সব জল্পনা–কল্পনার অবসান ঘটিয়ে গতকাল উৎসবমুখর পরিবেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনের কোনো কোনোটিতে বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্তভাবে দুয়েকটি ঘটনা ঘটলেও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল ভালো। কোথাও বড় ধরনের অঘটন ঘটেনি। ঘটেনি মারাত্মকভাবে আহত কিংবা নিহত হওয়ার ঘটনা।
দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা ‘রক্তাক্ত নির্বাচনের’ ধারাবাহিকতায় গতকাল বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচন ছিল একেবারে ব্যতিক্রম। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বাত্মক প্রচেষ্টা, ভোটারদের সরব ও সহনীয় উপস্থিতি নির্বাচনকে ভিন্নমাত্রা দিয়েছে। ঈদের আমেজ বিরাজ করেছে শহরে–গ্রামে। মানুষ দলে দলে ভোটকেন্দ্রে এসেছেন, লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিয়েছেন। ভোটকেন্দ্রগুলোর আয়োজন নিয়েও ভোটারদের কোথাও আপত্তি করতে দেখা যায়নি। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, দক্ষতা এবং পেশাদারিত্বে চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আক্ষরিক অর্থেই শহর এবং গ্রামকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দিয়েছিল। প্রয়োজনের সময় ফোন করার ১০ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে হাজির হয়েছে স্ট্রাইকিং ফোর্স, সেনাবাহিনীর নেতৃত্বাধীন যৌথবাহিনী। চট্টগ্রাম–৯ আসনের একটি কেন্দ্রে ডা. একেএম ফজলুর রহমানকে ঘেরাও করার চেষ্টা করা হলেও ম্যাজিস্ট্রেট এবং সেনাসদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন। এছাড়া আর কোথাও কোনো প্রার্থীকে অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়নি।
গতকাল সকাল থেকে মানুষ উৎসবের আমেজে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। নির্বাচনকে ঘিরে শহর–গ্রাম সর্বত্র উৎসবের আবহ বিরাজ করেছে। যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় দলে দলে মানুষকে পায়ে হেঁটে কেন্দ্রে আসতে দেখা গেছে। অবশ্য কোনো কোনো আসনে রিকশা ও ব্যাটারি রিকশা দিয়ে ভোটারদের কেন্দ্রে আনা–নেয়া করতে দেখা গেছে। নগরী ও জেলায় ভোটগ্রহণ শুরুর পর থেকে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চললেও দিনভর একাধিক কেন্দ্রে বিভিন্ন প্রার্থী ও তাদের কর্মী–সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনার ঘটনা ঘটে।
চট্টগ্রাম নগরী ও জেলার বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে সকাল থেকে ভোটারের সারি দেখা গেছে। গ্রামাঞ্চলে বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতির হার তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে। বিকাল সাড়ে ৪টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরপর কেন্দ্রে কেন্দ্রে ভোট গণনা শুরু হয়। এর আগে গতকাল সকাল সাড়ে ৭টা থেকে চট্টগ্রামের ১৯৬৫টি ভোটকেন্দ্রের ১২০০১টি বুথে ভোটগ্রহণ শুরু হয়।
জেলা প্রশাসকের বক্তব্য : চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেছেন, মানুষ উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিচ্ছেন। তিনি বলেন, জাতির অনেক দিনের প্রত্যাশা এ ভোটে ভোটারদের ঢল নেমেছে। মানুষ তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিচ্ছেন। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট হচ্ছে। সমগ্র চট্টগ্রামের সব কেন্দ্রে সঠিক সময়ে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। গতকাল সকালে বাঁশখালী উপজেলার সাধনপুর ইউনিয়নের বাণীগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন।
ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে নারী–পুরুষ মিলিয়ে ৪ হাজার ৮৬ ভোটার আছেন। বেলা সাড়ে ১১টায় এ আসনে ১০ জন প্রার্থী থাকলেও ৮টি ভোটকক্ষে সব প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট ছিল না। শুধু বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামিক ফ্রন্টের প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট আছে বলে জানান প্রিসাইডিং অফিসার মুহিবউল্লাহ। আন্দরকিল্লা ওয়ার্ডের মুসলিম এডুকেশন সোসাইটি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে নারী–পুরুষ মিলিয়ে ৯টি বুথ। সব বুথে শুধুমাত্র ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার এজেন্ট দেখা গেছে। প্রিজাইডিং অফিসার হাসান মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান জানিয়েছেন, আর কোনো এজেন্ট কেন্দ্রে আসেননি।
এদিকে নগরীর আকবরশাহ এলাকায় ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার এক ব্যক্তিকে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। নগরীর কদমতলীর পোস্তারপাড় সিটি কর্পোরেশন হাই স্কুল কেন্দ্রে দুপুর দেড়টার দিকে বিএনপি ও দাঁড়িপাল্লার সমর্থকদের মধ্যে দুই দফা ধাওয়া–পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। নগরীর বাকলিয়ায় ৫টি কেন্দ্রে সকালে কিছু দুষ্কৃতকারী জড়ো হয়ে ভোটারদের ভোট দিতে বাধা দেয়। পরে সেনাবাহিনীর তৎপরতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে এবং ভোটগ্রহণ স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
সাতানিয়ায় প্রিজাইডিং অফিসার প্রত্যাহার : পোলিং এজেন্টদের কাছ থেকে অগ্রিম স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগে চট্টগ্রাম–১৫ (সাতকানিয়া) আসনের উত্তর সাতকানিয়ার আলী আহমেদ প্রাণহারি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার ফরিদুল আলমকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তিনি উত্তর সাতকানিয়ার আলী আহমেদ প্রাণহারি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করছিলেন। গতকাল ভোট চলাকালীন দুপুরে ওই কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয় বলে জানিয়েছেন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা খন্দকার মাহমুদুল হাসান।
একই ধরনের ঘটনায় ফটিকছড়ি উপজেলার পূর্ব সুয়াবিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে নির্ধারিত সময়ের আগে স্বাক্ষর নেওয়াকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া–পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
চট্টগ্রাম–১৩ (আনোয়ারা–কর্ণফুলী) আসনের গুন্দীপ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের বাইরে মোমবাতি প্রতীকের সমর্থক জহিরুল ইসলাম হেলালকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। জানা যায়, গতকাল সকালে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে তাকে মারধর করা হয়। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করেন। কেন্দ্রে দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
অপরদিকে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার ৩ নম্বর রায়পুর ইউনিয়নের চুন্নাপাড়া ফররুখ আহমদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যাপক মাহমুদুল হাসানের মহিলা এজেন্টের মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে। এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন প্রিজাইডিং অফিসার মাসুদ পারভেজ সোহেল। তিনি বলেন, এক প্রার্থীর মহিলা এজেন্ট থেকে মোবাইল জব্দ করা হয়েছে। অভিযুক্ত এজেন্টকে কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া বোয়ালখালীতে ভোটকেন্দ্র থেকে আবু বক্কর (২৫) নামে এক যুবককে আটক করেছে সেনাবাহিনী। গতকাল সকালে শ্রীপুর খরণদ্বীপ ইউনিয়নের দক্ষিণ পাড়া খরণদ্বীপ এমদাদুল উলুম মাদ্রাসার ভোটকেন্দ্র থেকে তাকে আটক করা হয়। কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার মাহাবুব ইসলাম বলেন, নিজের ভোট প্রদান করার পর পুনরায় গোপন কক্ষে ঢুকে আরেকজন ভোটারকে ভোট দিতে সহযোগিতা করার সন্দেহে আবু বক্করকে আটক করা হয়। পরে তাকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম–১২ (পটিয়া) আসনের একটি কেন্দ্রের বাইরে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের তিন সমর্থককে মারধরের অভিযোগ উঠেছে বিএনপির কর্মীদের বিরুদ্ধে। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার পূর্ব রতনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের বাইরে এ ঘটনাটি ঘটে। এতে রুহান (২১) ও মো. ইব্রাহিম (৩৮) মাথায় আঘাত পান। আহত অপর ব্যক্তির নাম জানা যায়নি। খবর পেয়ে সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করে।
নির্বাচন কমিশন–সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। কোথাও বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।












