চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের স্বনামধন্য গীতিকার- বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজল কান্তি দে

কংকন নাগ | মঙ্গলবার , ১০ মার্চ, ২০২৬ at ৫:৪৭ পূর্বাহ্ণ

বলা হয়ে থাকে যখন আপনি কাউকে দান করবেন, তখন আপনার বাম হাতও যেন ডান হাতের কথা না জানে। অথবা, আপনি যখন কাউকে উপকার করবেন, তখন সেটা ফলাও করে সবাইকে বলতে যাবেন না। যারা পুরনো আমলের মানুষ, অর্থাৎ যারা সঠিক মূল্যবোধ বা আদর্শ জীবনাচরণের সুশিক্ষা ছোটবেলাতেই পেয়েছেন, তাদের বেশিরভাগই এসব কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলতেন। তবে, তারা নিজেরা দান বা উপকারের কথা না বললেও যারা উপকারভোগী, তাদের অনেকেই উপকারীর উপকারের কথা তার জীবদ্দশায়ই প্রকাশ করেছেন। যারা তা করতে পারেননি, তারা উপকারীর চিরপ্রস্থানের সংবাদ শোনার সাথেসাথেই প্রবল আফসোসের সাথে কী কী উপকার পেয়েছেন তা প্রকাশ করেন।

ঠিক এমনটাই ঘটেছে বীর মুক্তিযোদ্ধা, চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের স্বনামধন্য গীতিকার, সাংবাদিক, লেখক, সাবেক সমবায় কর্মকর্তা কাজল কান্তি দে’র বেলায়। গত ০১ ফেব্রুয়ারি সবাইকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে অনন্তের পথে যাত্রা করেছেন তিনি। বিরল ব্যক্তিত্বের অধিকারী এই মানুষটি জীবিত থাকা অবস্থায় তাঁর সম্পর্কে খুব বেশি জানার সুযোগ হয়নি। বেশিরভাগই আমার ব্যর্থতা এবং কিছুটা তাঁর অন্তর্মুখী স্বভাবের জন্য। তবে, আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলাম, তাঁর প্রয়াণের সংবাদ যেই শুনেছেন, সেই নিজের জীবনে কাজল কান্তি দে’র অনন্য অবদানের কথা বলে চোখের জল ফেলেছেন। এই তালিকায় কে নেই? যে মানুষটা রাস্তার পাশে বসে দিনভর পরম যত্নে অন্যের পাদুকা তৈরি করেন অর্থাৎ চর্মকার বা মুচি; যে মানুষটা অন্যের জিনিসপত্র ঘাড়ে করে গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে পারিশ্রমিক পান, যে মানুষটা রাস্তার পাশের দোকানে বসে ফল বা সবজি বিক্রি করেন, যে মানুষটা মাছ কুটে দেন বা যে মানুষটা কোন দোকানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন, তাদের সবাই কোন না কোনভাবে কাজল কান্তি দে’র কাছ থেকে উপকৃত হয়েছেন। এ তো গেল সমাজের তথাকথিত নিচু শ্রেণির কথা। উচ্চ শ্রেণি তথা শিক্ষিত বা উঁচু পদে কর্মরত অসংখ্য মানুষও তাঁর দ্বারা উপকৃত হয়েছেন। কেউ কেউ তো অকপটে স্বীকার করেন, তাঁর শিক্ষাজীবন বাঁচিয়ে রাখার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান কাজল কান্তি দে’র। আবার, কারো সন্তানের চিকিৎসা লাগবে, বা কারো মেয়ের বিয়ে দিতে হবে, বা কারো ছেলেমেয়ের চাকরির জন্য কথা বলে দিতে হবেএমন সব আবদারেও নির্দ্বিধায় পাশে দাঁড়িয়েছেন কাজল কান্তি দে।

এই যে এতকিছু তিনি করেছেন, সেগুলোর কারণে মনে হতেই পারে তিনি খুব ধনী বা সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান ছিলেন। কিন্তু, বাস্তবতা একদমই উল্টো। শৈশবেই বাবামা’কে হারানো কাজল কান্তি দে’র পুরো জীবনটাই কেটেছে দারিদ্র্যের সাথে পাঞ্জা লড়ে। ১৯৫৪ সালের ০২ মে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ঐতিহাসিক ধলঘাট গ্রামে সুরেশ চন্দ্র দে এবং লক্ষ্মী রানী দে’র ঘরে জন্মগ্রহণ করেন কাজল কান্তি দে। স্কুলের গণ্ডি পার হওয়ার আগেই মা’কে হারান। বাবাকেও খুব বেশিদিন পাননি। অর্থাভাবে বেশিদূর লেখাপড়া করতে পারেননি। তবে ধলঘাটের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ তাঁকে ভিন্নতর মানুষ হিসেবে তৈরি করেছে। তাঁদের বাড়ির দক্ষিণে যে সাপ্তাহিক হাট বসতো তাদের আয়োজনে বাৎসরিক থিয়েটারে তিনি অভিনয় করতেন।

আইএ পাশ করার পরপরই ১৯৬৭ সালের ১২ মে চট্টগ্রামের হাজারী লেন থেকে প্রকাশিত দৈনিক সমাচারে যোগদানের মাধ্যমে পেশাগত জীবনে প্রবেশ করেন কাজল কান্তি দে। শুরু হয় কলমসৈনিক হিসেবে তাঁর পথচলা। হাজারী লেনের ছোট্ট কুঁড়েঘরে থেকে অনেক স্বপ্ন দেখেছেন এবং তার কিছু অংশ বাস্তবায়নও করেছেন কাজল কান্তি দে। তাঁর ঘরটি ছিল যেন অবারিত দ্বার। ধলঘাট থেকে যেই আসতেন, সেই তার ঘরে অতিথির মতো থাকতেন। বাসার সামনে ছিল মোহাম্মদী প্রেস। এখান থেকে পরপর তিনবার ‘হাজারী লেইন’ শিরোনামে লিটল ম্যাগাজিন বের করেছিলেন। প্রথমটার প্রচ্ছদ পছন্দ করেছিলেন, হাজারী লেইনে স্বর্ণের গুঁড়ো মিশ্রিত ধূলোবালি কুড়োনো ছেলেদের নিয়ে। পিয়াসা পাইচ হোটেলে নিয়মিত খেতেন। আবার ঘরে স্টোভে রান্না করে অন্যদের খাওয়াতেও পছন্দ করতেন তিনি। একবার শখ হলো মুসলিম হলে কমার্শিয়াল থিয়েটার করবেন। ঢাকা থেকে সিনেমার তারকাদের নিয়ে। আনোয়ার হোসেনসহ অনেকেই আসার কথা ছিল। পরে আনোয়ার হোসেন আসতে না পারলেও ছোট্ট একটা টিম এসেছিল। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য রবিউল আর শর্বরী। মুসলিম হলে শর্বরীকে সশরীরে দেখে দর্শক হুমড়ি খেয়ে টিকিট কিনে নাটক দেখতে হলে প্রবেশ করে। কাজল কান্তি দে’কে নেতাদের বলে চাকুরি ঠিক করে নেয়ার কথা বারবারই বলেছেন স্বজনরা। তৎকালীন আওয়ামী লীগের অনেক হেভিওয়েট নেতাও তাকে বারবারই সাহায্য করার চেষ্টা করেছেন। কিন্ত, কিছুতেই এ সুযোগ নেননি কাজল কান্তি দে।

ষাটের দশকে স্বাধিকার আন্দোলনে উত্তাল ছিল সারাদেশ। ১৯৭১ সালের মার্চে শওকত হাফিজ খান ঋষি সম্পাদিত, আবু মো. হাশেম ও মো. নিজামুল হকের পৃষ্ঠপোষকতায় স্বাধীনতার পক্ষে বিশেষ বুলেটিন ‘স্বাধীনতা’ (২৫ মার্চ ‘৭১)র পরিচালনা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন কাজল কান্তি দে। এই বুলেটিনটি মুদ্রিত হতো হাজারী লেইনের মোহম্মদী প্রেস থেকে। লেখনীর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে জনমত গড়ে তুলতেন বলে অন্যদের মত কাজল কান্তিও সরকারের টার্গেটে পরিণত হন। তাই, প্রতিটি দেশপ্রেমিক তরুণের মতোই কাজল কান্তি দে সিদ্ধান্ত নেন কলম ছেড়ে সশস্ত্র সংগ্রামে সামিল হওয়ার। নজরদারি এড়িয়ে ১৯৭১এর ২৭ এপ্রিল বৈষ্ণবপুর সীমান্ত দিয়ে ভারতে পৌঁছান তিনি। পরে কাজী সামশুর রহমান ও সিটি কলেজের অধ্যাপক রিজভি সাহেবের সহায়তায় আগরতলায় তৎকালীন পূর্বাঞ্চলীয় সেক্টরের চেয়ারম্যান মরহুম জহুর আহমদ চৌধুরীসহ অন্যান্য নেতাকর্মীদের সঙ্গে এশিয়ান রেস্টহাউজে দেখা করেন। সেখানে অবস্থানের সময় পটিয়ার তৎকালীন এমএনএ অধ্যাপক নুরুল ইসলাম চৌধুরী তাঁকে মুজিবনগর সরকারের ‘স্টোর অফিসার’ হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময়ই তিনি আগরতলার কৃষ্ণনগরে মুজিবনগর সরকারের ইস্টার্ন জোন সদর দপ্তরে কর্মরত ছিলেন। তাই, শেষ পর্যন্ত রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা নন, মুজিবনগর সরকারের হয়ে যুদ্ধের নেপথ্যকর্মী হিসেবে অনন্য অবদান রাখেন কাজল কান্তি দে। সেসময় জহুর আহমদ চৌধুরী, এম আর সিদ্দীকী, অধ্যাপক নূরুল ইসলাম চৌধুরী, আ স ম আবদুর রব, আবদুল কুদ্দুছ মাখন, মীর্জা আবু মনসুর, নুরুল আলম চৌধুরী, এইচ টি ইমাম, কাজী রকিবউদ্দীন, মো: হাসান, সেক্টর কমান্ডার মেজর শফিউল্লাহ, কেফোর্স কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ, মেজর শওকত, কসবার উপসচিব সাহিদুল ইসলাম, ননী মোক্তার, কাজী সামশু, অধ্যাপক রেজ্জাকসহ আরো অনেক নেতৃবৃন্দের সাথে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করেছেন তিনি।

রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে প্রিয় স্বদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশে ফিরে আবারও সাংবাদিকতায় মনোনিবেশ করেন কাজল কান্তি দে। যোগ দেন দৈনিক দেশ বাংলায়, যেখানে আরো কাজ করতেন এডভোকেট আবু মোঃ হাশেম, নিজামুল হক, রফিক ভূঁইয়া, মৃণাল চক্রবর্তী, ওসমান গণি মনসুর, প্রদীপ খাস্তগীর, শওকত হাফিজ খান রুশ্নিসহ আরো অনেকে। চট্টগ্রাম থেকে স্বাধীনতাউত্তর প্রথম লিটল ম্যাগাজিন ‘হাজারী লেইন’ প্রকাশিত হয় কাজল কান্তি দে’র সম্পাদনায়। তিনটি সংখ্যার পর এই লিটল ম্যাগাজিনটি যথানিয়মে লিটল ম্যাগে রুপান্তরিত হয়। সাংবাদিকতা ছেড়ে সমবায় বিভাগে যোগদানের পরও লেখালেখি ছাড়েননি কাজল কান্তি দে। সম্পাদনা করেন গ্রাম ও সমবায় নামে সাময়িকী।

সাংবাদিকতা ও সমবায় বিভাগে কাজ করার পাশাপাশি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের অসামান্য গীতিকার হিসেবেও নিজের প্রতিভার ছাপ রাখেন কাজল কান্তি দে। কিংবদন্তি শিল্পী শ্যাম সুন্দর বৈষ্ণব, শেফালী ঘোষ, যদু গোপাল বৈষ্ণব, জগদীশ বসু, মানস পাল চৌধুরী, হেডমাস্টার খ্যাত শিল্পী সিরাজুল ইসলাম, শিখা রানী বিশ্বাস, সন্ধ্যা রানী দে’সহ আরো অনেক শিল্পী তাঁর লেখা গান বেতারটিভিতে নিয়মিত গেয়েছেন। গণসঙ্গীত রচনায়ও তাঁর অনন্য পারঙ্গমতা ছিল। উদীচী তাঁর লেখা অনেক গান সুরারোপ করে মাঠে ময়দানে বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় পরিবেশন করেছে।

সঙ্গীত জগতে বিচরণের সুবাদেই কাজল কান্তি দে ঘর বাঁধেন ৭০’র দশকে চট্টগ্রামের সেরা শিল্পীদের অন্যতম, রেবা বৈদ্য (পরবর্তীতে রেবা রানী দে)’র সাথে। পরবর্তীতে রেবা রানী দে নিজে সঙ্গীত জগত থেকে অবসর নিলেও দুই কন্যা, অন্তরা দে এবং অশ্রুকণা দে’কেও পরম যত্নে তৈরি করেছেন সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে। গীতিকার বাবা ও সঙ্গীত শিল্পী মায়ের সন্তান হিসেবে তারা দুজনও শিল্পী হিসেবে যথেষ্ট সুনাম কুড়িয়েছেন।

সব ধরনের অন্যায়নিপীড়নশোষণের বিরুদ্ধে সর্বদাই সোচ্চার ছিল কাজল কান্তি দে’র কলম। পরাধীন দেশে তাঁর লেখনীর লক্ষ্য ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। স্বাধীন দেশেও যখনই প্রয়োজন পড়েছে, অন্যায়অত্যাচার, শোষণনিপীড়ন, বঞ্চনাবেদনার কথা নিপুণ দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন কাজল কান্তি দে। তাঁর লেখা গান একদিকে যেমন বাঙালির নিত্য বঞ্চনার নির্মমতার করুণ ছবি তুলে ধরেছে, তেমনি অন্যদিকে প্রতিরোধের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে দিয়েছে গণমানুষের মনে। তাঁর লেখা অনেক গান এখনো মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়।

প্রচারবিমুখ, অন্ধকারে বসে আলোময় পথের দিশারী হয়ে আজীবন নীরবেনিভৃতে কাজ করে গেছেন কাজল কান্তি দে। লেখার শুরুতে যেমনটি বলেছি, ঠিক সেভাবেই প্রতিটি মানুষের বিপদে নিজের সাধ্যমতো, কখনও সাধ্যকে অতিক্রম করে চেষ্টা করেছেন পাশে দাঁড়ানোর। সেজন্যই চিরপ্রস্থানের মাসখানেক পরও তাঁকে স্মরণ করে চোখের জল ফেলেন অসংখ্য মানুষ। তাদের চোখের জলের এই প্রতিটি ফোঁটাই কাজল কান্তি দে’র সারাজীবনের অমূল্য অর্জন।

লেখক: সংবাদকর্মী, কাজল কান্তি দে’র জামাতা

পূর্ববর্তী নিবন্ধদেশে বেকারত্বের হার কমাতে আমাদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে
পরবর্তী নিবন্ধঐতিহাসিক শোহাদায়ে বদর উদযাপন