চট্টগ্রাম মহানগরীর চেয়েও গ্রামাঞ্চলে সুপেয় পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের ছয় উপজেলায় প্রতি বছর গ্রীষ্মের শুরু থেকেই সুপেয় পানির সংকট তীব্র হয়ে ওঠে।
উপজেলার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকৌশলীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, জেলার পটিয়া, কর্ণফুলী, আনোয়ারা, সীতাকুণ্ড, মীরসরাই, লোহাগাড়াসহ কয়েকটি উপজেলায় পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। এদিকে বোয়ালখালী উপজেলার কয়েকটি গ্রামেও একই চিত্র বিরাজ করছে।
এসব উপজেলার অন্তত ৫০ থেকে ৬০ গ্রামের মানুষকে প্রতি বছর গ্রীষ্মের শুরুতে সুপেয় পানির সংকটে পড়তে হয়। প্রতি বছর গ্রীস্ম মৌসুমে এসব উপজেলায় অনেক গ্রামে ৪০০ থেকে ৫০০ ফুট গভীরের নলকূপগুলোতেও পানি পাওয়া যায় না।
চট্টগ্রাম জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী জানান, চট্টগ্রামের কয়েকটি উপজেলায় দেশী–বিদেশী শিল্পকারখানাগুলো তাদের পানির চাহিদা মেটানোর জন্য গভীর নলকূপ বসিয়ে পানি উত্তোলন করায় প্রতি বছর তিন থেকে চার ফুট করে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামছে।
আগে যেখানে ২০ ফুট নিচে গিয়ে পানি পাওয়া যেত, এখন ৩৫/৪০ ফুট নিচে যেতে হচ্ছে। উপজেলাগুলোতে ২৫ শতাংশ নলকূপ অকেজো হয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে এসব শিল্পকারখানায় ভারী মোটর বসিয়ে পানি উত্তোলন করা হয়। এসব শিল্পকারখানার পার্শ্ববর্তী সাগর ও নদী থাকার পরও তারা এসব উৎস থেকে পানি ব্যবহার না করে গভীর নলকূপ দিয়ে পানি উত্তোলন করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুপেয় পানির চাহিদা মেটাতে বিকল্প উৎস নিয়ে ভাবতে হবে। আমাদের সমুদ্র, নদী, খালের পানি রয়েছে। এসব পানি পরিশোধনের মাধ্যমে ব্যবহারে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। না হয় অচিরেই দেশের বিভিন্ন স্থানে সুপেয় পানির চরম সংকট দেখা দেবে। জানতে চাইলে চুয়েটের সাবেক ভিসি প্রফেসর ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমাদের ভূ–উপরিস্থ পানির ব্যবহার নিয়ে ভাবতে হবে। শহরে–গ্রামে পাকা দালান নির্মাণের কারণে বৃষ্টির পানি মাটির নিচে প্রবেশে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সরাসরি নদী খালে চলে যাচ্ছে। লবণাক্ত পানি পরিশোধন নিয়ে প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে।
কয়েকটি শিল্পকারখানার কর্মকর্তাদের সাথে কথা হলে তারা জানান, সাগর বা নদী থেকে পানি পরিশোধন করে কারখানায় ব্যবহার করতে গেলে ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। এজন্য গভীর নলকূপ বসিয়ে পানি উত্তোলন করে শিল্প উৎপাদন সচল রাখা হচ্ছে।
এদিকে পানি বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদরা জানান, শিল্পকারখানাগুলো পরিবেশের নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে গভীর নলকূপের মাধ্যমে ভূ–গর্ভস্থ থেকে ব্যাপকহারে পানি উত্তোলনের ফলে পানির স্তর দিনদিন নিচে নেমে যাচ্ছে। এর ফলে পার্শ্ববর্তী কয়েক মাইলের মধ্যে থাকা গ্রামগুলোর ছোট ছোট গভীর নলকূপে বছরের বেশ কয়েক মাস পানি একেবারেই থাকে না।
প্রতি বছর ফাল্গুন থেকে জ্যৈষ্ঠ মাস পর্যন্ত চট্টগ্রামের কয়েকটি উপজেলায় অন্তত ৫০ থেকে ৬০টি গ্রামের মানুষকে সুপেয় পানির জন্য চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়।
ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের দুই পাশে এক সময়ের তিন ফসলি জমি, এখন তার পাশেই গড়ে উঠেছে বিশাল শিল্প কারখানা। ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ক ধরে মীরসরাই এলেই চোখে পড়ে এমন অসংখ্য শিল্প প্রতিষ্ঠানের সারি।
এদিকে সীতাকুণ্ড শিল্পায়নের পুরনো কেন্দ্র। বিশেষ করে সীতাকুণ্ড এবং মীরসরাই এই দুই উপজেলায় জাহাজ ভাঙা শিল্প এবং অন্যান্য শিল্পকারখানার চাপে হারিয়ে গেছে সুপেয় পানির উৎস। শুধু এ উপজেলাতেই রয়েছে প্রায় ৫০টির মতো কারখানা।
কর্ণফুলী নদী তীরবর্তী পটিয়া ও আনোয়ারায়ও একই চিত্র। অপরিকল্পিত শিল্পায়নের কারণে এসব এলাকা পানি সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
আনোয়ারা উপজেলার বন্দর, কাফকো এলাকা, রায়পুর, দক্ষিণ গহিরা, পূর্বগহিরা, সরেঙ্গা, উত্তর পরুয়াপাড়া এলাকায় সুপেয় পানির চরম সংকট বিরাজ করছে। সাগর উপকূলীয় হওয়ায় পানিতে লবণাক্ততা বেশি।
বিশেষ করে চট্টগ্রামের আনোয়ারা, পটিয়া, কর্ণফুলী, লোহাগাড়া, সীতাকুণ্ড ও মীরসরাই উপজেলার গ্রামগুলোতে আগে ৪০০ থেকে ৫০০ ফুট গভীর নলকূপে সুপেয় পানি পাওয়া গেলেও এখন কোথাও কোথাও ৪০০ থেকে ৫০০ ফুট গভীরের নলকূপেও পানি পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
পরিবেশবিদদের মতে, শিল্পকারখানাগুলোতে সার্ভিস ওয়ার্টারের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় এতে চাহিদা মেটাতে ভূগর্ভস্থ পানির দেদার ব্যবহার চলছে। শিল্পায়ন ও ব্যবসার প্রসারের কারণে জেলার উপজেলাগুলোতে ব্যাপক হারে বহুতল স্থাপনা নির্মিত হচ্ছে। সদর এলাকায় হচ্ছে ক্ষুদ্র শিল্পকারখানা, হাসপাতাল ক্লিনিক, বিপনিকেন্দ্র, আবাসিক বহুতল ভবনসহ নানা স্থাপনা। কিন্তু সার্ভিস ওয়ার্টারের ব্যবস্থা না থাকায় গভীর নলকূপের মাধ্যমে পানীয় ও ব্যবহারের জন্য ভূ–গর্ভস্থ পানির দেদার উত্তোলন হচ্ছে।
খোলা জায়গা কমে যাওয়ায় পর্যাপ্ত বৃষ্টির পানি মাটির নিচে ঢুকতে পারছে না। চট্টগ্রামের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে হাজারো নলকূপ অকেজো হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপজেলা সদরের পৌর এলাকায় সার্ভিস ওয়ার্টার সরবরাহের উদ্যোগ নিতে হবে। পৌরসভা এই উদ্যোগ নিতে পারে।














