(দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব)
চট্টগ্রামী বাংলায় ‘পানসড়ইক্কা’ বলে একটা শব্দ আছে। অতিকথন দোষে দুষ্ট কিশোরী তরুণীদের উদ্দেশ্যে মুরব্বীরা বলেন, ‘ওডি পানসড়ইক্কা কথা ন কইছ’। আবার নারীর মন ভোলাতে ছেলেরা যে সোহাগী কথা বলে সেটাও ‘পানসড়ইক্কা কথা’। খ্যাতিমান শিল্পী সিরাজুল ইসলাম আজাদের একটি গানে শব্দটির সার্থক প্রয়োগ দেখা যায়…
মা বাপর ঘরে আছিলাম আঁই আদরে
কুসল্লা দি বেয়াগ্গন ছাড়াইলা।
গঅর ডাগত বই বই, পানসড়ইক্কা কথা কই
সুখর ঘরত থাকিতা নঅ দিলা রে রঙিলা।।
(জীবন গীত, সম্পাদনা অধ্যাপক ড. শেখ সাদী)
গান শোনালাম একঘেঁয়েমি কাটানোর জন্য। আবারও শব্দবৈচিত্র্য নিয়ে খানিকটা বলি।
বাংলা ভাষায় কৃপণ বলে একটা শব্দ আছে। বাংলা একাডেমির ব্যাবহারিক বাংলা অভিধানে (ড. মুহাম্মদ এনামুল হক) শব্দটার অর্থ ১. অত্যন্ত ব্যয়কুণ্ঠ, কিপটে, কঞ্জুস। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কৃপণকে বলা হয় ‘কিরপিণ’। ছড়াকার নুর মোহাম্মদ রফিকের ‘চট্টগ্রামী আঞ্চলিক ভাষার অভিধান’ গ্রন্থে কৃপণ অর্থ ‘আলপিত, নাটকিলা’। তবে এই শব্দ অনেক এলাকার মানুষের কাছে অপরিচিত। চট্টগ্রামের ভাষায় কৃপণ অর্থে অনেক শব্দ আছে যেমন মুচি, ছেছি, ছেচ্ছর, ঘষা, মাক্কি, আদানা, নাটা। লোকে বলে‘ইতা ডঅর আদানা মানুষ, আতদ্দি পানি নঅ গলে।’
কক্সবাজার অঞ্চলের গবেষক মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম চট্টগ্রামী বাংলা নিয়ে বেশ গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। তার লেখা থেকে উদ্ধৃত করছি ‘বাংলা ভাষায় মোরগ মুরগীর অন্য কোন প্রতিশব্দ বা সমার্থক শব্দ নেই। তবে ইংরেজি ভাষায় কয়েকটি প্রতিশব্দ রয়েছে, যেমন ঋড়ষি অর্থ মোরগ মুরগী, ঐবহ অর্থ মুরগী, ঈড়পশ অর্থ মোরগ, পযরপশবহ অর্থ বাচ্চা মুরগী। কিন্তু চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় মোরগ মুরগীকে ‘কুরা’ বলা হয়। এখানে মোরগকে ‘রাতা কুরা’, মুরগীকে ‘কুরি কুরা’ বলা হয়। বাচ্চাকে ‘কুরার ছ বা ছা’ বলা হয়। একটু বড় হলে ‘দুরুইচ্যা কুরা’, আরও একটু বড় হলে ‘চালইন্যা কুরা’ বলা হয়। আবার বয়স ভেদে বলা হয় ‘রাতা ছ বা ছা, করই কুরা, দরকইচ্যা রাতা, করকরাইন্যা কুরি, বজাপারইন্যা কুরি। বজা’ মানে ডিম। (কক্সবাজারের আঞ্চলিক ভাষার বৈচিত্র্য, চট্টগ্রাম পরিক্রমা, সম্পাদক আহমদ মমতাজ)।
কিছুদিন আগে ফেসবুকে একটা পোস্ট দিয়ে বলেছিলাম, চট্টগ্রামে কত নামের চিংড়ি মাছ আছে, তা বলার জন্য। ফেসবুক বন্ধুরা বলেছেন অনেক নাম, আমি তা থেকে ১৬টি উল্লেখ করলাম–ইছা মাছ, কালা ইছা (গলদা), ছোঁয়াইছা (বাগদা), বজালা ইছা, লইল্যা ইছা, চাউম্মা ইছা, জুইন্যা ইছা, চাগা ইছা, গুরা ইছা, বিনি ইছা, কেঁডা ইছা, ফরফইরগ্যা ইছা, লুতা ইছা, ধুল বা ফ্লুটি ইছা, ফোয়ানা ইছা, টোঁওরা ইছা। প্রমিত বাংলায় এর অর্ধেকও আছে কি না সন্দেহ।
এবার একটা প্রশ্ন। লেবুকে চট্টগ্রামের ভাষায় বলা হয় ‘কঁঅজি’। তেমনি মই হলো আট্টা, বেড়া জলি/টিঁয়ারা, সাঁতার আঁছুর, সকাল বেইন্যা। আচ্ছা প্রমিত বাংলার জাম্বুরা কেন চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় তরুনজা, ধুন্দল কেন পরুল?ু আশা করি ভাষাবিদরা এসব বিষয় আমাদের জানাবেন।
বাইন দুয়ার দি ন আইস্য তুঁই নিশির কালে
মা বাপরে লাগাই দিব মাইনষে দেখিলে।।
তুঁই হইলা আঁর সোনার পিঞ্জর ময়না পাখি আঁই
মনে কয় যে দিনে রাইতে তোঁয়ার ভিতর থাই
ধন মান ন চাই কিছু তোঁয়ারে পাইলে।
(চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান, কল্যাণী ঘোষ, বাংলা একাডেমী)
‘বাইন দুয়ার’ মানে পেছনের দরজা। তবে এই গানটি একটি আধ্যাত্মিক গান। তাই এটাকে আমরা ‘অলৌকিক দুয়ার’ বলতে পারি। চট্টগ্রামী বাংলায় খুব বেশি সাহিত্য রচিত হয়নি। কারণ এই কথ্য ভাষা লেখা খুব কঠিন। সঠিক উচ্চারণমতো বানান করা বেশ জটিল। কিন্তু এই ভাষায় অসংখ্য গান রচিত হয়েছে। শতবছর ধরে গীতিকারদের কলমে চাটগাঁইয়া ভাষার একটা বানানরীতি তৈরি হয়েছে। সে বিষয়ে আলাদা একটা প্রবন্ধ লেখার ইচ্ছে আছে।
ভাষা বেঁচে থাকে চর্চায়, ভাষা বেঁচে থাকে তার সাহিত্য–গান–নাটকে। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার একটা শব্দভাণ্ডার থাকা দরকার, বিলুপ্তপ্রায় শব্দগুলো সংগ্রহ করা জরুরি, একটা বানানরীতি তৈরি করা গেলে দারুণ কাজ হতো। অসমীয়া ভাষার যেমন বাংলা–অসমীয়া লিপি (বা পূর্বী নাগরী) আছে, চাটগাঁইয়া ভাষারও লিপি থাকলে মন্দ হয় না। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলা একাডেমি এই কাজগুলো করার কথা, তাদের অত সময় কই? তাহলে কে করবে দরকারি এই কাজ? কে বাঁচাবে চাটগাঁইয়া ভাষাকে?
এখন ঘরে ঘরে এখন প্রমিত বাংলা বলার ধুম পড়েছে, বাচ্চার মুখে কথা ফোটে প্রমিত বাংলায়, আঞ্চলিক ভাষা এখন অনেকের কাছে অপাংক্তেয়। কিন্তু চাটগাঁইয়া গান, এই যেন এক মধুর খনি। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা যে এখনো সগৌরবে টিকে আছে তার অন্যতম প্রধান কারণ আঞ্চলিক গান। এই গান এখন বিশ্ববীণায় বাজছে। কিন্তু চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা, আঞ্চলিক গান নিয়ে সারগর্ভ কাজ খুব কম। সেই জায়গায় আমি ধন্যবাদ দেব চট্টগ্রামের বনেদী শিল্পীগোষ্ঠী পিএইচপি ফ্যামিলিকে। সুফী মিজান ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ও মোহাম্মদ আনোয়ারুল হকের পৃষ্ঠপোষকতায় চাটগাঁইয়া গানের কিংবদন্তী, আবদুল গফুর হালীর ৩০০ আঞ্চলিক গান ও ছয়টি আঞ্চলিক নাটক সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হয়েছে। সুফী মিজান ফাউন্ডেশন প্রকাশ করেছে ‘আবদুল গফুর হালীর চাটগাঁইয়া নাটকসমগ্র’, সুরের বন্ধন, শিকড় নামে তিনটি মূল্যবান গ্রন্থ। পংকজ চৌধুরী রনির পরিচালনায় ‘গুলবাহার’ আঞ্চলিক নাটকটি নিয়ে একটি চলচ্চিত্র তৈরি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। দেশবিদেশের গবেষকদের কাছে গফুর হালীর গ্রন্থগুলো চাটগাঁইয়া ভাষা ও গানের ‘আকর গ্রন্থ’ হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে, এমনকি আমেরিকা, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণায় বইগুলো রেফারেন্স গ্রন্থ হিসাবে গুরুত্ব পাচ্ছে, এটা চট্টগ্রামী বাংলার জন্য সুদিনের আভাস। আশা করি অন্যরাও পিএইচপির মতো এগিয়ে এলে চট্টগ্রামী ভাষা সৃমৃদ্ধির স্বর্ণদ্বারে পৌঁছে যাবে।
নাসির উদ্দিন হায়দার, সাংবাদিক ও লোকসংগীত গবেষক









