চট্টগ্রামে বিধি-বহির্ভূত নির্মাণ প্রবণতা: নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?

তাসলিমা মুনা | শনিবার , ৩ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৫:৩২ পূর্বাহ্ণ

সাম্প্রতিককালে ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের কারণে শতাধিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে নাগরিক জীবনে ভীতির জন্ম দিয়েছে আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, ভবন নির্মাণে সতর্কতা অবলম্বন এবং বিধি অনুসরণ করা কতটা জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে ৬ মাত্রার ভূমিকম্প হলে রাজধানী ঢাকার ৮ লক্ষ ভবন নাকি মাটিতে ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। চট্টগ্রাম ভূমিকম্পের সর্বোচ্চ স্তরের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত। একই মাত্রার ভূমিকম্পে চট্টগ্রামের অবস্থা কোন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়াবে নীতিনির্ধারকরা সেটা নিয়ে কতটুকু সচেতন আমরা জানি না।

নিরাপদ ও বাসযোগ্য নগর নিয়ে আলোচনা করতে গেলে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সামনে আসে ভবনের স্থাপতিক এবং কাঠামোগত ডিজাইন, নির্মাণ আবেদন, নির্মাণ অনুমোদন, নিয়ন্ত্রণ, ভৌত উন্নয়ন এবং উন্মুক্ত পরিসর, জলাধার, পাহাড় সংরক্ষণ ইত্যাদি কিভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে সেই বিষয়গুলি বিবেচনায় নেয়া। সাথে অবৈধ নির্মাণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, নাগরিক জীবন যাপনে স্বস্তি নিশ্চিত করা, পরিবেশ সংরক্ষণের সাথে সাথে পরিবেশের বিপর্যয় ঘটতে পারে এমন কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ ও নিরুৎসাহিত করা।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক) একটি সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান। পরিকল্পিত নগর বিনির্মাণে প্রয়োজন পরিকল্পনা প্রণয়ন। সে প্রেক্ষিতে নিজ উদ্যোগে, অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয় করে এবং ব্যক্তি উদ্যোগকে সহায়তা প্রদান করে, অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ নগর জীবনের চাহিদা পূরণ করাও চউকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

এমন কর্মযজ্ঞকে ব্যক্তি স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে নগর পরিবেশ সুরক্ষিত ও নিরাপদ রাখতে নির্মাণ অনুমোদন ও নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ করা এই প্রতিষ্ঠানের একটি মৌলিক দায়িত্ব। ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে চউক তার অধিক্ষেত্রভুক্ত এলাকায় ইমারত নির্মাণ আইন১৯৫২ অনুযায়ী যেকোন ধরনের ভবন নির্মাণে অনুমোদন গ্রহণকে বাধ্যতামূলক করে। তবে অনুমোদন গ্রহণ সত্ত্বেও বিধিবহির্ভূত নির্মাণের প্রবণতা দিন দিন বেড়েই চলছে। নগরের বাসযোগ্যতা দিন দিন নিম্নমুখী হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের উদ্যোগে নগরের কিছু কিছু ভবন পরিদর্শন করা হয় এবং পরিদর্শন টিম যথারীতি নগরের যত্রতত্র বিধিবহির্ভূত নির্মাণের অনেক ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন। এমন ঘটনা ব্যাপকভাবে ঘটলেও চউকের পক্ষ থেকে যথা সময়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের বিশেষ কোন উদ্যোগ পরিদর্শন টিমের চোখে পড়েনি। চট্টগ্রাম মহানগর ইমারত (নির্মাণ, উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও অপসারণ) বিধিমালা২০০৮ এ নির্মাণ সংক্রান্ত যে আইনি ধারাগুলো বিদ্যমান রয়েছে তামেনে ভবন নির্মাণ আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক হলেও, কার্যক্ষেত্রে তার প্রয়োগ নাই বললেই চলে। এর ফলে, চট্টগ্রাম মহানগর তার বাসযোগ্যতা ধারাবাহিকভাবে হারাচ্ছে।

চট্টগ্রাম বিভিন্ন এলাকায় কয়েকটি বহুতল ভবন পরিদর্শনকালে ফোরাম কর্তৃক অবৈধ নির্মাণের যে চালচিত্র সর্বত্র লক্ষ্য করা যায়। এটি খুবই পরিতাপের ব্যাপার যে, অবৈধ নির্মাণের যে মহোৎসব চলছে তার জন্য বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে চউকের শক্তিশালী আইনি অধিকার থাকা সত্ত্বেও তা কার্যকর করার বিষয়ে চউক যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।

চউক প্রণীত ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যানে এখানে যে ধরনের উন্নয়ন প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে বাস্তবে তার সঙ্গে নির্মাণ কাজের কোন প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। কিছু কিছু এলাকায় দেখা যায়, রোডের আংশিক এবং ফুটপাতের সম্পূর্ণ অংশ দখল করে ভবনের একটি প্রবেশ র‌্যাম্প এমন ভাবে নির্মাণ করা হয়েছে যে, উক্ত র‌্যাম্প থেকে রাস্তায় গাড়ি নির্গমণের সময় সরাসরি সম্মুখ সংঘর্ষের মত দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। যেকোন সময় ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। অথচ বিধি অনুযায়ী পার্কিং স্থানে র‌্যাম্প নিজ জমির পরিসর থেকে ৪.২৫ মি: অর্থাৎ ১৪ ফুট ভিতরে শুরু করা বাধ্যতামূলক।

অনুমোদিত নঙায় রোডের লেভেল থেকে ভবনের প্লিন্থের উচ্চতা বাস্তব উচ্চতা থেকে সচেতনভাবে কম দেখিয়ে এবং বিধি অনুযায়ী ঢালের অনুপাত না করে নির্মিত র‌্যাম্প নির্মাণ করা হয়েছে। সড়ক ও ফুটপাত দখলের ফলে একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। যান চলাচলে দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা ছাড়াও এখানে স্বস্তি নিয়ে ফুটপাতে হাঁটার অধিকার থেকে পথচারী বঞ্চিত হচ্ছে। আবশ্যিক উন্মুক্ত সবুজ পরিসর নিয়মতান্ত্রিক অনুপাতে রাখা হয় নাই। সে জায়গায় বিধিবহির্ভূতভাবে ভবনের কক্ষ নির্মাণ করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগর শুধু নয়, এই নগরে দেশের প্রধান বন্দর অবস্থিত যা দেশের অর্থনীতির চালিকা শক্তি। দেশের অর্থনীতি সচল রাখার স্বার্থে এই মানের নগরের উন্নয়ন প্রসার কিংবা উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণে কোন হেলাফেলা করার সুযোগ নাই। অথচ চউক, জনবল স্বল্পতার অজুহাত দেখিয়ে কার্যতঃ বিধিবহির্ভূত নির্মাণকে উৎসাহ দিয়ে চলছে। জমির মালিক ও নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লাভবান হলেও নগর সংকটাপূর্ণ হয়ে চলেছে প্রতিনিয়ত !

নগর ও তার বহুবিধ স্থাপনা, কাঠামোগত কার্যকারিতা, অগ্নিনিরাপত্তাসহ ভবন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রত্যেক দেশ অভিজ্ঞ প্রকৌশলী দ্বারা নিজ দেশের ভূপ্রকৃতি, সামর্থ্য অনুযায়ী নিরাপদ ডিজাইন, তথ্য সমেত বিল্ডিং কোড প্রনয়ণ ও সে অনুযায়ী ভবন নির্মাণ নিশ্চিত করার জন্য পরিচালনা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে। ১৯৯৩ সনে প্রথম আমাদের দেশে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (BNBC) প্রণয়ন করা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ২০২০ সালে তা আধুনিকায়ন ও সময়োপযোগী করা হলেও নিরাপদ নির্মাণ ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই ডকুমেন্ট পরিচালনা ও কার্যকর করার জন্য আজ অবধি কেউ দায়িত্ব নেয়নি বা কোনও সঠিক কর্তৃপক্ষ নির্বাচন করা সম্ভব হয়নি। তাই ভূমিকম্প হলে, অগ্নিকাণ্ড ঘটলে বা ভবনে চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হলে তার দায় কে বহন করবে তা নিরূপণ করা যায়না!

অপর দিকে নির্মিত ভবনের বাসযোগ্যতা এবং উক্ত স্থাপনা নির্মাণের ফলে যাতায়াতসহ নগর পরিবেশের উপর তার প্রভাব নিরূপণ ও নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নির্মাণ বিধিমালা প্রণয়ন ও পরিচালনা করা হয়। বিধি মোতাবেক চউক বিদ্যমান বিল্ডিং রুলস ২০০৮ পরিচালনা করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হলেও এর সুষ্ঠু প্রয়োগ ও পরিচালনায় যে অব্যবস্থাপনা ও অদক্ষতার বেজায় ফাঁক বিরাজ করছে জনমনে তা স্পষ্ট। নির্মাণ অনুমোদন প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির আভাসও প্রায়শ আলোচিত হয়ে থাকে।

পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরাম এটা বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছে যে, ভবন নির্মাণে চউক, বিধি অনুসরণের বিষয়টি কখনো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেনি বা করছে না। প্রাকৃতিক এবং নগর পরিবেশ রক্ষা বিষয়ে চউকের সক্ষমতার মান, আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দায় এবং আইন প্রয়োগে করণীয় বিষয়ে রাষ্টী্রয় পদক্ষেপ সহ সংশ্লিষ্ট সবার খোলাখুলি আলোচনা করার সময় এসেছে বলে ফোরাম মনে করে।

লেখক: যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরাম।

পূর্ববর্তী নিবন্ধআশার আলোয় নতুন বছরের শুরু
পরবর্তী নিবন্ধলেখক পাঠকের সেতুবন্ধন