চট্টগ্রামের কয়েকজন ভাষা সৈনিক

নিজামুল ইসলাম সরফী | শনিবার , ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৫:২৫ পূর্বাহ্ণ

২১ শে ফেব্রুয়ারি অমর একুশে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে দেশের সব এলাকার মতো চট্টগ্রামেও প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে ওঠেছিল। রাজনীতিক, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সাধারণ মানুষও সেদিন ভাষার দাবিতে সোচ্চার হয়ে এগিয়ে এসেছিলেন। চট্টগ্রামে ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারি উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে এখানে সংক্ষিপ্তাকারে আলোচনা তুলে ধরা হল। নতুন প্রজন্মের সামনে এদের পরিচয় তুলে ধরাটা আজ খুবই প্রয়োজন এবং সত্যিকার ইতিহাসের সন্ধানে বস্তুনিষ্ঠতার স্বার্থে। এর বাইরেও আরও কিছু নাম রয়েছে। উল্লেখযোগ্য কিছু ভাষা সৈনিকের মধ্যে কয়েক জনের পরিচিতি সংক্ষিপ্ত পরিসরে এখানে উপস্থাপন করা হল।

আবুল ফজল: চট্টগ্রামের সাহিত্যশিল্পী, সংস্কৃতি কর্মীদের পক্ষে ভাষা আন্দোলনে শিক্ষাবিদ সাহিত্যিক আবুল ফজল নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কাজীর দেউড়ীর সাহিত্য নিকেতনের সামনে ভাষার দাবিতে প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে আবুল ফজল সম্মুখ সারিতে ছিলেন।

কাজী জাফরুল ইসলাম : চট্টগ্রামে প্রথম বর্তমান অবয়বের শহীদ মিনার তৈরি করেন সে সময়ের ছাত্র ইউনিয়ন নেতা ও পরবর্তীতে দৈনিক আজাদীর সাংবাদিক কাজী জাফরুল ইসলাম। চট্টগ্রাম কলেজে ভাষার আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাঁকে সহযোগিতা করেছিলেন মোজাফ্‌ফর আহমদ, কামাল উদ্দিন আহমেদ খান, জহুরুল ইসলাম, আব্দুল মাবুদ তালুকদার, মাহাবুবুল আলম তারা, শহীদ মুরিদুল আলম, ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী, মুক্তিযোদ্ধা আবু ছালেহ, শহীদুল্লাহ, নজরুল ইসলাম চৌধুরী, . রশীদ আল ফারুকী, প্রফেসর শায়েস্তা খান, আবুল কালাম আজাদ, লোকমান মাহমুদ, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, নুরুল আলম চৌধুরী (সাবেক রাষ্ট্রদূত) প্রমুখ।

ওবায়দুল হক : দৈনিক আজাদীর সাবেক চীফ রিপোর্টার ওবায়দুল হক ভাষার দাবিতে চট্টগ্রামের রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। তিনি ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে ভাষা আন্দোলনের স্বপক্ষে লিফলেট বিতরণ করেছিলেন।

এ কে খান : শিল্পপতি এ কে খান চট্টগ্রামে ভাষার দাবির আন্দোলনে যারা গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তাদের কারা মুক্তির জন্য উচ্চ মহলে সুপারিশ করে ছাড়িয়ে এনেছিলেন। এছাড়া আন্দোলন সংগ্রামে তাঁর আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা স্মরণীয়।

প্রফেসর শায়েস্তা খান : সরকারি কমার্স কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ, শিক্ষাবিদ ক্রীড়া সংগঠক প্রফেসর শায়েস্তা খান চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র থাকাকালীন ৫২ এর ভাষা আন্দোলনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখেন।

ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী : ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী ভাষা আন্দোলনের সময় চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র ছিলেন। ভাষার দাবিতে তিনিও সবার মত সম্মুখ সারিতে ছিলেন।

. রশীদ আল ফারুকী : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. রশীদ আল ফারুকী ও চট্টগ্রামে ভাষা সংগ্রামে কৃতিত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমান : চট্টগ্রাম কলেজের সে সময়ের অধ্যাপক কথাশিল্পী শওকত ওসমান ‘ক্রীতদাসের হাসি’ রূপক উপন্যাসের মাধ্যমে পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের ব্যঙ্গ করে লেখা ভাষা সংগ্রামকে উদ্দীপ্ত করেছিল।

প্রফেসর মমতাজ উদদীন আহমেদ : নাট্যকার অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন আহমেদ চট্টগ্রাম কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক থাকা অবস্থায় ভাষার দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনে নিজে শামিল হন এবং তাঁর রচিত অনেক নাটক চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন প্রান্তে মঞ্চস্থ হয়।

আবু ছালেহ : মুক্তিযোদ্ধা, গেরিলা কমান্ডার ও রাজনীতিবিদ এম আবু ছালেহ ছিলেন চট্টগ্রামের ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক।

নুরুল আলম চৌধুরী : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও রাজনীতিবিদ নুরুল আলম চৌধুরী ছিলেন চট্টগ্রামের ভাষা আন্দোলনের একজন নিবেদিত প্রাণ সংগঠক ও অনলবর্ষী বক্তা।

সৈয়দ মোস্তফা জামাল : সাপ্তাহিক ‘জমানা’ পত্রিকার সম্পাদক সৈয়দ মোস্তফা জামাল ছিলেন সে সময় ভাষা সংগ্রামের একজন সক্রিয় কর্মী। লেখালেখি আর সাংবাদিকতার মাধ্যমে তিনি মাতৃভাষার দাবিকে জনসমক্ষে জনপ্রিয় করে তুলেন।

এছাড়া ছিলেন সাহিত্যরত্ন কবি নূর মোহাম্মদ চৌধুরী, এডভোকেট বদিউল আলম, কবি মসউদ উশ শহীদ, মাসিক সুরভি সম্পাদক ডা.কাজী মোহাম্মদ ইউসুফ প্রমুখ।

ভাষা আন্দোলনে গড়ে ওঠা সংগঠন ‘তমুদ্দুন মজলিস’ অসাধারণ ভূমিকা পালন করে। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের মাধ্যমে চট্টগ্রামে ভাষা আন্দোলনে সম্মুখ সারিতে ছিলেন মাহবুব উল আলম চৌধুরী, এম এ আজিজ, এম এ মান্নান, প্রকৌশলী আজিজুর রহমান, চৌধুরী হারুনুর রশিদ, গোড়া আজিজ, ডা. আনোয়ার হোসেন, নূর আহমেদ চেয়ারম্যান, খাস্তগীর স্কুলের ছাত্রী প্রতিভা মুৎসুদ্দি।

একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম কবিতা ছাপানোর দায়িত্ব নিয়ে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন দৈনিক আজাদীর প্রতিষ্ঠাতা ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক।

কোহিনূর ইলেকট্রিক প্রেসের ম্যানেজার দবির আহমেদ চৌধুরীকে সেদিন কবিতা ছাপানোর অপরাধে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া সে সময় অন্যতম রাজনৈতিক কর্মী রুহুল আমিন নিজামী, সাংবাদিক হাবিব উল্লাহ, নুরুজ্জামান, শামসুদ্দিন আহমেদ, মফিজুল ইসলাম, ইয়হিয়া খালেদ, আবু জাফর, এ কে এম এমদাদুল ইসলাম, ডা.কামাল এ খান, ডা.সাইদুর রহমান, আমির হোসেন দোভাষ, এজহারুল হক, রফিক উদ্দিন ছিদ্দিকী, ফরিদ আহমদ, তোফাজ্জল আলী, কৃষ্ণ গোপাল সেন প্রমুখ চট্টগ্রামের ভাষা আন্দোলন এগিয়ে নিতে বিশেষ ভূমিকা রাখেন।

লেখক: প্রাবন্ধিক, সাংস্কৃতিক সংগঠক

পূর্ববর্তী নিবন্ধভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ ও গৌরবোজ্জ্বল দিন
পরবর্তী নিবন্ধএকুশের চেতনা : প্রেরণার মূল উৎস