চট্টগ্রামে এখনো নেই কোনো বিশেষায়িত হাসপাতাল

ক্যান্সার রোগ নির্ণয়ের গ্রহণযোগ্য ল্যাব নেই । ঢাকা ও বিদেশকেন্দ্রিক চিকিৎসার ওপর নির্ভরশীল অনেক মানুষ । চমেক হাসপাতালই প্রায় ৪ কোটি মানুষের ভরসা

জাহেদুল কবির | মঙ্গলবার , ৭ এপ্রিল, ২০২৬ at ৬:১৩ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রামের স্বাস্থ্যখাত এখনো চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। চট্টগ্রামে নেই কোনো বিশেষায়িত হাসপাতাল। ফলে চট্টগ্রামসহ আশপাশের জেলা উপজেলার প্রায় ৪ কোটি মানুষের চিকিৎসার একমাত্র ভরসাস্থল হয়ে দাঁড়িয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল। চমেক হাসপাতালের মোট শয্যা ২ হাজার ২০০ তে উন্নীত করা হলেও সেই তুলনায় জনবলসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা বাড়েনি। হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে স্থান সংকুলানের অভাবে অনেক রোগীকে ওয়ার্ডের বাইরে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। তাই মেঝেতে বসে চিকিৎসকদের চিকিৎসা দিতেও হিমশিম খেতে হয়। চমেক হাসপাতালের বাইরে নগরীতে সরকারি পর্যায়ে রয়েছে ২৫০ শয্যার চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল এবং সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাট বিআইটিআইডি (বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকসাস ডিজিজেস) হাসপাতাল। জেনারেল হাসপাতালে রয়েছে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, বিভাগ ও যন্ত্রপাতির সংকট। তাই হাসপাতালের চিকিৎসা বেশিরভাগই বহির্বিভাগ কেন্দ্রিক। আবার বিআইটিআইডি হাসপাতালে চট্টগ্রাম শহরের বাইরে হওয়ায় অনেক রোগী সেখানে চিকিৎসা নিতে যান না। সব মিলিয়ে চট্টগ্রামের স্বাস্থ্যখাতের সুযোগ সুবিধা না বাড়ায় প্রায় রোগী ঢাকার দিকে ছুটেন। এছাড়া চিকিৎসার জন্য অর্থবিত্তে সামর্থ্যবানরা তাই পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত কিংবা সিঙ্গাপুরথাইল্যান্ডের দিকে ছুটেন। তবে আশার কথা হচ্ছে, নগরীর গোঁয়াছি বাগান এলাকায় বিশেষায়িত বার্ন হাসপাতালের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। এই হাসপাতালটি নির্মিত হলে অগ্নিদগ্ধ রোগীদের আর ঢাকায় দৌড়ঝাঁপ করতে হবে না। এছাড়া ১৫ তলা বিশিষ্ট বিশেষায়িত ক্যান্সার ভবনের নির্মাণ কাজ এগিয়ে চলছে। একই ভবনে হৃদরোগ ও কিডনি রোগের বিশেষায়িত চিকিৎসা সুবিধাও থাকছে। যেখানে অন্তত ৫০ শয্যার কিডনি ডায়ালাইসিস সুবিধাও যুক্ত থাকবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে আজ দেশব্যাপী পালিত হচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস। দিবসটিতে এবার প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে– ‘স্বাস্থ্য সেবায় বিজ্ঞান, সুরক্ষিত সকল প্রাণ’।

চট্টগ্রামের স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য সেবা খাতে সরকারি পর্যায়ে উন্নতি না হলেও বেসরকারি পর্যায়ে অনেকগুলো হাসপাতাল গড়ে উঠেছে। এরমধ্যে জনগণের অনুদানের টাকায় নগরীর আগ্রাবাদ এলাকায় গড়ে উঠেছে চট্টগ্রাম মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতাল। সেখানে সব শ্রেণীর মানুষ স্বল্প খরচে চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন। বিশেষ করে হাসপাতালের অধীনে ক্যান্সার ইনস্টিটিউট গড়ে উঠেছে। সেখানে ক্যান্সার রোগীরা সেবা পাচ্ছেন। এছাড়া কয়েক বছর আগে ব্যক্তি উদ্যোগে নগরীর গোল পহাড় মোড় এলাকায় অস্থায়ীভাবে ভাড়া করা ভবনে গড়ে উঠেছে চট্টগ্রাম হার্ট ফাউন্ডেশন। হৃদরোগীদের জন্য আউটডোর সেবার পাশাপাশি সীমিত পরিসরে ইনডোর সেবাও দেয়া হচ্ছে। এর বাইরে কিছু বেসরকারি হাসপাতালও নির্মিত হয়েছে। তবে সেইসব হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যয়বহুল হওয়ায় গরীব ও অসহায় মানুষ বলতে গেলে সেখানে চিকিৎসা নিতে পারেন না। এছাড়া নগরীতে রয়েছে বেশ কিছু বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। চিকিৎসর দিকে থেকে সাধারণ রোগীদের আস্থাহীনতার কারণে এসব বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বেড প্রায় সময় খালি পড়ে থাকে। অন্যদিকে ডায়াগনস্টিক সেন্টারেও দিকে পিছিয়ে আছে চট্টগ্রাম। বিশেষ করে চট্টগ্রামে ক্যান্সার রোগ নির্ণয়ের জন্য নেই গ্রহণযোগ্য বিশেষায়িত মলিউকুলার ল্যাব। তাই রোগীর ক্যান্সার রোগ হয়েছে কিনা সেটি নিশ্চিত হতে নমুনা পাঠাতে হয় ঢাকা কিংবা দেশের বাইরের ল্যাবে। ফলে রিপোর্ট পেতে রোগীকে অপেক্ষা করতে হয়। তবে আশার কথা হচ্ছে, চমেক হাসপাতাল ক্যাম্পাসে ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেসে (ইনমাস) ক্যান্সার রোগ নির্ণয়ের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সাইক্লোট্রন সুবিধাসহ পেটসিটি (পজিট্রন ইমিশন টোমোগ্রাফি) মেশিন স্থাপনের কাজ শেষের দিকে। মেশিনটি স্থাপিত হয়ে গেলে রোগীদের আর ঢাকায় যেতে হবে না। শুধু তাই নয়, এখানের সাইক্লোট্রন থেকে উৎপাদিত আইসোটোপ নিয়ে চট্টগ্রামের বেসরকারি ল্যাব ও হাসপাতাল মালিকরা কেবল পেটসিটি মেশিন কিনে রোগীদের পেটসিটি সেবাটি দিতে পারবেন।

জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী দৈনিক আজাদীকে বলেন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং জেনারেল হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে স্বাধীনতার আগে। এত বছরেও দ্বিতীয় কোনো হাসপাতাল চট্টগ্রামে গড়েনি, এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। অথচ এই চট্টগ্রামকে আমরা বাণিজ্যিক রাজধানী বলি। চট্টগ্রাম শহরে জনসংখ্যা বেড়েছে। এছাড়া আশপাশে জেলা উপজেলা থেকেও রোগীরা আসছে। ফলে চমেক হাসপাতালে এখন রোগীর ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি চাপ নিতে হচ্ছে। এছাড়া চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালকে ২৫০ শয্যার হাসপাতাল বলা হচ্ছে, বাস্তবে কি এখানে ২৫০ শয্যা আছে? এখানে দুপুর ২ টার পর কোনো সিনিয়র চিকিৎসক থাকেন না, ফলে রোগীদের চমেক হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। তাই বাধ্য হয়ে অনেক মধ্যবিত্তকে ক্লিনিক নামের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ছুটতে হচ্ছে। এছাড়া কিছু হাসপাতাল গড়ে উঠেছে আবাসিক হোটেলের আদলে। চিকিৎসার নামে বাণিজ্য চলে সেখানে। অথচ আমাদের দেশে অনেক মেগা প্রজেক্ট হয়েছে, সেইসব মেগা প্রজেক্টে মেগা লুটপাটও হয়েছে। কিন্তু চট্টগ্রামের স্বাস্থ্যখাত বরাবরই অবহেলিত ছিল। এখানে বাজেট বরাদ্দ ছিল একেবারেই অপ্রতুল। বিএনপির সরকার ক্ষমতায় এসেছে। সরকারের প্রতি অনুরোধ চট্টগ্রামের স্বাস্থ্যখাতের অবকাঠামোসহ যাবতীয় সুবিধাসহ যেন বাড়ানো হয়। বিশেষ করে এখানে বিশেষায়িত হাসপাতাল দরকার।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৪৮৩.৪৩ কোটি টাকার পাঁচ প্রকল্প একনেকে অনুমোদন
পরবর্তী নিবন্ধকৌতুক কণিকা