(প্রথম পর্ব)
‘‘এ সময় হঠাৎ মাঝে মাঝে আবির্ভাব ঘটতো হলদে পাখীর। আমাদের গ্রাম দেশের সবচেয়ে সুন্দর পাখী। দেখলেই আমরা ছেলে দল চেঁচিয়ে উঠতাম আইজ গরবা আইবো, আইজ গরবা আইবো। ‘গরবা’ মানে মেহমান। এখন মেহমান দস্তুরমতো আতঙ্কের ব্যাপার, তখন ছিল খুশির, প্রায় উৎসবের শামিল। বিশেষ করে ছোটদের কাছে।
কারণ তখনকার দিনে কোন মেহমানই খালি হাতে আসতেন না। আর তাদের উপলক্ষ করে নাস্তা তৈরি আর মুরগী জবাই ছিল বাঁধা। মুরগী পালাও হত পাল পরব আর গরবার জন্য।’’ (রেখাচিত্র, আবুল ফজল)
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় ‘গরবা’ মানে মেহমান বা অতিথি। গ্রাম শহরে এখনো ঘরে ঘরে ‘গরবা’ আসে, কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন জীবনে চাটগাঁইয়া ভাষার এই আদুরে শব্দটা আর তেমন শোনা যায় না, নতুন প্রজন্ম শব্দটার সঙ্গে তেমন পরিচিত নয়। এখন তারা গরবাকে মেহমান বা গেস্ট বলতেই বেশি সাচ্ছন্দবোধ করেন। তারা বলেন, ‘আঁরও বাড়িত আইজ গেস্ট আইব’ অথবা ‘মেমান আইব’।
কী গ্রাম, কী শহর, এই অঞ্চলের বিশাল এক জনগোষ্ঠী চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলেন, কিন্তু বিশুদ্ধ আঞ্চলিক ভাষায় কথোপকথন এখন আর তেমন শোনা যায় না। দিনদিন মানুষের কথায় প্রমিত বাংলা আর ইংরেজি ঢুকে পড়ছে, তাতে কোণঠাসা হয়ে পড়ছে চাটগাঁইয়া ভাষা, হারিয়ে যাচ্ছে একদা মানুষের মুখে মুখে ফেরা আঞ্চলিক শব্দগুলো।
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে তাত্ত্বিক কথা বলা আমার উদ্দেশ্য নয়, আমি একজন নগন্য ভাষাপ্রেমী হিসাবে চাটগাঁইয়া ভাষার সৌন্দর্য, স্বাতন্ত্র ও বৈচিত্র্যের কথা বলতে পারি; বলতে পারি আঞ্চলিক ভাষার শব্দ বৈচিত্র্যের কথা, যেগুলোতে চাটগাঁইয়া ভাষার কমনীয়তা, কোমলতা ও গভীরতা স্পষ্ট, কিন্তু সেগুলো আজ অব্যবহারে বিলুপ্তির পথে।
চাটগাঁইয়া ভাষা মূলত ইন্দো–আর্য ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত একটি স্বতন্ত্র ভাষা, যা বাংলাদেশের দক্ষিণ–পূর্বাঞ্চল ও মিয়ানমারের কিছু অংশে প্রচলিত। বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চল তথা চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ির মানুষের প্রধান ভাষা এটি। প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ মানুষ এই ভাষায় কথা বলেন। ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্টের তথ্যমতে, চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা (চাটগাঁইয়া) বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি কথ্য ভাষার তালিকায় ৮৮তম অবস্থানে রয়েছে।
বাংলা ভাষার অন্যান্য উপভাষাগুলোর সাথে চাটগাঁইয়ার শব্দগত এবং ব্যাকরণগত সম্বন্ধ বিদ্যমান থাকায় এই ভাষাকে ভাষাবিদরা সাধারণত বাংলার উপভাষা হিসাবে গণ্য করেন, যদিও ভাষাদ্বয় পারস্পরিক একই অর্থে বোধগম্য হয় না। এই কারণে আবার অনেকে এই ভাষাকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। (দক্ষিণ–পূর্ব বাংলাদেশের চট্টগ্রামের এই উপভাষার যথেষ্ট বৈচিত্র্য রয়েছে, যা একটি পৃথক ভাষা হিসাবে বিবেচিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট।) মাসিকা, কলিন (১৯৯১)। ঞযব ওহফড়–অৎুধহ খধহমঁধমবং। ক্যামব্রিজ: ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস। পৃ. ১৬।
অঞ্চলভেদে চাটগাঁইয়া ভাষার প্রধানত ৫টি উপভাষা পাওয়া যায়। যথা: ১. উত্তর চাটগাঁইয়া ভাষা ২. দক্ষিণ চাটগাঁইয়া ভাষা ৩. চট্টগ্রাম শহরের চাটগাঁইয়া ভাষা ৪. বড়ুয়াদের চাটগাঁইয়া ভাষা ৫. সনাতন ধর্মালম্বীদের চাটগাঁইয়া ভাষা।
চট্টগ্রাম একসময় আরকানের অংশ ছিল। চট্টগ্রামে রোহিঙ্গা বা রোঁয়াইদের বসবাস শত শত বছর ধরে। চট্টগ্রামের সাথে আরকানের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক অনেক পুরোনো। এখনো কক্সবাজারের মানুষের ভাষার সাথে রোহিঙ্গাদের ভাষার বিরাট মিল রয়েছে। আবার গবেষককরা বলেন, ‘চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার অর্ধেক শব্দ এসেছে আরবি থেকে।’ কারণ পুরাকালে চট্টগ্রামের সঙ্গে আরব বণিকদের যোগযোগ ছিল ঘনিষ্ঠ।
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার গঠনবৈশিষ্ট্য বড়ই বিচিত্র। ১০ থেকে ২০ মাইল অন্তর এই ভাষার পরিবর্তন বা উপভাষা লক্ষণীয়। ভাষার উচ্চারণরীতি ও অন্তর্গত তারতম্যের কারণে চট্টগ্রামের কিছু এলাকার ভাষা স্বতন্ত্র। যেমন কক্সবাজারের ভাষা স্বতন্ত্র। আবার চট্টগ্রাম শহরের আদি বাসিন্দাদের ভাষাও অন্য এলাকা থেকে কিছুটা আলাদা। ডাক্তার আসার আগেই রোগী মারা গেছেন, কিন্তু টাকার লোভে তবুও ডাক্তার রোগী দেখার ভান করছেন এই বিষয়টি কক্সবাজারের মানুষ বলবে রূপকভাবে ‘ইতা ত পারাইয়েঐ, ইতা ত আগে লতি উয়রে উইঠ্যই ডাত্তর! তুঁই কী ছঅদ্দে?’ ‘এই ঘরে ঢুকে যাও’ এই কথাটা চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলে বলা হয় এভাবে ‘ওই পোয়া গরত গঅল, ওডা গরত ঢুক্, অডি তোরে ঘরত গইলত হইদ্দে।’ কক্সবাজার অঞ্চলের মানুষ, পায়খানা প্রস্রাব করতে যাওয়াকে বলে বারে যাওয়া’। ‘বারে’ মানে বাইরে। মেয়েরা সন্তানসম্ভাবা হলে মা শাশুড়িরা বলেন, ‘আঁরও বউয়র গা ভারী অইয়ে’, ‘আঁর মাইয়ার সম অইয়ে’ ‘কউ খানা বাছের’।
আউট্টা পার অইতে শাড়ি ছিরিলি
ও ভইন কি গরলি,
মা বাপর মানা ঠেলি, ঘরর বাইর ক্যা হলি
তুই কি গল্লি।
(রচয়িতা : কবিয়াল রমেশ শীল)
‘আউট্টা’ হলো মূলত ঘরের উঠান ও পুকুরঘাটে দেওয়া বাঁশের প্রতিবন্ধক বা ফটক, যাতে বাচ্চারা জলি বা টিঁয়ারা (বেড়া) পার হয়ে উঠানের বাইরে যেতে না পারে বা পুকুরে পড়ে না যায়। পা তুলে আউট্টা পার হতে গিয়ে অনেক সময় মেয়েদের শাড়ি ছিঁড়ে যায়। সেটা নিয়েই এই গান। আচ্ছা, নতুন প্রজন্ম কি ‘আউট্টা’ শব্দটা শুনেছে কখনো?
মা মারা গেলে নবজাতকদের পরের ঘরে পালক দেওয়ার চল আছে। চট্টগ্রামের ভাষায় এটাকে বলা হয় ‘পুশ্শইন’। এখন খুব কম মানুষই এই শব্দ ব্যবহার করে। ছোটখাট বা বামন আকৃতি বোঝাতে গ্রামে ‘ঠেমা’ বলে একটা শব্দ প্রচলিত আছে, আমার ৩১ বছরের শহুরে জীবনে আমি কখনো কাউকে এই শব্দ কাউকে ব্যবহার করতে শুনিনি। অন্তর্বাস অর্থে ‘লেংকুট’ বা ‘লেঙ্গুট’ কয়জনই বা জানে? এমন অসংখ্য শব্দ বলা যায়, যা বিলুপ্তির পথে, যেমন ওন্দারা (ফানেল), পুরিন (ঝাড়ু), হউরগা (ভর্তা), টেঁনা (খুঁটি), ওজাল (মশাল)।
কিছু বাগধারা নিয়েও আলোচনা করা যায়। ছোটবেলায় বুড়বুড়িরা বলতেন ‘ঘরর সিন্নি পরে হাআর/হোছনি কদ্দা লই বেরার।’ লালন যেমন বলেছেন, ‘আপন ঘরে বোঝাই সোনা/পরে করি লেনাদেনা’ সেরকম আর কি। তবে ‘কদ্দা’ হলো বাটি। আরও আছে ‘পোন্দত নাই তেনা/মিডা দি ভাতখানা’, ‘কঅডে আদিনাথর পাআর/কঅডে ছঅলে ক্ষের খাআর’, ‘সল্লুকর না বাতাসে চলে’।
আবার কিছু শব্দ আছে, ব্যাপক অর্থবোধক। যেমন দুষ্টু বাচ্চাদের বলা হয় ‘অজারনির কাট্টল’। কাঁঠাল যেমন সহজে হজম হয় না, বাচ্চারাও তেমন। সামান্য কষ্টে যারা অতি প্রতিক্রিয়া দেখায় তাদের বলা হয় ‘সোয়ালাইক্কা’। কানপড়াকে বলে ‘কানপুইশ্শানি’। মাঠে ফুটবল খেলায় কেউ বল নিয়ে বেশি ড্রিবলিং করলে তাকে বলে, ‘কাট্টি বা হাট্টি’। আবার বাচালদের বেলায়ও এই শব্দটা ব্যবহার হয়। যারা একটু বেশি মাতবরি করে, তাদের উদ্দেশ্যে মুরব্বীরা বলেন, ‘ওডা বেশি কাইতানি ন গরিচ’।












