চট্টগ্রামের গ্যাস সেক্টরে ধেয়ে আসছে দুর্দিন। চট্টগ্রামের গ্যাসের অন্যতম যোগানদাতা কাতার গতকাল থেকে এলএনজি উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। এর ধকল চট্টগ্রামে কী ধরনের প্রভাব ফেলে তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা ও ইরানি হামলার প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দেশে তেল ও গ্যাস স্থাপনা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ইউরোপের জ্বালানি বাজারেও। সেখানে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে।
কাতারের বিভিন্ন আমেরিকান ঘাঁটিতে ইরান হামলা করছে। ইতোমধ্যে দেশটির বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটেছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে গতকাল কাতার এলএনজি উৎপাদন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণা দেয়। কাতারের এই ঘোষণা চট্টগ্রামের গ্যাস সেক্টরের জন্য বড় ধরণের দুঃসংবাদ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চট্টগ্রামে গ্যাসের যোগান পুরোপুরি দেয়া হয় আমদানিকৃত এলএনজি দিয়ে। এই গ্যাসের সিংহভাগ আসে কাতার থেকে। কুতুবদিয়ার অদূরে ভাসমান টার্মিনাল থেকে আমদানিকৃত এলএনজি দেয়া হয় পাইপ লাইনে। যা চট্টগ্রাম হয়ে আশুগঞ্জ–বাখরাবাদ লাইন হয়ে ন্যাশনাল গ্রিডে যায়। আমদানিকৃত প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি থেকে চট্টগ্রামে ২৭০ থেকে ২৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেয়া হয়। বাকি গ্যাস যায় ন্যাশনাল গ্রিডে। চট্টগ্রামের শিল্প, বাণিজ্যিক, সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন এবং প্রায় ৬ লাখ আবাসিক গ্রাহকের গ্যাসের পুরো চাহিদা মেটানো হয় আমদানিকৃত এলএনজি দিয়ে। কাতার উৎপাদন বন্ধ করে দেয়ায় এই এলএনজি কোত্থেকে কিভাবে আসবে তা নিয়ে সংশয় ব্যক্ত করা হয়েছে।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির একজন কর্মকর্তা গতকাল দৈনিক আজাদীকে বলেন, আমাদের গ্যাসের পুরোটাই আমদানি নির্ভর। ঠিকঠাকভাবে এলএনজি আমদানি না হলে চট্টগ্রামে গ্যাস থাকবে না। ন্যাশনাল গ্রিড থেকে চট্টগ্রামে গ্যাস দেয়ার কোন সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলেছে, আশুগঞ্জ বাখরাবাদ লাইন ব্যবহার করে আগে সিলেট ও কুমিল্লা অঞ্চলের গ্যাস চট্টগ্রামে দেয়া হলেও এলএনজি সরবরাহ শুরু হওয়ার পর গত ক’বছর ধরে সেই সুযোগটি আর নেই। বিশেষ বাল্ব লাগিয়ে কুমিল্লা ও সিলেট অঞ্চলের গ্যাস চট্টগ্রামে আনার পথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বিকল্প কোন দেশ থেকে গ্যাস আনার ব্যবস্থা করতে হবে বলে উল্লেখ করে কর্ণফুলী গ্যাসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলেছেন, বিকল্প দেশ আছে। তবে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়ায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে জাহাজ আসা খুব একটা সহজ হবে না। তিনি যুুদ্ধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত গ্যাস ও তেল সেক্টরে দুঃচিন্তা থেকে যাবে বলেও মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, এলএনজি সরবরাহ না থাকলে আমরা সার এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতেও গ্যাস দিতে পারবো না। সেক্ষেত্রে সার এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনও বন্ধ হয়ে যাবে। সরকারের পক্ষ থেকে জরুরিভিত্তিতে পদক্ষেপ না নিলে জ্বালানি খাতে বড় সংকট তৈরি হবে বলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশংকা প্রকাশ করেছেন।
কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্রের বরাতে আল জাজিরা জানায়, কাতারের শিল্পনগরী রাস লাফানের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে দুটি ইরানি ড্রোন আঘাত হেনেছে। বিশ্বের অন্যতম বড় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানিকারক কাতার এনার্জি জানিয়েছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে তারা এলএনজি উৎপাদন বন্ধ রাখছে। এতে বৈশ্বিক গ্যাস সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ইসরায়েলের কিছু গ্যাসক্ষেত্রেও উৎপাদন স্থগিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে তেল ও গ্যাস স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
অপরদিকে গতকাল সোমবার ড্রোন হামলার পর সৌদি আরামকো পরিচালিত সৌদি আরবের অন্যতম বৃহৎ তেল শোধনাগার রাস তানুরা রিফাইনারি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। স্থাপনাটি দেশটির অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং প্রতিদিন কয়েক লাখ ব্যারেল তেল প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা রয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবির মুসাফাহ এলাকায় একটি জ্বালানি ট্যাংক টার্মিনালেও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। তবে কোনো হতাহতের কোনো ঘটনা ঘটেনি এবং পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে বলে দাবি আবুধাবির। আবুধাবি মিডিয়া অফিসের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ড্রোন হামলার ফলে সৃষ্ট আগুন তাৎক্ষণিকভাবে নিভিয়ে ফেলা হয়েছে। এ ঘটনায় জ্বালানি কেন্দ্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম বা তেল উত্তোলনে কোনো প্রভাব পড়েনি।
এদিকে জ্বালানি সরবরাহে সম্ভাব্য বিঘ্নের আশঙ্কায় ইউরোপের বাজারে গ্যাসের দাম দ্রুত বেড়েছে। নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাজ্যের পাইকারি গ্যাসের মানদণ্ডমূল্য (টিটিএফ) প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। একইভাবে এশিয়ার মানদণ্ড এলএনজি মূল্যও প্রায় ৩৯ শতাংশ লাফিয়ে ওঠে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখাচ্ছে।
আইসিই’র তথ্য অনুযায়ী, ডাচ টিটিএফ হাবের সামনের মাসের চুক্তিমূল্য ১৪ দশমিক ৫৬ ইউরো বেড়ে ৪৬ দশমিক ৫২ ইউরো (প্রতি মেগাওয়াট ঘণ্টা) দাঁড়িয়েছে। আল জাজিরা জানিয়েছে, দিনের শুরুতেই দাম ২৫ শতাংশ বেশি ছিল। কাতার এনার্জির উৎপাদন বন্ধের খবরের পর সেই ঊর্ধ্বগতি ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা আরও চাপে পড়তে পারে। বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস অবকাঠামো কিংবা শিপিং রুট ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিশ্ববাজারে বড় ধরনের মূল্য অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
উড ম্যাকেঞ্জির গ্যাস ও এলএনজি গবেষণা বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাসিমো দি ওদোয়ার্দো বলেন, এলএনজি প্রবাহে বিঘ্ন ঘটলে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে অবশিষ্ট কার্গোগুলো গ্যাস পাওয়ার জন্য নতুন করে প্রতিযোগিতা শুরু করবে।











