চট্টগ্রামকে এবার সত্যিকারের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে দেখতে চাই

নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা

হাসান আকবর | সোমবার , ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৬:১৮ পূর্বাহ্ণ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্যদের শপথ আগামীকাল মঙ্গলবার। শপথের পরই গঠিত হবে নতুন মন্ত্রিসভা, দায়িত্ব নেবে নতুন সরকার। নতুন এই সরকারের কাছে চট্টগ্রামের মানুষের প্রত্যাশা অনেক। আর কয়েক কোটি মানুষের এই প্রত্যাশা পূরণ এবং স্বপ্ন বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জও অনেক।

শপথ গ্রহণের পর সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী দল হিসেবে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানাবেন রাষ্ট্রপতি। ইতোমধ্যে নতুন মন্ত্রিসভা ঘোষণা হওয়ার আভাস পাওয়া গেছে, শুরু হবে নতুন সরকারের পথচলা।

ব্যাপক জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ঠিকঠাকভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া এবং নতুন সরকারের পথ চলার বর্ণিল মুহূর্তে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের মানুষের প্রত্যাশা অনেক। দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন খ্যাত চট্টগ্রামের মানুষ বড় ধরনের প্রত্যাশা নিয়ে তাকিয়ে আছে নতুন সরকারের দিকে। শিল্প, বন্দর, অবকাঠামো, কর্মসংস্থান, জলাবদ্ধতা, পাহাড়ধস, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ সব খাতেই বাস্তবসম্মত অগ্রগতিই এতদঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা। তবে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হচ্ছে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা।

দেশের আমদানিরপ্তানি বাণিজ্যের সিংহভাগ পরিচালিত হয় চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে। দেশের মোট সমুদ্রবাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই নির্ভরশীল দেশের প্রধান এই বন্দরের ওপর। প্রতিবছর হাজার হাজার জাহাজ হ্যান্ডলিং, কোটি টন কার্গো পরিবহন এবং লক্ষ লক্ষ কন্টেনার ওঠানামার মধ্য দিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে বন্দরটি। চট্টগ্রাম বন্দরকে বাদ দিয়ে দেশের ব্যবসা বাণিজ্য তথা অর্থনীতির কথা কল্পনাও করা যায় না।

এ ছাড়া চট্টগ্রাম ইপিজেড, কোরিয়ান ইপিজেড, আনোয়ারা ও মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল, ইস্পাত ও সিমেন্ট শিল্প, জ্বালানি টার্মিনাল সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম এক বহুমাত্রিক শিল্পাঞ্চল। ফলে এখানে অবকাঠামো উন্নয়ন মানেই জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে গতি।

চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, চট্টগ্রামকঙবাজার রেলপথ, কর্ণফুলী টানেল, এলিভেটেড এঙপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলী টানেল প্রভৃতিকে যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারলে চট্টগ্রামের আবাসন, শিল্পায়ন ও পর্যটন খাতে নতুন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়া সম্ভব। অথচ সঠিক দিকনির্দেশনা এবং যথাযথ পরিকল্পনার অভাবে চট্টগ্রামের বহু সম্ভাবনাই মাঠে মারা পড়েছে, পড়ছে।

চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী ঘোষণার কথা বলা হচ্ছিলো বহু বছর আগ থেকে। কিন্তু মুখে মুখে চট্টগ্রামকে বিশেষণটি দেয়া হলেও এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো পদক্ষেপই কখনো নেয়া হয়নি।

দেশের জ্বালানি তেলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের সব কার্যক্রমই মূলতঃ পরিচালিত হয় চট্টগ্রাম থেকে, অথচ চেয়ারম্যান মাসে এক দুইদিন এখানে অফিস করতে আসেন। বিপিসির কর্মকর্তারাই বলেন যে, চেয়ারম্যান চট্টগ্রামে বেড়াতে আসেন। চট্টগ্রাম থেকে ব্যবসা গুটিয়ে চলে গেছে বহুজাতিক অনেকগুলো কোম্পানি। কোনো একটি ব্যাংক বা বীমারই সদরদফতর চট্টগ্রামে নেই। বিনিয়োগ বোর্ডের একটি অফিস ছিল, সেটিও গুটিয়ে নেয়া হয়েছে। চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী শিল্পপতিদের যে কোনো সিদ্ধান্তের জন্য তাকিয়ে থাকতে হয় ঢাকার দিকে, ছুটতে হয় ঢাকায়। চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী করার যাবতীয় সম্ভাবনা থাকলেও শুধুমাত্র নেতৃত্বের অভাবেই বছরের পর বছর ধরে ব্যাপারটি ঝুলে আছে।

একটি দেশের রাজনৈতিক রাজধানী প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কেন্দ্র হলেও বাণিজ্যিক রাজধানী হলো অর্থনীতির স্পন্দনকেন্দ্রযেখান থেকে শিল্প, বন্দর, ব্যাংকিং, লজিস্টিকস, আমদানিরপ্তানি ও করপোরেট কার্যক্রমের বড় অংশ পরিচালিত হয়। বিশ্বে বহু দেশে রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক রাজধানী আলাদা শহরে অবস্থিত। যেমন আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের রাজনৈতিক রাজধানী নয়া দিল্লি হলেও বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত মুম্বাই, চীনে রাজনৈতিক রাজধানী বেইজিং, আর অর্থনৈতিক শক্তিকেন্দ্র সাংহাই, তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারা, বাণিজ্যিক রাজধানী ইস্তামু্বল, কানাডার রাজধানী অটোয়া, অথচ বাণিজ্যিক রাজধানী টরন্টো, আমেরিকার রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসি, বাণিজ্যিক রাজধানী নিউইয়র্ক, অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরা, বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র সিডনি, দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় বৈশ্বিক বাণিজ্য হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত সিঙ্গাপুর।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, একটি বাণিজ্যিক রাজধানীর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে শক্তিশালী সমুদ্রবন্দর, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বা স্থলবন্দর। দেশের সিংহভাগ আমদানিরপ্তানি পরিচালিত হয় এখান থেকে। কন্টেনার টার্মিনাল, কাস্টমস হাউস, ফ্রিট্রেড জোন ও লজিস্টিক পার্কের সুবিধা থাকে। ২৪/৭ অপারেশন ও দ্রুত ক্লিয়ারেন্স ব্যবস্থা অর্থনৈতিক গতি নির্ধারণ করে।

বন্দরনির্ভর অর্থনীতি হলে জাহাজ হ্যান্ডলিং সক্ষমতা, ইয়ার্ড ম্যানেজমেন্ট, ড্রাফট গভীরতা ও ডিজিটাল কাস্টমস সিস্টেম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এছাড়া বাণিজ্যিক রাজধানীতে ইস্পাত, সিমেন্ট, জাহাজ নির্মাণের মতো ভারী শিল্প, গার্মেন্টস, চামড়া, আইটি খাতের রপ্তানিমুখী শিল্প, তেলগ্যাস ও পেট্রোকেমিক্যাল খাতের অবকাঠামো থাকে।

বড় ব্যাংক, বীমা কোম্পানি, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, শিপিং লাইন ও ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং কোম্পানির প্রধান কার্যালয়, শেয়ারবাজার বা স্টক এঙচেঞ্জ কার্যক্রম সক্রিয়, বিদেশি বিনিয়োগ, ট্রেড ফাইন্যান্স ও এলসি কার্যক্রমের বড় অংশ পরিচালনার সুযোগ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সালিশ ও চুক্তি সম্পাদনের সুযোগ থাকতে হয়। এছাড়া এঙপ্রেসওয়ে, রেল করিডর, ইনল্যান্ড কন্টেনার ডিপো, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, উচ্চগতির ইন্টারনেট ও ডিজিটাল নেটওয়ার্ক, আধুনিক গুদামজাতকরণ ও কোল্ডচেইন সুবিধা বিদ্যমান থাকতে হয়।

বাণিজ্যিক রাজধানী সাধারণত জাতীয় জিডিপির উল্লেখযোগ্য অংশ যোগান দেয়, কর রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় উৎস, ব্যাংকিং লেনদেন ও শিল্প উৎপাদনের বড় অংশ পরিচালনা করে থাকে। বাণিজ্যিক রাজধানীতে শ্রমিক থেকে করপোরেট নির্বাহী পর্যন্ত বহুমাত্রিক কর্মসংস্থান থাকে, দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হয়। একই সঙ্গে আবাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নগরসেবায় বাড়তি চাপ সামাল দেয়ার সক্ষমতা লাগে।

বাণিজ্যিক রাজধানীতে বিদেশি কনস্যুলেট ও ট্রেড মিশন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা ও প্রদর্শনী কেন্দ্র এবং বৈশ্বিক শিপিং ও এয়ারলাইন নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকতে হয়। এছাড়া ফিনটেক, স্টার্টআপ, আইটি পার্ক, ডিজিটাল কাস্টমস, পোর্ট কমিউনিটি সিস্টেম, কমার্স ও লাস্টমাইল ডেলিভারি অবকাঠামো গড়ে তুলতে হয়। প্রযুক্তিনির্ভর সেবা খাত অর্থনীতিকে গতিশীল করে। বাণিজ্যিক রাজধানীতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি পরিকল্পিত আবাসন, পরিবেশ সুরক্ষা, গণপরিবহন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করতে হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বাংলাদেশে প্রশাসনিক রাজধানী ঢাকা হলেও শিল্প, বন্দর ও আমদানিরপ্তানিনির্ভর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার প্রায় সব উপকরণই রয়েছে। একটু যত্ন করলেই বিদ্যমান সুযোগ সুবিধার পাশাপাশি কিছু নতুন উদ্যোগ বহুল প্রত্যাশার বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে চট্টগ্রামকে গড়ে তোলা সম্ভব বলেও তারা মন্তব্য করেছেন। তারা বলেছেন, সমন্বিত নীতি, দক্ষ প্রশাসন, আধুনিক প্রযুক্তি ও টেকসই নগর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা হলেও মূলতঃ পুরোদেশই উপকৃত হবে।

একইসাথে নগরীর ভেতরে যানজট, অসমাপ্ত ড্রেনেজ প্রকল্প, জলাবদ্ধতা ও সড়ক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এখনো বড় সমস্যা। নগরবাসীর প্রত্যাশাসমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন, জলাবদ্ধতা নিরসনে স্থায়ী সমাধান, নগর গণপরিবহন আধুনিকীকরণ, বন্দরসড়ক সংযোগ আরও উন্নত করা, নদী ও খাল দখলমুক্ত করা, পাহাড় কাটা বন্ধে কঠোর নজরদারি, শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি।

বন্দর নগরী চট্টগ্রামে আছে সমুদ্র, আছে নদী, অসংখ্য পাহাড়ও এই শহরে রয়েছে। এমন নান্দনিক শহর বিশ্বে খুব কমই আছে। যথাযথভাবে শহরটিকে কাজে লাগানো গেলেই এটি হয়ে উঠবে সত্যিকারের আঞ্চলিক অর্থনৈতিক হাব। যা শুধু চট্টগ্রামকেই সমৃদ্ধ করবে না, পুরো দেশেরই চেহারা পাল্টে দেবে। নতুন সরকারের কাছে চট্টগ্রামকে যথাযথভাবে মূল্যায়নের দাবি জানাই।

পূর্ববর্তী নিবন্ধজামায়াত আমির ও এনসিপির নাহিদের বাসায় তারেক রহমান
পরবর্তী নিবন্ধপ্রধানমন্ত্রী হয়ে তারেক রহমান থাকবেন কোথায়?