কয়েকশ কোটি টাকার আমদানিকৃত পণ্য নিয়ে মালয়েশিয়া থেকে চট্টগ্রামে আসার পথে পানামার পতাকাবাহী একটি কন্টেনার জাহাজ সাগরে ডুবে গেছে। থাইল্যান্ডের ফুকেট উপকূলের অদূরে এমভি সিলয়েড আর্ক নামের জাহাজটি সাগরে পুরোপুরি ডুবে যায়। জাহাজটিতে থাকা ১৬ জন বাংলাদেশি নাবিককে থাইল্যান্ডের নৌবাহিনী জীবিত উদ্ধার করেছে। জাহাজটির বাংলাদেশি এজেন্ট আলভি লাইনস বাংলাদেশ এবং ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নাবিকদের উদ্ধারের ব্যাপারটি নিশ্চিত করেছে। এদের মধ্যে ৪ জনের বাড়ি চট্টগ্রামে।
জানা যায়, মালয়েশিয়ার পোর্ট কেলাং থেকে গত ৫ ফেব্রুয়ারি ২২৯ টিইইউএস কন্টেনার পণ্য নিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে আসছিল পানামার পতাকাবাহী এমভি সিলয়েড আর্ক নামের একটি জাহাজ। জাহাজটি আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছার কথা ছিল। গতকাল স্থানীয় সময় বিকাল ৩টার দিকে থাইল্যান্ডের ফুকেট উপকূল অতিক্রমকালে তীর থেকে প্রায় চার নটিক্যাল মাইল দূরে সাগরে জাহাজটি হঠাৎ করে কাত হয়ে যায়।
বাংলাদেশের জয়েন্ট মেরিটাইম রেসকিউ কো–অর্ডিনেশন সেন্টার (জেএমআরসিসি) বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছে, জাহাজটি বিপজ্জনকভাবে ৩০ ডিগ্রি কাত হয়ে যাওয়ার পর ক্যাপ্টেন সেটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা এবং সাহায্য চেয়ে এসওএস বার্তা প্রদান করে।
জাহাজের বাংলাদেশি ক্যাপ্টেন শেখ মুনির আহমেদকে উদ্ধৃত করে সূত্র জানায়, জাহাজটি কাত হয়ে পরিস্থিতি খুব দ্রুত খারাপের দিকে যাচ্ছিল। উপায়ান্তর না দেখে তিনি জাহাজটিকে অ্যাবান্ডন শিপ (পরিত্যক্ত জাহাজ) ঘোষণা করে এসওএস সংকেত পাঠান। এরপর থাই মেরিটাইম রেসকিউ সাব–সেন্টার দ্রুত সাড়া দিয়ে বিকাল ৩টা ৫০ মিনিটের মধ্যে সব নাবিককে নিরাপদে সরিয়ে নেয়।
জেএমআরসিসি এক বিবৃতিতে জানায়, থাই কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের ফলে জাহাজটির ১৬ জন বাংলাদেশি নাবিককে কোনো ধরনের হতাহতের ঘটনা ছাড়াই নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। নাবিকেরা বর্তমানে ফুকেটের একটি হোটেলে অবস্থান করছেন এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ আছেন। নাবিকদের সাথে তাদের পরিবার–পরিজনের যোগাযোগ হয়েছে।
জাহাজটির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানায়, এমভি সিলয়েড আর্ক পুরোপুরি ডুবে গেছে। থাই নৌবাহিনী এবং বীমা কোম্পানির প্রতিনিধিরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক সিলয়েড শিপিং লাইনসের মালিকানাধীন জাহাজটি বাংলাদেশের নাফ মেরিন সার্ভিসেসের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছিল। নাফ মেরিন সার্ভিসেসের কর্ণধার ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন গত রাতে দৈনিক আজাদীকে জানান, জাহাজটি ডুবে গেলেও আমাদের নাবিকেরা সবাই সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন। তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো হয়েছে। তারা হোটেলে অবস্থান করছেন। জাহাজটি মালয়েশিয়া থেকে কন্টেনারবোঝাই পণ্য নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসছিল বলে জানান তিনি।
জেএমআরসিসি বাংলাদেশ জানিয়েছে, থাই কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর নাবিকদের দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেএমআরসিসির সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ জাকির হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, নাবিকদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ জাহাজের এজেন্ট, নাবিকদের পরিবার এবং সংশ্লিষ্ট বিদেশি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে।
জাহাজটির স্থানীয় এজেন্ট আলভি লাইন্স বাংলাদেশের অপারেশনাল ম্যানেজার মোহাম্মদ বোরহান উদ্দিন জানান, জাহাজটি পুরোপুরি ডুবে গেছে। এতে ২২৯টি কন্টেনার ছিল। কন্টেনারগুলোতে মালয়েশিয়া থেকে আমদানিকৃত ইলেকট্রনিঙ সামগ্রী, ইস্পাতসহ বিভিন্ন ধরনের মালামাল ছিল। চীন থেকে মালয়েশিয়া হয়ে বাংলাদেশে আমদানি হয় এমন কিছু পণ্যও জাহাজটির কন্টেনারে ছিল। কী কারণে জাহাজটি কাত হয়ে ডুবেছে তা তাৎক্ষণিকভাবে জানতে পারেননি তিনি। তবে উদ্ধার হওয়া নাবিকরা কয়েকদিনের মধ্যে দেশে ফিরবেন বলে জানিয়েছেন।
জাহাজটি থেকে নিরাপদে উদ্ধার হওয়া ১৬ জন নাবিক হচ্ছেন চট্টগ্রামের মোহাম্মদ মোজাহারুল হক, মোহাম্মদ জসিম, মো. সাইফুর রহমান ও রূপক নন্দি; নোয়াখালীর শেখ মনির আহমেদ, মোহাম্মদ নূর হাসান, মোহাম্মদ মোশাররফ, ভোলার মোহাম্মদ ফিরোজ আলম, কুমিল্লার রিয়াদ হাসান চৌধুরী, মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন, পাবনার খন্দকার সাদ আহমেদ, মেহেরপুরের আসিফ মুকতাদ আহমেদ, মানিকগঞ্জের আবদুর রউফ, মোহাম্মদ জুয়েল হোসেন, রাজবাড়ীর এনামুল ইসলাম এবং খুলনার মোহাম্মদ আসিফ।
মোহাম্মদ বোরহান উদ্দিন বলেন, জাহাজটিতে থাকা ১৬ নাবিকের সবাইকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদেরকে জাহাজ থেকে উদ্ধার করা হয়। কাউকে পানিতে নামতে হয়নি। কিছু আইনি আনুষ্ঠানিকতা শেষে নাবিকেরা দেশে ফিরে আসবেন।











