দাবি তুলে ধরেন। এর প্রেক্ষিতে ২০২০ সালের ২৫ জানুয়ারি থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া ১০টি দ্বিতল বাসের কার্যক্রম চলছে নগরে। দুইটি রুটে দুই শিফটে বাসগুলো চলে। এক নম্বর রুটের বাসগুলো বহদ্দারহাট থেকে ছেড়ে বাদুরতলা, মুরাদপুর, চকবাজার, গণি বেকারি, জামালখান, চেরাগী পাহাড়, আন্দরকিল্লা, কোতোয়ালী হয়ে নিউমার্কেট যায়। দুই নম্বর রুটের বাসগুলো অক্সিজেন, মুরাদপুর, ২ নম্বর গেইট, জিইসি মোড়, ওয়াসা, টাইগারপাস হয়ে আগ্রাবাদ যায়। তবে এসব বাস নির্দিষ্ট কোনো স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য নয়। যে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এসব বাস ব্যবহার করতে পারে। তবে স্কুলে ব্যক্তিগত গাড়িতে করে আসা যাওয়া করা শিক্ষার্থীরা এসব বাসমুখী হননি। ফলে স্কুল ছুটির সময় এখনো প্রাইভেট গাড়ির লম্বা লাইন দেখা যায়। অবশ্য হাতেগোনা কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় শিক্ষার্থী আনা-নেয়া করা হয়।
স্কুলবাসের সুবিধা : স্কুলবাস চালু হলে একাধিক সুবিধার কথাও বলেন নগরপরিকল্পনাবিদগণ। তারা বলছেন, স্কুল বাস না থাকায় শহরের অনেকগুলো স্কুলে সন্তানদের প্রাইভেট গাড়িতে করে আনা-নেয়া করেন অভিভাবকগণ। একজন শিক্ষার্থীর জন্য একটি প্রাইভেট গাড়ি অপেক্ষা করতে দেখা যায় স্কুলের সামনে। এতে প্রতিদিন দীর্ঘ যানজট লেগে থাকে। স্কুল ছুটির সময় এ যানজট মারাত্মক আকার ধারণ করে। এসময় সবগুলো গাড়ির মাত্রাতিরিক্ত হর্ন বাজানোর কারণে হয় শব্দদূষণ। স্কুলবাস থাকলে কমবে প্রাইভেট গাড়ির সংখ্যা। কমবে যানজট, শব্দদূষণ ও কার্বন নিঃসরণ।
একইসঙ্গে প্রাইভেট গাড়ির সংখ্যা কমলে দেশের জ্বালানি সাশ্রয় হবে বলে মনে করেন নগরপরিকল্পনাবিদগণ। তাছাড়া অনেক পরিবারে বাবা-মা দুজনেই চাকরি করেন। সন্তানদের স্কুলে যাওয়া-আসা নিয়ে তাদের দুশ্চিন্তায় থাকতে হয় সবসময়। নিরাপদ স্কুলবাস কমাতে পারে সে দুশ্চিন্তাও।
চট্টগ্রামে নয় কেন : যানজট কমানোর লক্ষ্যে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন তাদের আওতাধীন এলাকার স্কুলগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক স্কুলবাস চালু করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে চারটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পাইলট প্রকল্প হিসেবে স্কুলবাস চালু করা হবে বলে গত বুধবার অনুষ্ঠিত স্কুলবাস সার্ভিস প্রবর্তন সংক্রান্ত প্রাথমিক কর্মকৌশল নির্ধারণ বিষয়ক সভায় জানান ঢাকা উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলাম। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে সকল স্কুলেই স্কুলবাস সার্ভিস চালু করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, স্কুলবাস সার্ভিস বাধ্যতামূলক করা হলে স্কুলের ১০০ গজের মধ্যে শিক্ষার্থীদের বহন করা ব্যক্তিগত গাড়ি প্রবেশ করতে দেয়া হবে না।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগটি জানাজানি হওয়ার পর চট্টগ্রামে স্কুলবাস চালু না হওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন আরো জোরালো হয়। চসিক মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী আন্তরিক হলে চট্টগ্রামেও স্কুল বাস চালু সম্ভব বলে মনে করছেন নগরবাসী।
চসিকের শিক্ষা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে প্রায় ৬৫ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। চসিকের আওতায় ৪৮টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৭টি উচ্চ-মাধ্যমিক কলেজ, ৮টি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ২টি কলেজে অনার্স কোর্স চালুসহ ৮টি ডিগ্রি কলেজ, ৭টি কিন্ডারগার্টেন, ২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি কম্পিউটার ইনস্টিটিউট ও ৩টি কম্পিউটার কলেজ (ক্যাম্পাস) রয়েছে। বিপুল সংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করার পরও চসিকের স্কুলগুলোর জন্য স্কুলবাস না থাকা নিয়ে প্রশ্ন করেন অনেকে।
শোয়াইব আহমেদ নামে একজন অভিভাবক বলেন, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন সরাসরি কোনো স্কুল পরিচালনা করে না। এরপরও তারা আওতাধীন এলাকায় যানজট নিরসনে স্কুলবাস চালু করতে যাচ্ছে। অথচ চসিকের তত্ত্বাবধানে স্কুল থাকার পরও স্কুলবাস না থাকা মেনে নেয়া যায় না।
নগরপরিকল্পনাবিদ ও শিক্ষাবিদগণ যা বললেন : ফ্রোবেল একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ হাওরা তেহসিন জোহাইর দৈনিক আজাদীকে বলেন, স্কুলের জন্য আমরা প্রাইভেট গাড়ি নিরুৎসাহিত করতে চাই। কারণ এটা শুধু ট্রাফিক না, পরিবেশের জন্যও ক্ষতিকর। এতে জ্বালানি খরচ হচ্ছে, ধোঁয়া বেরুচ্ছে এবং পরিবেশ দূষণ করছে। তিনি বলেন, পৃথিবীর বহুদেশে স্কুলবাস চালু আছে। চট্টগ্রাম শহরেও স্কুলবাস চালু হলে অভিভাবকগণ বেনিফিট পাবেন। সহজেই সন্তান স্কুলে পৌঁছাতে পারবে বলে অভিভাবকগণ শান্তি পাবেন। এর বাইরে কিন্তু পরিবেশের জন্যও স্কুলবাস চালু করা খুবই জরুরি। যানজটের কারণে মানুষের যে সময়টা নষ্ট হচ্ছে তা কিন্তু অনেক কাজে লাগানো যায়। শনিবারে কিন্তু যানজট কম হয়। কারণ সেদিন স্কুল বন্ধ থাকায় প্রাইভেট গাড়ি কম চলে।
তিনি বলেন, সব দিক দিয়ে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আগামীতে গাড়ির সংখ্যা আরো বাড়বে। কিন্তু সড়ক বাড়ছে না। সেক্ষেত্রে যানজট বাড়বে। তাই এখন থেকেই সজাগ হয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে স্কুলবাস চালু করার মধ্যেও যানজট নিরসনে অনেক বেশি অবদান রাখার সুযোগ আছে। স্কুলবাস চালু করার মধ্য দিয়ে কিন্তু পুরো সোসাইটির জন্য ভূমিকা রাখা যাবে।
তিনি বলেন, প্রাইভেট গাড়ির কারণে দীর্ঘ লাইন পড়ে যায়। জ্যামের জন্য ১৫-২০ মিনিট ধরে গাড়িতে বসে থাকতে হয়। কিন্তু স্কুল বাস হলে তেমন হবে না। ১৫-২০ মিনিটে তো অনেক দূর এগিয়ে যাওয়া যাবে। আবার বাচ্চারা নির্দিষ্ট সময়ে স্কুলে পৌঁছাতে পারবে। তাই স্কুলবাস যদি ইউনিফর্মলি চালু করতে পারি তখন সবাই বলবে এটাই তো নিয়ম। উন্নত দেশগুলোতে এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারতেও স্কুলবাস আছে। যতই ধনী লোক হন না কেন স্কুলের ১ দশমিক ৫ কিলোমিটার দূরে প্রাইভেট গাড়ি রাখতে হবে। সেখানে বাধ্যতামূলক স্কুলবাস ব্যবহার করতে হয়।
হাওরা তেহসিন জোহাইর বলেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন যদি স্কুলবাস চালু করে সেটা অনেক ভালো একটা উদ্যোগ হবে। বাকিরা এটা অনুসরণ করবে এবং সারা দেশে উদাহরণ হয়ে থাকবে। সিটি কর্পোরেশনের পাশাপাশি প্রাইভেট স্কুলগুলোও যেন এমন উদ্যোগ নেয় সে প্রত্যাশা থাকবে।
নগরপরিকল্পনাবিদ স্থপতি আশিক ইমরান আজাদীকে বলেন, স্কুল কর্তৃপক্ষ বা সিটি কর্পোরেশন যেই করুক স্কুলবাস চালু করা হবে অনেক ভালো উদ্যোগ। এটা যানজট নিরসনে নিঃসন্দেহে বিশাল ভূমিকা রাখবে। চলাচলের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা আসবে। যদি সিটি কর্পোরেশন উদ্যোগ নেয় সবচেয়ে ভালো হয়। অনেকগুলো স্কুলের নিজস্ব ব্যবস্থাপনা আছে। ব্যয় সাপেক্ষ হওয়ায় অনেকে পারছে না। সিটি কর্পোরেশন যদি সহযোগিতা করে আমরা স্বাগত জানাব।
তিনি বলেন, সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব স্কুল আছে। সেখানেও চালু করতে পারে। শুরু করে পরে যেন থমকে না যায়। সেজন্য সিটি কর্পোরেশন টেকসই ব্যবস্থাপনা করবে বলে আশা করব।
যা বললেন সিটি মেয়র : ঢাকার উত্তর সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগ পজেটিভ মন্তব্য করে চসিক মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী দৈনিক আজাদীকে বলেন, এটাকে স্বাগত জানাই। স্কুল শুরু এবং ছুটির সময় যানজট বেশি হয়। এসময় প্রাইভেট কার বা ব্যক্তিগত যানবাহনের জন্য যানজট সৃষ্টি হয়। এতে মানুষের চরম ভোগান্তি হয়। ব্যক্তিগত গাড়িকে নিরুৎসাহিত করার জন্য স্কুলবাস যদি বাধ্যতামূলক করা যায় এবং স্কুলবাসের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আনা-নেয়া করতে পারলে যানজট কমবে। একইসঙ্গে স্লো গতির যেসব ভেহিক্যাল আছে সেগুলোর গুরুত্ব কমে যাবে। সাথে পরিবহন ব্যবস্থা একটা সিস্টেমের মধ্যে আসবে।
মেয়র বলেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের তো প্রচুর স্কুল আছে। সবগুলোতে একসঙ্গে চালু করা হয়তো সম্ভব নাও হতে পারে। কিন্তু প্রাথমিকভাবে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের জন্য উদ্যোগ নিতে রাজি। এটা নিয়ে আমাদের চিন্তা-ভাবনাও আছে। পাইলট প্রকল্প হিসেবে একই রুটে আমাদের একাধিক স্কুল আছে এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বাছাই করে উদ্যোগ নেয়ার পরিকল্পনা আছে। এটা করতে পারলে যানজট তো কমবেই সাথে ছাত্র-ছাত্রীদের নিরাপত্তার জন্যও ভালো হবে। মেয়র বলেন, প্রাইভেট যেসব স্কুল আছে তাদের প্রতিও আহ্বান থাকবে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় স্কুলবাস চালু করার জন্য। তাদের ডেকে হয়তো আমরা উদ্বুদ্ধও করব।

পূর্ববর্তী নিবন্ধটানা ১০ দিন পর করোনাশূন্য চট্টগ্রাম
পরবর্তী নিবন্ধবাবুল আক্তার অত্যন্ত চতুর : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী