ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণকে কেন্দ্র করে চার স্তরের নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছে পুরো চট্টগ্রামকে। বন্দর নগরীর পাশাপাশি চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনকে ঘিরে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তা। ৪০ হাজারের বেশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের নিয়ন্ত্রণে পুরো জনপদ। সাদা পোশাকেও ঘুরছেন পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। ঘুরছেন বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন। নগরীর মোড়ে মোড়ে সতর্ক অবস্থানের পাশাপাশি চলছে নিরাপত্তা তল্লাশি। জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সমানতালে চলছে নজরদারি ও তল্লাশি। নামানো হয়েছে ডগ স্কোয়াড।
যৌথবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। কোথাও কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে সাথে সাথে প্রতিহত করা হবে।
নগরী ও জেলা মিলে চট্টগ্রামে ১৬টি সংসদীয় আসন রয়েছে। প্রতিটি আসনে একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কয়েকটি আসনে ইতোমধ্যে বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা ঘটেছে। তবে নির্বাচনের দিন যাতে কোনো প্রতিবন্ধকতা বা কেন্দ্র দখলের মতো ঘটনা না ঘটে সেজন্য সরকারের তরফ থেকে সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।
পুলিশ, র্যাব, সেনাবাহিনী, এপিবিএন, বিজিবি, আনসার, নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের প্রায় ৪০ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে চট্টগ্রামে। ভোটগ্রহণের দুদিন আগে গত শনিবার থেকে বিভিন্ন বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য মাঠে অবস্থান নিয়েছেন। ১৪২ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন।
চট্টগ্রামের ১৬টি আসনে নির্বাচনে মোট ১ হাজার ৯৬৫টি ভোটকেন্দ্রের ১২ হাজার ১টি বুথে ভোটগ্রহণ করা হবে। এর মধ্যে ১ হাজার ২৯১টি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নগর এলাকায় অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র রয়েছে ৩১২টি। জেলার ১৩টি আসনে অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা ৩৪৪টি। ভোটকেন্দ্রের অবস্থান, প্রার্থীর বাসস্থানের দূরত্ব, গোলযোগের শঙ্কাসহ কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে মহানগর ও জেলার ভোটকেন্দ্রগুলোকে ‘সাধারণ’ ও ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
চট্টগ্রামে ১৬ আসনের মধ্যে তিনটির অবস্থান পুরোপুরি মহানগরীতে। ১০টি আসনের অবস্থান জেলায়। বাকি তিনটি আসন জেলা ও মহানগরীর কিছু অংশ মিলে রয়েছে। বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ জিয়াউদ্দীন, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা এবং আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন চৌধুরী রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এদিকে চট্টগ্রামের নির্বাচনি এলাকাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ৬৯ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং নির্বাচনি অপরাধসমূহ আমলে নিয়ে সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করতে ৩১ জন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া প্রার্থীদের আচরণবিধি মনিটরিংয়ে মাঠে আছেন ৪২ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। সব মিলে চট্টগ্রামে ১৪২ জন ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন। ভোটকেন্দ্রে সংঘটিত কিছু অপরাধের তাৎক্ষণিক বিচার করে জেল–জরিমানা করা হবে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
চট্টগ্রামের ভোটকে উৎসবে পরিণত এবং সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য সর্বাত্মক পদক্ষেপ নেওয়ার কথা উল্লেখ করে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিভিন্ন বাহিনীর প্রায় ৪০ হাজার সদস্য চট্টগ্রামে মাঠে কাজ করছেন। জেলায় ১১৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন। ভোটকেন্দ্রে বিশৃঙ্খলার কোনো সুযোগ নেই জানিয়ে তিনি বলেন, এবার আমরা নিরাপত্তার উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। পুলিশ, বিজিবি, সেনাসদস্যরা বডিওর্ন ক্যামেরা নিয়ে দায়িত্ব পালন করবেন। কোনো কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা বা চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হলে পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমাদের স্ট্রাইকিং ফোর্স ঘটনাস্থলে পৌঁছাবে।
গুজব প্রতিরোধের বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়ার কথা উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, গুজব ছড়িয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা রোধে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে, যেখানে সোশ্যাল মিডিয়া এঙপার্টরাও আছেন। একটি অ্যাপের মাধ্যমে সন্দেহজনক লিংক রিয়েল না ফেক তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা হচ্ছে। গুজব ছড়ালে তাদের চিহ্নিত করে আইনের মুখোমুখি করা হবে।
নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কার্যালয় থেকে ব্যালট পেপার ও প্রয়োজনীয় উপকরণ ইতোমধ্যে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে পৌঁছে গেছে। কেন্দ্রগুলো ভোটগ্রহণের জন্য প্রস্তুত। নির্বাচনকে উৎসবমুখর করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে চট্টগ্রামে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে র্যাব–৭। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিশেষ টহল, চেকপোস্ট স্থাপন এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে র্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। র্যাব–৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান গতকাল সকালে নগরের এনায়েত বাজার মহিলা কলেজ কেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সার্বিক নিরাপত্তা ও টহল কার্যক্রম জোরদারের বিষয়ে ব্রিফিংকালে এ কথা বলেন। তিনি বলেন, র্যাব–৭ এর আওতাধীন চার জেলায় ২০টি সংসদীয় আসনে মোট ৫০টি টহলদল মোতায়েন রয়েছে। পাশাপাশি একটি ডগ স্কোয়াড ও বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট দায়িত্ব পালন করছে। এ কার্যক্রম ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য নাশকতা বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে শহর ও উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও যানবাহনে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যান্য ইউনিটের সঙ্গে সমন্বয় করে যৌথ টহলও পরিচালিত হচ্ছে। চট্টগ্রাম জেলা ও মহানগর মিলিয়ে ১৬টি সংসদীয় আসন রয়েছে, যেগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় নিয়ে ৪০টি টহলদল কাজ করছে। ভোটাররা যেন ভীতি ছাড়াই কেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সেজন্য সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান বলেন, যে–কোনো ধরনের সহিংসতা বা নাশকতার বিরুদ্ধে আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন ও গণভোট সম্পন্ন করতে আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছি।
নির্বাচন সামনে রেখে চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও নিরাপদ রাখতে ৭১ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বিজিবির সদস্যরা মহানগরী ও জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় টহল কার্যক্রম শুরু করেছেন।
বিজিবির কর্মকর্তারা জানান, নির্বাচনকালীন অপ্রীতিকর ঘটনা প্রতিরোধ এবং সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিজিবির সদস্যরা স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সর্বাত্মক দায়িত্ব পালন করছে।
সিএমপি কমিশানর হাসিব আজিজ গত রাতে আজাদীকে জানান, মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস স্যার জাতিকে কথা দিয়েছেন, অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ এবং উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আমরা এই লক্ষ্য অর্জনে সর্বাত্মক এবং সর্বোচ্চ মনোযোগ দিয়ে কাজ করছি। শুধু পুলিশ নয়, আর্মি, বিজিবি, র্যাব, এপিবিএন, আনসার, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ডসহ আমরা সকল বাহিনী সমন্বয়ের মাধ্যমে একই অ্যালাইমেন্টে কাজ করছি। নির্বাচনে কোনো ধরনের বেআইনি কার্যক্রম বরদাশত করা হবে না।












